

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো শুধু সময়ের সাক্ষ্য নয়—বরং একটি জাতির আবেগ, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের প্রতিফলন। বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় লাখ লাখ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল তেমনই এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এটি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শেষ বিদায় ছিল না; এটি ছিল একজন আপসহীন নেত্রীর প্রতি জাতির শ্রদ্ধা, গণতন্ত্রের মায়ের প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসা এবং দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীকের প্রতি নিঃশব্দ কিন্তু দৃঢ়চেতা সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ। এই জনসমুদ্র কোনো প্রশাসনিক নির্দেশে সমবেত হয়নি, কোনো রাজনৈতিক প্রণোদনায় মিলিত হয়নি, কোনো ভয়ভীতি কিংবা চাপের ফলেও একত্রিত হয়নি। এটি ছিল মানুষের হৃদয়ের আকুতি, দেশনেত্রীর দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রতি সম্মান এবং ইতিহাসের কাছে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার এক অবিসংবাদিত মুহূর্ত।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল অনেকটাই নিঃশব্দে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে তিনি পরিচিত হলেও খুব দ্রুতই তিনি নিজেকে প্রমাণ করেন একজন স্বাধীনচেতা, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন রাজনীতিক হিসেবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখন সামরিক শাসনের ছায়া ঘনিয়ে বিস্তৃত, তখন একজন নারী সামনে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই সময়ে নারী নেতৃত্ব ছিল বিরল, সামাজিকভাবে বিপত্তির সম্মুখীন এবং রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। তবুও তিনি পিছিয়ে যাননি। তিনি নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন সংগ্রাম, সাহস ও আপসহীনতার মাধ্যমে।
স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধার, জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা— এসব কিছুর মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য প্রতিরোধের প্রতীক। তিনি রাজনীতি করেছেন ক্ষমতার জন্য নয় বরং তিনি রাজনীতি করেছেন মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে। তার নেতৃত্ব ছিল দৃঢ়, তার অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট, তার লক্ষ্য ছিল আপসহীনভাবে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল একটি শক্তিশালী নীতি—আপসহীনতা। তিনি কখনো স্বৈরাচারের সঙ্গে আপস করেননি, কখনো ভোটাধিকার হরণের সঙ্গে সমঝোতা করেননি, কখনো গণতন্ত্র ধ্বংসের প্রশ্নে নীরব সম্মতি দেননি। কারাবরণ, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা, অপপ্রচার— এসব কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। বরং প্রতিটি বাধা তাকে আরও দৃঢ় করেছে, আরও কমিটেড করেছে। যখন তাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, তখন তিনি ফিরে এসেছেন আরও সাহসী হয়ে। যখন তাকে একা করার চেষ্টা হয়েছে, তখন জনগণই হয়ে উঠেছে তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
এ আপসহীন অবস্থান তাকে শুধু একজন রাজনীতিক হিসেবে নয়, বরং একটি রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি হয়ে উঠেছিলেন এমন এক প্রতীক, যিনি ক্ষমতার চেয়েও নীতিকে বড় করে দেখেছেন, সুবিধার চেয়েও সত্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন আর ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়েও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্র বারবার বিপন্ন হয়েছে। কখনো সামরিক শাসনের মাধ্যমে, কখনো একদলীয় কর্তৃত্বের ছায়ায়, কখনো ভোটাধিকারবিহীন অবস্থার ভেতর দিয়ে।
এই প্রতিটি সংকটময় সময়ে খালেদা জিয়া ছিলেন গণতন্ত্রের বিষয়ে উচ্চকণ্ঠ ও দৃঢ় কণ্ঠস্বর। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পেছনে তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তিনি ভোটাধিকারকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে নিরলস লড়াই করেছেন।
এ কারণেই মানুষ তাকে শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং ‘গণতন্ত্রের মাতা’ হিসেবে স্মরণ করে। তার নেতৃত্ব ছিল প্রশাসনিক নৈতিক। তিনি শুধু আইনগত কাঠামো রক্ষা করেননি, তিনি মানুষের অধিকার রক্ষা করেছেন। তিনি শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেননি, তিনি ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাব, ভূরাজনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রশ্ন সবসময়ই স্পর্শকাতর। এ প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ চেষ্টা করেছে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ধরে রাখতে। তিনি কখনো দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে আপস করেননি। এ দৃঢ় অবস্থানই তাকে পরিণত করেছে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীকে।
যেদিন তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, সেদিন ঢাকার আকাশ বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছিল আবেগে। লাখো মানুষ—বৃদ্ধ, যুবক, নারী, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী সবাই ছুটে এসেছিল শুধু একটিমাত্র কারণে, শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে। এ উপস্থিতি কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। এটি ছিল মানুষের হৃদয়ের ভাষা। এটি ছিল এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী বার্তা: আমরা ভুলে যাইনি, আমরা ভয় পাইনি, আমরা এখনো গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি।
এই জনসমাগম ছিল এক ধরনের নিঃশব্দ প্রতিবাদ। কোনো স্লোগান ছাড়া, কোনো সংঘর্ষ ছাড়া, কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই মানুষ তাদের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে। চোখের জল, নীরব প্রার্থনা, মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকা—এসবই ছিল একেকটি রাজনৈতিক বক্তব্য, কিন্তু শব্দহীন।
কোনো কোনো গণমাধ্যম এ বিশাল জনসমাগমকে হেয় চেষ্টা করেছে। কেউ বলেছে এটি সংগঠিত, কেউ বলেছে রাজনৈতিক, কেউ বলেছে অতিনাটকীয়। কিন্তু ইতিহাস জানে, স্বতঃস্ফূর্ত আবেগকে কখনো পরিকল্পনা দিয়ে তৈরি করা যায় না। লাখো মানুষের চোখের জল কোনো পূর্ব রচিত স্ক্রিপ্টের ফলাফল নয়। নীরব শ্রদ্ধা কোনো প্রচারণার ফল নয়। ইতিহাসের পাতায় এ জানাজা লেখা থাকবে জনগণের ভালোবাসার সাক্ষ্য হিসেবে।
খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের ভালোবাসা শুধু রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তাড়িত ছিল না, এটি ছিল গভীর মানবিক এক ব্যাপার। তিনি ছিলেন একজন মা, একজন স্ত্রী, একজন সংগ্রামী নারী, এমনকি অসুস্থ অবস্থায়ও এক দৃঢ়চেতা নেত্রী। তার দীর্ঘ অসুস্থতা, তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া নিঃসঙ্গতা, চিকিৎসার লড়াই মানুষের হৃদয়ে গভীর সহানুভূতিও তৈরি করেছিল। মানুষ শুধু একজন নেত্রীকে নয়, একজন অসাধারণ শ্রদ্ধেয় এক মানুষকেও বিদায় জানাতে এসেছিল।
বাংলাদেশের একাধিক প্রজন্ম বড় হয়েছে তার নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে। কেউ দেখেছে তার সরকার, কেউ দেখেছে তার আন্দোলন, কেউ দেখেছে তার কারাবরণ। এ স্মৃতিগুলো মুছে যাওয়ার নয়। এ স্মৃতিগুলোই তৈরি করে কোটি কোটি মানুষের মনোজগৎ, আবেগ এবং ভবিষ্যতের চিত্রপট। এ জানাজা ছিল সেই আবেগের সম্মিলিত প্রকাশ।
দেশনেত্রীর জানাজায় লাখো লাখো মানুষের উপস্থিতি রাজনৈতিক সমীকরণেরও বাইরে ছিল। এখানে বিএনপির সমর্থক ছিল, আবার বিরোধীরাও ছিল। এখানে রাজনৈতিক কর্মী ছিল, আবার সাধারণ মানুষও ছিল। কারণ, কিছু মানুষ রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে যায়। খালেদা জিয়া তেমনই একজন।
এ জানাজার জনসমুদ্র ভবিষ্যতের রাজনীতির জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে গেছে। জনগণ এখনো গণতন্ত্র চায়, জনগণ এখনো ন্যায়বিচার চায়, জনগণ এখনো আপসহীন নেতৃত্বকে সম্মান করে। এ বার্তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা চিরস্থায়ী।
বাংলাদেশ বহু নেতৃত্বকে প্রত্যক্ষ করেছে, বেশ কিছু ক্ষমতার পালাবদল দেখেছে, অনেক রাজনৈতিক নাটক দেখেছে। কিন্তু খুব কম মানুষই পেরেছে ইতিহাসে মহত্তম জায়গা তৈরি করে নিতে এবং ঠাঁই নিতে মানুষের হৃদয়ে। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া সেটি সফলভাবেই পেরেছেন। তার জানাজার লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধা ছিল একজন কালোত্তীর্ণ মানুষের প্রতি সম্মান, একটি আদর্শের প্রতি ভালোবাসা, একটি জাতির আত্মার প্রতিফলন।
লেখক: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা
মন্তব্য করুন