বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
নুসরাত জাহান
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:২৭ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চারদিক

চা শ্রমিকের করুণ জীবন

চা শ্রমিকের করুণ জীবন

এক কাপ চা স্বস্তি এনে দেয় আমাদের ক্লান্ত দিনে। গরম ধোঁয়া ওঠা সেই কাপে আমরা খুঁজি আরাম, আড্ডা, কখনো প্রশান্তি। অট্টালিকার এসিরুমে থেকে মানসিক কাজের চাপ ভোলাতে আমরা এক কাপ চা খাই। কিন্তু সেই কাপে চুমুক দেওয়ার মুহূর্তে কি একবারও মনে পড়ে এ চায়ের প্রতিটি পাতার পেছনে লেগে আছে পাহাড় বেয়ে ওঠা ঘামে ভেজা কোনো মানুষের নিঃশ্বাস? যে মানুষটি রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, পিঠে ভারী বোঝা বয়ে এ পাতাগুলো সংগ্রহ করে, তার জীবনটা কি চায়ের মতোই তিক্ত? নাকি স্বস্তিতে ভরা মিষ্টি চায়ের চুমুকের মতো?

বাংলাদেশের চা বাগানগুলো দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও চা পাতা সংগ্রহকারীদের জীবন বাস্তবতা ভয়াবহভাবে অবহেলিত। পাহাড়ি ঢাল বেয়ে উঠে, দুর্গম পথে হাঁটে তারা। প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টা পরিশ্রমের বিনিময়ে একজন চা পাতা সংগ্রহকারী পান নামমাত্র কিছু টাকা। অথচ তাদের কাজ শুধু শ্রমসাধ্যই নয়, বরং শারীরিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা থাকে কত কেজি চা পাতা তুলতে হবে তার। এ পরিমাণ পূরণ করতে না পারলে উল্টো শাস্তির সম্মুখীন হতে হয় তাদের। প্রতি কেজিতে কেটে রাখা হয় পারিশ্রমিকের কিছু অংশ। অর্থাৎ, অসুস্থতা, দুর্বলতা বা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা কোনো কিছুই এখানে অজুহাত নয়। দুমুঠো ভাত মুখে তুলতে তাদের শরীরের রক্ত পানি করতে হয়।

একজন চা পাতা সংগ্রহকারী নারী প্রতিদিন ভোরে ঘর ছাড়েন। শিশুকে ঘরে রেখে, কখনো না খেয়েই কাজে নামতে হয়। পাহাড়ি পথে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়ার ঘটনা নিত্যদিনের। পিঠে ঝোলানো ঝুড়িতে ২০-২৫ কেজি চা পাতা বয়ে আনা মানে শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, এটা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি। তবুও দিন শেষে তার হাতে আসে এমন একটি মজুরি, যা দিয়ে একটি পরিবারের ন্যূনতম খাবার জোগাড় করাও কঠিন। চিকিৎসা, শিক্ষা, পুষ্টি এসব যেন তাদের জীবনে বিলাসিতা। শুধু নারী নয়, পুরুষদের ক্ষেত্রেও হয় একই ধরনের অন্যায়। সারা দিনের পারিশ্রমিক হিসেবে তারা এমন সংখ্যার অর্থ পায়, যা দ্বারা তাদের বেঁচে থাকা দায়।

এ অমানবিক অবস্থার পেছনে কয়েকটি গভীর কারণ রয়েছে। প্রথমত, শ্রমের সঠিক মূল্যায়নের অভাব। চা শিল্প লাভজনক হলেও সেই লাভ শ্রমিকদের জীবনে প্রতিফলিত হয় না। মালিকপক্ষের মুনাফা বাড়লেও শ্রমিকের মজুরি বছরের পর বছর একই থাকে। দ্বিতীয়ত, শ্রম আইনের দুর্বল প্রয়োগ। কাগজে-কলমে ন্যূনতম মজুরি বা কাজের সময় নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয় না। তদারকির অভাব এ অবিচারকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। তৃতীয়ত, শ্রমিকদের সংগঠিত কণ্ঠের অভাব। অধিকাংশ চা পাতা সংগ্রহকারী দরিদ্র, শিক্ষাবঞ্চিত এবং সামাজিকভাবে প্রান্তিক। তারা প্রতিবাদ করতে জানে না, কিংবা প্রতিবাদ করলে কাজ হারানোর ভয় থাকে। চতুর্থত, সমাজের উদাসীনতা। শহরের ভোক্তারা চায়ের দামের হিসাব করে, কিন্তু সেই দামের পেছনের মানুষের জীবনের হিসাব কষে না। এ নীরবতা অন্যায়ের সবচেয়ে বড় শক্তি।

এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সমাধান হতে হবে বহুমাত্রিক ও বাস্তবভিত্তিক। প্রথমেই প্রয়োজন ন্যায্য মজুরি কাঠামো। ৮-১০ ঘণ্টা পরিশ্রমের জন্য নামমাত্র পারিশ্রমিক কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় মজুরি পুনর্নির্ধারণ করতে হবে।

লক্ষ্যমাত্রা ও জরিমানার নিয়ম বাতিল বা মানবিক করা জরুরি। নির্ধারিত পরিমাণ পূরণ না করতে পারলে টাকা কেটে নেওয়া শ্রমিককে আরও দরিদ্র করে তোলে। কাজের সক্ষমতা, বয়স ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে কাজ বণ্টন হওয়া উচিত। স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়ি পথে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য সুরক্ষাসামগ্রী, চিকিৎসা সুবিধা এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক। শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। স্বাধীন ও কার্যকর শ্রমিক ইউনিয়ন তাদের অধিকার আদায়ে সহায়ক হতে পারে।

সচেতন ভোক্তা ও রাষ্ট্রীয় ভূমিকা অপরিহার্য। সরকারকে কঠোরভাবে শ্রম আইন প্রয়োগ করতে হবে আর আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে জানতে হবে, আমাদের এক কাপ চায়ের পেছনে কারা বেঁচে আছে অমানবিক বাস্তবতায়। চা পাতা সংগ্রহকারীদের জীবন শুধু একটি শ্রম ইস্যু নয়, এটি একটি মানবিক প্রশ্ন। যারা পাহাড় বেয়ে উঠে আমাদের স্বস্তির কাপ ভরিয়ে দেয়, তাদের জীবন যদি হয় অবহেলা আর শোষণের গল্প, তবে সেই চা আর তৃপ্তি দিতে পারে না।

সমাজ হিসেবে আমাদের চোখ খুলতে হবে। নইলে পাহাড়ের সেই নীরব কান্না একদিন আমাদের বিবেককেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। চা পাতা সংগ্রহকারী শ্রমিকদের জন্য শহরের ভোক্তাদের আওয়াজ তুলতে হবে, যাতে করে পরিশ্রম করার পরও তারা মানবেতর জীবনযাপন না করে। রাষ্ট্রের প্রতিটি ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ন্যায়বিচার সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের সরকার ও রাষ্ট্রের নাগরিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

নুসরাত জাহান, শিক্ষার্থী

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আলভারেজকে নিয়ে রিয়ালের ‘মেগা বিড’, প্রত্যাখ্যানের ঘোষণায় চমকে দিল অ্যাটলেটিকো 

সম্পদ-দলীয় প্রতীক সবই হারাচ্ছেন মমতা!

বিমান বাহিনীর ১৩১তম জুনিয়র কমান্ড ও স্টাফ কোর্সের সনদপত্র বিতরণ

চিকিৎসকদের নিয়ে সাংবাদিক মাসুদ কামালের বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ড্যাব

সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় চোখে আলো ফিরেছে ৮৪ জনের

বাজেটে মোবাইল, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিপণ্যে বড় সুখবর

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিশ্বকাপ উন্মাদনায় দেশের পতাকা থাকুক সবার উপরে

গাজায় সহিংসতার দায়ে ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রীর ওপর ফ্রান্সের নিষেধাজ্ঞা

ঢাকায় নিখোঁজ জবি শিক্ষার্থীর বাবা, সন্ধান চায় ছেলে

১০

নতুন রিসাইক্লিং উদ্যোগ / ৯০ শতাংশর বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য কমিয়েছে সিঙ্গার বাংলাদেশ

১১

সরকারি বাঙলা কলেজে অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা

১২

বাংলার নদী, বাংলার জীবন : ইতিহাস থেকে বর্তমান অবস্থা

১৩

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৪

সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগে ‘হিট’ প্রকল্পের আওতায় ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত

১৫

ল্যাবএইডে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক সেমিনার অনুষ্ঠিত

১৬

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন

১৭

কক্সবাজারে ১৯ রোহিঙ্গা আটক

১৮

হিজবুল্লাহর রকেট হামলায় পিছু হটল ইসরায়েলি বাহিনী

১৯

ব্রাজিলের পতাকা টানাতে গিয়ে কিশোরের মৃত্যু

২০
X