কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:২৭ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

নূরী মাওলা বসাইলো, প্রেমের মেলা

ওমর ফারুক চৌধুরী জীবন
নূরী মাওলা বসাইলো, প্রেমের মেলা

‘দেখে যারে মাইজভান্ডারে, হইতাছে নূরের খেলা/নূরী মাওলা বসাইলো, প্রেমের মেলা—চট্টগ্রামের আঞ্চলিক, মাইজভান্ডারী, মুর্শিদী, মারফতি ধারার গানের কিংবদন্তি আবদুল গফুর হালীর লেখা এ গান যেন মাইজভান্ডার দরবারে ১০ মাঘ তারিখের প্রতিচ্ছবি। ১০ মাঘ উপমহাদেশের অন্যতম ওলিয়ে কামেল, মাইজভান্ডারী তরিকার প্রবর্তক হজরত মওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (ক.)-এর ওফাত দিবস। তার জীবন মর্যাদা ও অবস্থান উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো সর্বত্রই আলোকিত হয়েছে। এ উপলক্ষে মাইজভান্ডার দরবারে বসেছে হাজার হাজার আল্লাহ রাসুল (সা.) ও ওলি প্রেমিকগণের এক মহামিলনমেলা। মাইজভান্ডার দরবারের আলোর ঝরনায় প্লাবিত হয় গোটা চট্টলা। গোটা এলাকাজুড়ে বিরাজ করে আশেকী জজবা। সমগ্র দেশ থেকে মানুষ এসে উপস্থিত হয় নানা হাদিয়া/তোফাহ নিয়ে।

হজরত মওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (ক.)-এর পারিবারিক নাম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ। তার পিতার নাম সৈয়দ মতিউল্লাহ মাইজভান্ডারী ও মাতার নাম সৈয়দা খায়রুন্নেছা। তার পূর্বপুরুষ সৈয়দ হামিদ উদ্দিন গৌড় নগরে ইমাম ও কাজীর পদে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি গৌড় নগরে মহামারির কারণে ১৫৭৫ সনে চট্টগ্রামের পটিয়া থানার কাঞ্চন নগরে বসতি স্থাপন করেন। সেখানে তার নামানুসারে হামিদ গাঁও নামে আছে একটি গ্রাম। তার এক পুত্র সৈয়দ আব্দুল কাদের ফটিকছড়ি থানার আজিমনগর গ্রামে ইমামতি করার সুবাদে বসবাস আরম্ভ করেন। তার পুত্র সৈয়দ আতাউল্লাহ, তৎ পুত্র সৈয়দ তৈয়বুল্লাহর মেজো পুত্র সৈয়দ মতিউল্লাহ মাইজভান্ডার গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন।

চার বছর বয়স থেকে গ্রামে মক্তবে পড়ার মাধ্যমে শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (ক.)-এর শিক্ষাজীবন আরম্ভ হয়। গ্রামের মক্তবের পড়ালেখা শেষ করার পর ১২৬০ হিজরিতে উচ্চশিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ১২৬৮ হিজরিতে তিনি কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে তৎকালীন সর্বোচ্চ পর্যায়ের শিক্ষা সমাপন করেন। সেখানেই তিনি ইসলামিক নানা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে একজন সুবক্তা হিসেবে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেন। সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন ধর্মীয় প্রচার-প্রচারণায়।

তিনি শিক্ষা জীবন শেষে করে হিজরি ১২৬৯ সালে ব্রিটিশ শাসনাধীন অবিভক্ত ভারতের যশোর অঞ্চলের বিচার বিভাগীয় কাজী পদে যোগদান করেন। একই সঙ্গে শুরু করেন মুন্সেফী অধ্যয়ন। পরবর্তী সময়ে ১২৭০ হিজরিতে কাজী পদে ইস্তফা দিয়ে তিনি কলকাতায় মুন্সী বু আলী মাদ্রাসায় প্রধান মোদাররেছ হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে মুন্সেফী পরীক্ষায়ও তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। তার চারিত্রিক গুণাবলি ও জ্ঞানের ব্যাপকতায় মুগ্ধ কলকাতাবাসী তার ওয়াজ শোনার জন্য উন্মুখ থাকত। হাদিস, তাফসির, ফিকহ, মন্তেক, হিকমত, বালাগত, উচ্ছ্বল, আকাইদ, ফিলছফা, ফারায়েজসহ যাবতীয় বিষয়ে অত্যন্ত অভিজ্ঞ ছিলেন আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী। বিশেষ করে আরবি, উর্দু, বাংলা ও ফারসি ভাষায়ও তিনি পারদর্শী ছিলেন। ফলে তৎকালীন সময়ে তার নামডাক বিশেষভাবে ছড়িয়ে পড়ে। অল্পকিছু পরই তিনি আধ্যাত্মিক জীবন যাপনে আত্মনিয়োগ করেন। তখন থেকে তিনি বাকি জীবন একজন সুফি সাধক হিসেবে অতিবাহিত করেন।

হজরত বড়পীর সৈয়দ আব্দুল কাদের জিলানী (ক.)-এর বংশধর ও উক্ত তরিকার খেলাফতপ্রাপ্ত সৈয়দ আবু শাহামা মুহাম্মদ ছালেহ আল কাদেরী লাহোরী (র.)-এর নিকট বায়েত গ্রহণের মাধ্যমে বেলায়ত অর্জন করেন হজরত মওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (ক.) এবং সৈয়দ দেলওয়ার আলী পাকবাজ (র.)-এর কাছ থেকে তিনি এত্তাহাদি কুতুবিয়তের ক্ষমতা অর্জন করেন। তিনি দিনে দ্বীনি শিক্ষাদান ও রাতে এবাদত ও রেয়াজতের মাধ্যমে সময় কাটাতেন। কঠোর সাধনার ফলে তিনি আধ্যাত্মিক জগতের সর্বোচ্চ বেলায়ত অর্জন করেছিলেন।

হজরত মওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (ক.) তার পীরে তরিকতের নির্দেশে ১৮৫৭ সালে নিজ গ্রাম মাইজভান্ডারে ফিরে আসেন। আধ্যাত্মিক সাধক ও দোয়াপ্রত্যাশীর ভিড়ে এই সাধকের পবিত্র বাসগৃহ বিশ্বমানবতার কল্যাণ ধারক এক উচ্চমার্গীয় আধ্যাত্মিক দরবারে পরিণত হয়। লোকসমাজে পরিচিতি পায় ‘মাইজভান্ডার দরবার শরিফ’ হিসেবে। দিনে দিনে তার অসংখ্য কারামত বা অলৌকিক ঘটনা মানুষ প্রত্যক্ষ করতে থাকেন, যা বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ আছে।

আধ্যাত্মিক উন্নতির মূল ভিত্তি ‘তাযকিয়াতুন নফস’ অর্থাৎ মানুষের নফস বা কুপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে খোদাপ্রেম অর্জনের পথকে সহজতর করতে হজরত শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (ক.) প্রবর্তিত মাইজভান্ডারী তরিকার মূল জীবন দর্শন ও আধ্যাত্মিক সাধনার মূল সাত নীতি হলো ‘উসুলে সাবআ’ বা ‘সপ্তকর্ম পদ্ধতি’।

এই সপ্তকর্ম পদ্ধতির প্রথম ভাগের তিনটি স্বর হলো ‘ফানায়ে ছালাছা’ অর্থাৎ রিপুর ত্রিবিধ বিনাশ: ১) ফানা আনিল থালক (সৃষ্টিগত নির্ভরশীলতা থেকে মুক্তি বা আত্মনির্ভরশীলতা) অর্থাৎ সৃষ্টিজগত বা অন্য কারও ওপর নির্ভর না করে শুধু সৃষ্টিকর্তার ওপর নির্ভরশীল হওয়া। ২) ফানা আনিল হাওয়া (অনর্থ পরিহার) অর্থাৎ পরনিন্দা, গিবত বা অসার কথাবার্তা পরিহার করে জবান ও মনকে সংযত রাখা। ৩) ফানা আনিল ইরাদা (নিজ বাসনা ত্যাগ করা) অর্থাৎ নিজের ব্যক্তিগত কামনা-বাসনাকে আল্লাহর ইচ্ছার সঙ্গে বিলীন করে দেওয়া।

দ্বিতীয় ভাগের চারটি স্বর হলো ‘মউতে আরবা’ অর্থাৎ চার প্রকার আধ্যাত্মিক মৃত্যু: ৪) মউতে আবইয়াজ (শ্বেত মৃত্যু) অর্থাৎ পরিমিত আহার, কম ঘুমানো এবং বিলাসিতা বর্জনের মাধ্যমে ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ করা। ৫) মউতে আসওয়াদ (কৃষ্ণ মৃত্যু) অর্থাৎ নিজের সমালোচনা হাসিমুখে সহ্য করা এবং অন্যের প্রতি ক্রোধ বা প্রতিহিংসা দমন করা। ৬) মউতে আমার (রক্ত মৃত্যু) অর্থাৎ লোভ, লালসা এবং তীব্র কামনা-বাসনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে কুপ্রবৃত্তি দমন করা। ৭) মউতে আখজার (সবুজ মৃত্যু) অর্থাৎ বাহ্যিক চাকচিক্য বা জৌলুস বর্জন করে সাদামাটা ও স্বচ্ছ জীবন-যাপন করা।

সব ধরনের বর্ণ, শ্রেণি-বৈষম্য নির্মূল করে সমাজে ন্যায়পরায়ণতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠা, মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতা প্রদান এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি উদার, সহমর্মিতা ও নাগরিক সাম্যপূর্ণ সম্প্রীতির শিক্ষাই হলো মাইজভান্ডারী দর্শনের মূল শক্তি। সব ধর্মের মানুষের প্রতি প্রেম ও সহনশীলতার শিক্ষা দেয় এই সমন্বয়বাদী সুফি তরিকা। সব ধরনের জড়তা ও গোত্রীয় সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি ও জাতীয় ঐক্যের সুমহান নিদর্শন হতে পারে এ মাইজভান্ডারী তরিকা।

এ দরবার দর্শনে চক্ষু শীতল হয়, হৃদয় প্রশান্তি অনুভব করে। আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে মহান রাব্বুল আলামিনের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপনই হলো সুফিবাদ। কল্পকে কলুষমুক্ত করে আল্লাহর প্রেম অর্জন, স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আধ্যাত্মিক ধ্যান ও জ্ঞানের মাধ্যমে জানার প্রচেষ্টাই সুফিবাদের মর্মকথা।

উপমহাদেশে সুফিবাদের অন্যতম তীর্থস্থান মাইজভান্ডারী তরিকার অনুসারী হয়ে দেশ ও জনগণের সেবায় নিয়োজিত হয়েছে লাখ লাখ ভক্ত অনুরাগী। আল্লাহর আনুগত্য লাভের জন্য আধ্যাত্মিকতার দীক্ষা নিতে মানুষের সমাগম হয়। নানান ধর্মের, জাতের বর্ণের মানুষ আসে মনের নানান আকুতি, ব্যাকুলতা নিয়ে। হজরত মওলানা শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (ক.) পুণ্যময় জীবনাদর্শের পরশ ও মহান আধ্যাত্মিক জ্যোতির প্রভায় অজ্ঞানতার গভীর অন্ধকার থেকে জাতির কলঙ্কময় জীবনের অবসান ঘটুক। আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজ গড়ে উঠুক। ভ্রান্ত ধারণা ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে সমাজ রক্ষা করতে মাইজভান্ডারী আদর্শ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মাইজভান্ডারী তরিকার আধ্যাত্মিক গভীরতা ও বিশালতা সম্পর্কে বোঝা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে পবিত্রভাবে জীবনযাপন করার তাওফিক দান করুন, আমিন।

লেখক: কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভোটের দিন ফজর নামাজ পড়ে কেন্দ্রে যাবেন, ফলাফল নিয়ে ঘরে ফিরবেন : কায়কোবাদ

‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে জাতি দায়মুক্ত হতে পারে না’

সন্ত্রাসী হামলায় ১০ সাংবাদিক আহত

বিশ্বকাপ বয়কটের দাবি জোরালো হচ্ছে

সাফে ব্যর্থতার নেপথ্যে কি ইনতিশার!

নারীদের মর্যাদা নিশ্চিত হবে এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই : জামায়াত আমির

ফুটবল মাঠে বন্দুকধারীদের তাণ্ডব, প্রাণ গেল ১১ জনের

আইইউবিএটির সমাবর্তনে বৈশ্বিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব পররাষ্ট্র উপদেষ্টার

রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও নীরবতার সময় ডাভোসে ট্রাম্প

ভারত বিশ্বকাপের অ্যাক্রিডিটেশন বাতিল, প্রতিক্রিয়ায় যা বললেন সাংবাদিকরা

১০

এই নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি বানানোর নয়, রাষ্ট্র বিনির্মাণের :  রবিউল

১১

পাগড়ি পরিয়ে ৩৫ কোরআনে হাফেজকে সম্মাননা

১২

ঢাবির বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ

১৩

নুরুদ্দিন অপুর ধানের শীষের সমর্থনে এক হলেন শরীয়তপুর ৩ আসনের সব দল

১৪

ডাকসু সদস্য সর্বমিত্র চাকমাকে শোকজ

১৫

আশি বছর বয়সী তুতা মিয়ার জীবন কাটে রিকশার প্যাডেলে

১৬

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা : রবিন

১৭

বিএনপি নেতা আনম সাইফুলের মা জাহানারা বেগম আর নেই

১৮

ইরানে হামলায় নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দেবে না আমিরাত

১৯

সবার জন্য ন্যায়বিচার ও কর্মসংস্থানের বাংলাদেশ গড়া হবে : জামায়াত আমির

২০
X