

সৌরবিদ্যুতের প্রতি অবহেলা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতকে বিদ্যুতের প্রধান সূত্রে পরিণত করা সময়ের দাবি। অথচ, ২০২৬ সালের মে মাসেও বাংলাদেশে মাত্র সতেরোশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে নবায়নযোগ্য উৎসগুলো থেকে, যা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের দশ শতাংশেরও কম। অথচ পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন এরই মধ্যে ছয় হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ে সক্ষম হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। ভারতে নবায়নযোগ্য উৎসগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এরই মধ্যে ত্রিশ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে। এমনকি, ভিয়েতনাম তাদের বিদ্যুৎ চাহিদার ত্রিশ শতাংশ মেটাচ্ছে নবায়নযোগ্য সূত্রগুলো থেকে। বাংলাদেশের ‘সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ (ঝজঊউঅ) তাদের ঘোষিত ন্যাশনাল সোলার এনার্জি রোডম্যাপে ৩০ হাজার মেগাওয়াটের সোলার এনার্জির টার্গেট অর্জনের সুপারিশ করেছে, যার মধ্যে ১২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ছাদভিত্তিক সোলার প্যানেল থেকে আহরণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু, এ রোডম্যাপ ঘোষণার পর কয়েকবছর অতিবাহিত হলেও এ টার্গেট পূরণের উপযুক্ত কর্মসূচি গৃহীত হয়নি। দেশের বড় বড় নগর ও মফস্বল শহরের প্রাইভেট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িগুলোর ছাদ ব্যবহারের মাধ্যমে ৭ থেকে ৮ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন মোটেও অসম্ভব মনে হচ্ছে না, প্রয়োজন হবে সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির ভর্তুকি-দাম কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতির ওপর আরোপিত শুল্ক হ্রাস এবং যুগোপযোগী ‘নেট মিটারিং’ পদ্ধতি চালু করা।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ড. ফাওজুল কবির খান মন্তব্য করেছিলেন যে, বাংলাদেশের জন্য সৌরবিদ্যুৎ সবচেয়ে উপযোগী বিদ্যুতের উৎস হিসেবে সরকারের অগ্রাধিকারের দাবিদার। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, দেশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট জমি নেই বলে যে ধারণা রয়েছে, সেটা ভুল। তিনি রেলওয়ের নিজস্ব জায়গা এবং মহাসড়কের পাশের জায়গার কথা উল্লেখ করেছিলেন। আমি তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি জমির স্বল্পতার মিথ্যা ধারণাটি যে ভুল, সেটা দেখিয়ে দেওয়ার জন্য। আমি তার সঙ্গে একমত যে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে দশ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খুবই সম্ভব, যদি এ ব্যাপারে যথাযথ অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়। আমার কলামে আমি আরও কতগুলো সম্ভাব্য স্থানের তালিকা দেব, যেখানে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা যাবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে চারটি আমদানিকৃত কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ প্লান্ট নির্মাণ বাস্তবায়িত হয়েছে। এগুলো হলো পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর প্রতিটিই মেগা প্রকল্প, যেগুলো থেকে প্রায় ৫২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু, এ প্লান্টগুলো স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাঝখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে গেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে কয়লার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম অনেকখানি বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে মারাত্মক ধস নামায় এখন এ বর্ধিত দামে এসব বিদ্যুৎ প্লান্টের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা আমদানির ব্যাপারে বাংলাদেশের সক্ষমতা অনেকখানি সংকুচিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে অত্যন্ত কঠোরভাবে আমদানি নিয়ন্ত্রণ নীতিগ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে চলেছে নিজেদের বাণিজ্য ঘাটতি ও ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের কারেন্ট অ্যাকাউন্টের ঘাটতিকে মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে। এর ফলে, নির্মাণ সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও কয়লার অভাবে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রায়ই বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে মনে করা হচ্ছে যে, আমদানিকৃত কয়লানির্ভর বিদ্যুতের মেগা প্রকল্প স্থাপনের পুরো ব্যাপারটিই বাংলাদেশের জন্য অসহনীয় বোঝা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। মরার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে ভারতের আদানি গ্রুপ থেকে অত্যন্ত অন্যায্য শর্তে বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি করে গেছেন পতিত স্বৈরশাসক হাসিনা, যে চুক্তি থেকে বেরোনোর কোনো উপায় এখনো খুঁজে পাচ্ছে না দেশের বর্তমান বিএনপি সরকার। এ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী অনেক বেশি দামে বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে আদানির ঝাড়খন্ডের গড্ডা প্রকল্প থেকে!
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইরান বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ বিপর্যয়ে পতিত হয়েছে। এলএনজিচালিত বেশিরভাগ বিদ্যুৎ প্লান্ট বন্ধ থাকছে। প্রায় সাতাশ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্যাপাসিটি অর্জন সত্ত্বেও দৈনিক উৎপাদনকে এখন তেরো থেকে চৌদ্দ হাজার মেগাওয়াটে সীমিত রাখতে হচ্ছে। এ সংকটের জন্য প্রধানত দায়ী আমদানিকৃত এলএনজিনির্ভর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন নীতি, যার পাশাপাশি এখন কয়লানির্ভর মেগা প্রকল্পগুলোও বড়সড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, কয়েকজন প্রভাবশালী এলএনজি আমদানিকারককে অন্যায্য সুবিধা দেওয়ার জন্য সাবেক হাসিনা সরকারের সময় এ আমদানিকৃত এলএনজিনির্ভরতার নীতি গৃহীত হয়েছিল। এ নীতির কারণে দৃশ্যত একদিকে ইচ্ছাকৃত অবহেলার শিকার হয়েছে গ্যাস অনুসন্ধান, আর অন্যদিকে যথাযথ অগ্রাধিকার পায়নি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ যে, দেশের স্থলভাগে গত ষোলো বছরে কয়েকটি ছোট গ্যাসকূপ ব্যতীত উল্লেখযোগ্য তেল-গ্যাস ক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ভোলা গ্যাসের ওপর ভাসছে বলা হলেও ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের মূল ভূখণ্ডে আনার কাজটি এখনো শুরু হয়নি! ২০১২ ও ২০১৪ সালে মিয়ানমার ও ভারতের বিরুদ্ধে মামলায় জিতে বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্রসীমার নিয়ন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও মামলায় জেতার পর ১২ থেকে ১৪ বছরে সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান চালানো হয়নি। গত ২০২৩ সালে সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য পেট্রোবাংলা আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করেছিল, কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। আমরা জানি যে, বাংলাদেশের সেন্টমার্টিনের অদূরে মিয়ানমার তাদের সমুদ্রসীমা থেকে পাঁচ টিসিএফের বেশি গ্যাস আহরণ করে চলেছে। একই ভূতাত্ত্বিক কাঠামো যেহেতু বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায়ও রয়েছে, তাই বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন এলাকার সমুদ্রেও গ্যাস পাওয়া যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের দৃঢ় অভিমত। ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের উপকূলের কাছাকাছি বঙ্গোপসাগরের গোদাবরী বেসিনে ভারতও এরই মধ্যেই বিশাল গ্যাস ও তেলক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। আমরা আশা করছি, বর্তমান বিএনপি সরকার অনতিবিলম্বে সমুদ্রের ব্লকগুলোয় বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
দেশের বিদ্যুৎ খাতের জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা থেকে নিষ্কৃতি পেতে হলে চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের সোলার পাওয়ারের সাফল্য কীভাবে অর্জিত হয়েছে, তা জেনে এদেশের সোলার-পাওয়ার নীতিকে অবিলম্বে ঢেলে সাজাতে হবে।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে অনেক খালি জায়গা লাগে বিধায় বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে তা উৎপাদন সম্ভব নয় বলে যে ধারণা রয়েছে, তা-ও ঠিক নয়। আমার প্রস্তাব, বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা চরাঞ্চলসমূহ, দেশের সমুদ্র-উপকূল এবং নদনদী ও খালগুলোর দুপাড়ে সোলার প্যানেল স্থাপনের সম্ভাবনাটি খতিয়ে দেখা হোক। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সীমানায় যে কয়েকশ চরাঞ্চল গড়ে উঠছে, সেগুলোয় জনবসতি গড়ে ওঠার আগেই যদি বড় বড় সৌরবিদ্যুৎ-কাম-বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা অগ্রাধিকার সহকারে বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে অত্যন্ত সাশ্রয়ী পন্থায় কয়েক হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সম্ভব হবে। সম্প্রতি জার্মানি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে বাংলাদেশকে বিপুলভাবে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বলে সোশ্যাল মিডিয়ার একটি নিউজ-ক্লিপ জানিয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে বাংলাদেশে জমির তুলনামূলক স্বল্পতার প্রকৃত সমাধান পাওয়া যাবে যদি দেশের বিশাল সমুদ্র-উপকূলে একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্ট স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়।
সম্প্রতি বিএনপি সরকার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে অগ্রাধিকার প্রদানের জন্য নীতিমালা ঘোষণা করেছে। কিন্তু, বেসরকারি ভবনগুলোর জন্য ভারতের ‘পিএম রুফটপ সোলার পাওয়ার যোজনার’ আদলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে প্রণোদনা প্রদানের জন্য কোনো নীতিমালা গৃহীত হয়নি। এ অবহেলা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। ‘নেট মিটারিং’ প্রযুক্তি আমদানি ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করার জন্য উপযুক্ত ভর্তুকি নীতিমালা বাস্তবায়নকে কেন অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে না, তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। আমি এ ব্যাপারে অবিলম্বে সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণার জোর দাবি জানাচ্ছি।
লেখক: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ এবং অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়