

পুরো বিশ্ব কাঁপছে ফুটবল বিশ্বকাপজ্বরে। সেই কাঁপুনি অনুভূত হচ্ছে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশেও। এর মধ্যেও সাধারণ মানুষের চোখ দেশের বার্ষিক জাতীয় বাজেটের দিকে। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট বৃহস্পতিবার (১১ জুন)। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীরও প্রথম বাজেট এটি। সে হিসেবে তার জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সরকার ও অর্থমন্ত্রীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তুলতে যতটা শক্তি ও কৌশল দরকার, বাজেটের মাধ্যমে তা দিতে পারবে কি না।
অর্থমন্ত্রী আজ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ সালের বাজেট পেশ করবেন। অর্থ বিভাগ সূত্র বলছে, এবারের বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যেখানে চলতি ২০২৫-২৬ সালের সংশোধিত বাজেটে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি বাজেটের তুলনায় আগামী অর্থবছর সরকারকে ব্যয় করতে হবে ১৯ শতাংশ বেশি। চলতি বছরের মূল বাজেটে ব্যয়ের লক্ষ্য ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা।
আগামী অর্থবছরের যে ব্যয় ধরা হয়েছে তার মধ্যে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা চলে যাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ, ভর্তুকি প্রণোদনা ও নগদ ঋণসহ পরিচালন ব্যয় খাতেই। বাকি মাত্র ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা ধরা হয়েছে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য।
দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বিশাল এই ব্যয়ের জন্য আয়ের সংস্থান করাটা বড় একটি চ্যালেঞ্জ। ১০ মাস ধরে দেশের রপ্তানি কমছে। ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট কাটেনি। উল্টো খেলাপি ঋণ বাড়ছে। ইরান যুদ্ধের কারণে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বেড়েছে, যা উৎপাদনের খরচ বাড়িয়েছে। রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের কিছুই হয়নি। ফলে তৈরি পোশাকের ওপর ভর করে চলছে রপ্তানি আয়। ব্যাংক খাতের ঋণের সুদহার এখনো ১৫ শতাংশের বেশি, যা স্থানীয় বিনিয়োগের জন্য মোটেই সহায়ক নয়। এসব কারণে সরকার আগামী বাজেটে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়বে এমন প্রত্যাশাও করতে পারছে না। আগামী বাজেটে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ লক্ষ্য ধরা হয়েছে জিডিপির ২১ দশমিক ৪০ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে কম। চলতি বছর বেসরকারি বিনিয়োগ লক্ষ্য ছিল ২২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
এমন পরিস্থিতিতে আগামী বছর বাজেট ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আয় বাড়িয়ে ব্যয়ের সঙ্গে কতটা সমন্বয় করতে পারবে, এটা বড় একটা প্রশ্ন।
সরকার আগামী অর্থবছর পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে বেতন-ভাতা, মূলধনি ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে মোট ৫ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে চায়। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের জন্য ধরা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা; বৈদেশিক ঋণের সুদের জন্য রেখেছে ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
টাকা আসবে কোথা থেকে: আগামী বাজেট ব্যয় মেটাতে সরকার মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি বছরের বাজেট লক্ষ্যের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। সরকারের এই রাজস্ব লক্ষ্য জিডিপির ১০ দশমিক ১ শতাংশ।
সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরেছে, যা চলতি বছরের তুলনায় ২১ শতাংশ বেশি। এনবিআরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি বছরের রাজস্ব আয়ে গত ১০ মাসেই (জুলাই-এপ্রিল) শুল্ক-কর আদায়ে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকার ঘাটতিতে পড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এনবিআরের শুল্ক-কর আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। এ সময়ে এনবিআর আদায় করতে পেরেছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এনবিআরের আদায় কম হয়েছে ২৪ শতাংশের বেশি। যদি আগামী বাজেটের অর্থ সরবরাহ করতে হয়, তবে আগামী বছর এই ২৪ শতাংশ তো পূরণ করতেই হবে, সঙ্গে বাড়তি আরও ২১ শতাংশ আদায় করতে হবে।
চ্যালেঞ্জ শুধু এনবিআরের মাধ্যমে কর আদায়ের ক্ষেত্রেই নয়; এনবিআরের বাইরের কর আদায় এবং করের বাইরে অন্যান্য খাত থেকে রাজস্ব আদায়ও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এনবিআরের বাইরে কর আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি বাজেটের তুলনায় ৬ হাজার কোটি টাকা বেশি।
বাজেটের মোট রাজস্ব আয়ের মধ্যে বাকি ৬৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে কর ছাড়া আয় (নন ট্যাক্স রেভিনিউ) খাত থেকে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছর ২০২৫-২৬ সালের মূল বাজেটে এ খাত থেকে সরকার আয় ধরেছিল ৪৬ হাজার কোটি টাকা। বাড়তি এই আয়ের সংস্থানের জন্য বিভিন্ন সেবা ফি বা চার্জ, সরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আয় ইত্যাদি বাড়াতে হবে, যা সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ ছাড়া সরকার বৈদেশিক অনুদান থেকে ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য ধরেছে, যা চলতি বাজেটে ছিল ৫ হাজার কোটি টাকা।
ঘাটতি মিটবে কীভাবে: রাজস্ব আয় দিয়ে পুরো বাজেট ব্যয় মিটবে না। ফলে সরকারকে নির্ভর করতে হবে ব্যাংক ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তার ওপর। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন খাতের ব্যয় মেটাতে বাজেটের ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার, যার মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে নেবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা।
বৈদেশিক ঋণের এ লক্ষ্যমাত্রা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮৪ শতাংশ বেশি এবং হাসিনা সরকারের পতনের আগের সর্বশেষ বাজেটে প্রাপ্ত বৈদেশিক সহায়তার চেয়ে ৬৬ শতাংশ বেশি।
সরকারের এই ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বেসরকারি খাতে মূলধন জোগান ধীর হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও ধীরগতি হয়ে যেতে পারে। যদিও সরকার বলছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বাড়াতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো হবে। আগামী অর্থবছর সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির সাড়ে ৩৪ শতাংশে নিয়ে যেতে চায় সরকার। চলতি অর্থবছরের জন্য মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল। আগামী বাজেটে সরকারি বিনিয়োগ দ্বিগুণ বাড়িয়ে জিডিপির ১৩ দশমিক ১০ শতাংশ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে বাজেটে। চলতি অর্থবছর যা ছিল জিডিপির ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।
জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির উল্টোগতি: আগামী বাজেটে অর্থমন্ত্রীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি। মূল্যস্ফীতি কমানোর পদক্ষেপে কী রয়েছে, তার দিকে তাকিয়ে থাকেন সাধারণ মানুষ। আর জিডিপির প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন।
আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি বছরের এপ্রিলে দেশে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ। আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে সংশোধিত বাজেটে তা কিছুটা বাড়িয়ে ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও সেটার কাছাকাছিও যেতে পারেনি সরকার।
যদিও অর্থমন্ত্রী বলেছেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় রাখা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, এজন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বাজার তদারকি জোরদার করা এবং নিম্নআয়ের পরিবারকে সহায়তার আওতায় আনার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত হতে প্রতি বছর যে হারে জিডিপির প্রবৃদ্ধি দরকার, সে হিসাবে সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পরিকল্পনা নিয়েছে বাজেটে, যা চলতি অর্থবছরের জন্য ৫ দশমিক ৫ শতাংশ রয়েছে।
যদিও আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থা বলছে, চলতি অর্থবছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫ শতাংশের নিচে। আর আগামী অর্থবছর এটি আরও কমতে পারে বলে মনে করছে তারা।
এ বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ—এমন পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। আর আগামী অর্থবছরে এই জিডিপি প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।