

ইরান সম্পর্কে ইসরায়েল গত ৩০ বছর ধরে যে বর্ণনা তুলে ধরেছে, যার প্রভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিপর্যয়কর ও আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, সেটি কি আসলে সবসময়ই একটি কল্পকাহিনি ছিল? তেল আবিবে তৈরি একটি রাজনৈতিক গল্প? ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বহু বছর ধরে দাবি করে আসছেন, ইরান ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। কিন্তু বাস্তবে কি ইসরায়েলের উদ্বেগ ছিল অন্য কিছু? শক্তিশালী একটি ইরান কি ওয়াশিংটনের ওপর ইসরায়েলের একচেটিয়া প্রভাবকে দুর্বল করে দিতে পারত? মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র এবং কার্যত কোনো আন্তর্জাতিক নজরদারিবিহীন পারমাণবিক শক্তি হিসেবে তার অবস্থান কি তখন প্রশ্নের মুখে পড়ত? বিশ্বের বড় একটি অংশ কি অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ছে শুধু এ কারণে যে, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে চায়? এমন একটি রাষ্ট্র, যার বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা এবং দক্ষিণ লেবাননে জাতিগত উচ্ছেদের অভিযোগ রয়েছে? গত সপ্তাহে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। লেখকের মতে, এ প্রশ্নগুলোর উত্তর স্পষ্ট এবং দ্ব্যর্থহীনভাবে ‘হ্যাঁ’।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহু শুধু ট্রাম্পকে এ ধারণা দেননি যে, স্বল্প সময়ের তীব্র বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানে দ্রুত সরকার পরিবর্তন সম্ভব হবে। তিনি হোয়াইট হাউসকে এটিও জানিয়েছিলেন যে, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বিকল্প হিসেবে কাকে ক্ষমতায় আনা হবে। অবিশ্বাস্য হলেও, পত্রিকাটির দাবি অনুযায়ী নেতানিয়াহু এ ভূমিকার জন্য সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। পরিকল্পনা ছিল, বিমান হামলার শুরুতেই খামেনিকে হত্যা করা হবে। এরপর গৃহবন্দি অবস্থায় থাকা আহমাদিনেজাদকে মুক্ত করা হবে, তার পাহারায় থাকা নিরাপত্তা সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে। ধারণা করা হয়েছিল, এরপর আহমাদিনেজাদ দ্রুত ক্ষমতার কেন্দ্র দখল করবেন। কিন্তু পরিকল্পনার মাত্র একটি অংশই সফল হয়েছিল। খামেনির হত্যাকাণ্ড। জানা যায়, আহমাদিনেজাদকে আগেই পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছিল। তবে তার বাড়ির কাছে ইসরায়েলি হামলায় তিনি আহত হন বলে ধারণা করা হয়। পরে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সম্ভবত তিনি সন্দেহ করেছিলেন যে তাকেও হত্যার ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। এরপর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। বর্তমানে তিনি কোথায় আছেন বা তার শারীরিক অবস্থা কী, তা জানা যায় না।
সর্বোচ্চ আতঙ্কের প্রতীক: যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কোনো কর্মকর্তাই এ কথিত সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের কাছে মন্তব্য করেননি। পত্রিকাটি এই পরিকল্পনাকে ‘দুঃসাহসী’ বলে বর্ণনা করেছে। লেখকের মতে, এ শব্দটি বাস্তবতার তুলনায় অনেক মৃদু। আহমাদিনেজাদের যে জনপ্রিয় সমর্থন, ধর্মীয় কর্তৃত্ব বা সামরিক শক্তি ছিল না, তা সুপরিচিত। বিশেষ করে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মতো শক্তিশালী সামরিক প্রতিষ্ঠানের মোকাবিলা করার সামর্থ্য তার ছিল বলে মনে করার কোনো ভিত্তি নেই। তবু হোয়াইট হাউসের কেউ যদি এ পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে, তাহলে সেটি অত্যন্ত বিস্ময়কর। তবে লেখকের মতে, পুরো পরিকল্পনার মধ্যে আহমাদিনেজাদের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের ধারণাই সম্ভবত সবচেয়ে কম অবাস্তব অংশ। তরুণ পাঠকদের অনেকেই হয়তো আহমাদিনেজাদের নামের সঙ্গে পরিচিত নন। কিন্তু অন্যদের মনে থাকার কথা, ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর দীর্ঘ সময় তিনি প্রায় প্রতি সপ্তাহেই আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনামে থাকতেন। এর প্রধান কারণ ছিল, ইসরায়েল তাকে বিশ্বের সামনে এক ভয়ংকর হুমকির প্রতীকে পরিণত করেছিল।
গণহত্যার অভিপ্রায়: কিছুদিন পর ইসরায়েলের এ প্রচারণা লন্ডনে আরও জোরালো রূপ নেয়। নেতানিয়াহু ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্যদের বলেন, আহমাদিনেজাদকে তার ‘ধর্মীয় ও প্রলয়মুখী বিশ্বদৃষ্টির’ কারণে জরুরিভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচার করা উচিত। ঘটনার বিদ্রুপাত্মক দিক হলো, দুই দশক পরে সেই একই আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখোমুখি হয়েছেন নেতানিয়াহু নিজেই। গাজায় মানুষের খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবু সে সময় তিনি আহমাদিনেজাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন যে, তার মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি গণহত্যামূলক উদ্দেশ্য কাজ করছে। ‘১৯৩০-এর দশকেও কেউ বিশ্বাস করত না যে, হিটলার এমন পদক্ষেপ নিতে পারে, কারণ সে প্রকাশ্যে ইহুদি জনগণকে নিশ্চিহ্ন করার কথা বলত না’, নেতানিয়াহু ব্রিটিশ সংসদ সদস্যদের বলেছিলেন। ‘কিন্তু ইরানের প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যেই তার উদ্দেশ্যের কথা ঘোষণা করছেন, তবুও কেউ তাকে থামানোর চেষ্টা করছে না।’
সেই বৈঠকের সভাপতি ছিলেন ব্রিটেনের সাবেক কনজারভেটিভ মন্ত্রী মাইকেল গোভ। তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে একমত পোষণ করেন, যদিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হাজার হাজার ইহুদি ইরানে বসবাস করে আসছেন।
গোভ বলেন, আহমাদিনেজাদের বক্তব্য শুধু উদ্বেগজনক নয়, এটি কার্যত গণহত্যায় উসকানি দেওয়ার শামিল। তবে গণহত্যা নিয়ে গোভের এ উদ্বেগ পরে গাজায় প্রয়োগ হতে দেখা যায়নি। গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে যারা গণহত্যা বলে উল্লেখ করেছেন, তাদের মধ্যে আইন বিশেষজ্ঞ ও হলোকাস্ট গবেষকরাও ছিলেন। গোভ বারবার তাদের সমালোচনা করেছেন।
গাজায় ব্যাপক প্রাণহানির মধ্যেও তিনি এমনকি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা: পশ্চিমা রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যম দাবি করেছিল, আহমাদিনেজাদ ইসরায়েলকে ‘মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার’ আহ্বান জানিয়েছেন। এটি এমনভাবে প্রচার করা হয়েছিল—যেন তিনি ইসরায়েলের ওপর পারমাণবিক হামলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। বাস্তবে তিনি খোমেনির সেই পর্যবেক্ষণ পুনরাবৃত্তি করেছিলেন যে, অন্য একটি জনগোষ্ঠীকে দমন করে গড়ে ওঠা একটি ইহুদি আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েল অনির্দিষ্টকাল টিকে থাকতে পারবে না।
তিনি বলতে চেয়েছিলেন, বর্ণবাদী রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ সীমিত। যেমন একসময় দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনেরও অবসান ঘটেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে খোমেনির বক্তব্যের অর্থ আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কারণ এখন ইরান নয়, ইসরায়েলই গাজা ও দক্ষিণ লেবাননে মানুষ এবং জনপদ ধ্বংস করার অভিযোগের মুখে রয়েছে।
একইভাবে, ২০০৬ সালে তেহরানে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলন নিয়েও ইসরায়েল এবং তার পশ্চিমা মিত্ররা ব্যাপক সমালোচনা করেছিল। সেটিকে ‘হলোকাস্ট অস্বীকার’ সম্মেলন হিসেবে তুলে ধরা হয়।
বিভীষিকার মঞ্চ: লেখকের মতে, ২০০৬ সালেই ইরান সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্যের অসংগতিগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারত, যদি সেগুলো সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হতো। আজও একই কথা প্রযোজ্য। যদি পশ্চিমা সাংবাদিকরা তাদের কাজ যথাযথভাবে করতেন এবং কেবল ইসরায়েল বা হোয়াইট হাউসের বক্তব্য পুনরাবৃত্তি না করতেন, তাহলে এসব বৈপরীত্য আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসত। লেখকের ভাষায়, ট্রাম্প এক জেদি শিশুর মতো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। একই সঙ্গে তেলের বাজারের অস্থিরতা থেকেও লাভবান হচ্ছেন। তিনি পুরোনো নিয়ম চাপিয়ে দিতে চাইছেন, অথচ পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ আর এককভাবে তার হাতে নেই।
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক। মিডল ইস্ট আইয়ে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন তহমিনা মিলি