

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৯ বছর পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে। এরই মধ্যে সরকারের একশ দিন গত হয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় প্রথাগতভাবে লক্ষ করা যায় যে, বিভিন্ন দেশে সরকারের একশ দিনের কর্মকাণ্ড, অর্জন, সফলতা ও ব্যর্থতার চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের একশ দিনের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, সরকার তার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কিছু কাজ দৃশ্যমান করতে সক্ষম হয়েছে, যদিও সেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়বনের পরিপূর্ণ রূপ দেখতে আমাদের কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। তবে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছা বিশেষ করে সরকারপ্রধানের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা জনগণের মাঝে আশার সঞ্চার করেছে। কেননা, সরকার গঠনের মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রতিশ্রুত ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ ছাড়া খাল খনন কর্মসূচি চালুকরণ থেকে শুরু করে শিক্ষা খাতে পরিমার্জন ও যুগোপযোগী জনদক্ষতা সৃষ্টিতে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের কাজ হাতে নিয়েছে সরকার। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ২১টি জেলার পানি সংকট নিরসনে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে ওই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানি সমস্যার নিরসন হবে, যা কৃষি খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। এ ছাড়া সামাজিক সুরক্ষার ওপর জোর দানের পাশাপাশি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পাচারকৃত অর্থ ফেরাতে এরই মধ্যে তিনটি দেশের সঙ্গে বর্তমান সরকারের চুক্তি হয়েছে। এ ছাড়া দেশ ও জাতির কল্যাণে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা ও কমিটমেন্ট জনসাধারণের মাঝে যথেষ্ট আশার সঞ্চার করছে। সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যদিও রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন চ্যালেঞ্জ, তবে আগামীতে সেসব সফলতার মুখ দেখবে বলে সাধারণ জনগণ প্রত্যাশা করছে।
মনে রাখতে হবে যে, একটি রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত নতুন পরিবেশে স্বভাবতই জনগণের মাঝে নতুন বন্দোবস্ত বাস্তবায়নের আকাঙ্ক্ষার পারদ অনেক উঁচুতেই থাকবে। সে আকাঙ্ক্ষার যথাযথ প্রতিফলন ঘটানো নবনির্বাচিত সরকারের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আর্থিক সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন ব্যাংক লুটপাটসহ আর্থিক খাতকে একটি নাজুক ও বিকলাঙ্গ অবস্থায় রেখে গেছে। এ খাতে প্রভূত উন্নয়ন সাধন একটি কঠিনতম কাজ। আর্থিক খাতে উন্নয়নের জন্য যদি সরকার জনগণের ওপর অযাচিত করের বোঝা চাপিয়ে দেয়, তাহলে যে জনপ্রিয়তা নিয়ে সরকার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছে, সেই জনপ্রিয়তা ধরে রাখা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে যাবে বইকি! সাধারণ মানুষ এখন পর্যন্ত আস্থাশীল যে সরকার এ চ্যালেঞ্জকে সুনিপুণভাবে মোকাবিলা করতে পারবে। সরকার জনগণের সেই প্রত্যাশা পূরণে সদা সচেষ্ট থাকবে, এটাই কাম্য।
পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসন পুনর্গঠন: আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলের দীর্ঘ ১৬ বছরের সীমাহীন স্বজনপ্রীতি, দলীয় ও রাজনীতিকীকরণের কারণে পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদপদবিধারীদের মাঝে চরম অপেশাদার মনোভাবের সৃষ্টি হয়েছে এবং জবাবদিহির অভাবে তারা স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন, যার ফলে প্রশাসন পরিচালিত হতো একটি বিশেষ গোষ্ঠীর ইচ্ছা-অনিচ্ছায়, ফলে প্রশাসনে দেখা দেয় স্থবিরতা। সে স্থবিরতা কাটিয়ে প্রশাসনে স্বাভাবিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনার মতো চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করে বর্তমান সরকার তা পুনর্গঠনের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এখানে উল্লেখ্য যে, আওয়ামী সরকারের আমলে বহুসংখ্যক যোগ্যতাসম্পন্ন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রোষানলে পড়ে দীর্ঘ ১৬ বছর শুধু তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকেই বঞ্চিত হননি; বরং বিভিন্নভাবে নির্যাতিতও হয়েছেন। তারা এখনো অপেক্ষায় রয়েছেন তাদের প্রাপ্য অধিকার ফিরে পাওয়ার। অন্যদিকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, পতিত সরকারের আমলের অনেক সুবিধাভোগীরাই এখনো সুকৌশলে প্রশাসনকে পরিচালন ও নিয়ন্ত্রণ করছেন, যা বঞ্চিতদের মাঝে বিশেষ ক্ষোভের সঞ্চার করছে এবং তা সরকারের যৌক্তিক ও সদয় দৃষ্টি প্রদান ও সুবিবেচনার দাবি রাখে!
জুলাই গণহত্যার বিচার ও আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন: বর্তমানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জিং কাজ হলো বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত কমিটির মাধ্যমে তদন্তসাপেক্ষে জুলাই গণহত্যার দ্রুততম বিচার নিশ্চিত করা এবং শহীদ পরিবারসহ সব আহতদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাকরণ, যা জাতীয় ঐক্য ও সংহতি ধরে রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্য সম্পাদন: ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত ইতিহাসের ভয়াবহতম নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারকার্য বর্তমান সরকারকে যথাযথভাবে সম্পাদন করতে হবে।
গুম, খুন, অপহরণে সংশ্লিষ্টদের বিচার: একটি স্বাধীন দেশে নাগরিকরা মুক্ত বাতাসে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেবে, মুক্ত চিন্তা করবে, নির্ভয়ে তাদের মতামত জানাবে এবং এসব যে তার নাগরিক অধিকার সেই ধারণা ও আস্থাকে প্রত্যেক নাগরিকের মাঝে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আওয়ামী সরকারের আমলে সংঘটিত সব গুম, খুন, অপহরণ ও আয়নাঘর প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা সরকারের জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্য এবং সরকার তা যথাযথভাবে পালন করবে সেটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
দুর্নীতিরোধ কার্যক্রম: বাংলাদেশে দুর্নীতি নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে একটানা সুদীর্ঘ ১৬ বছর ক্ষমতার মসনদে বসে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার সিস্টেম্যাটিক দুর্নীতির মাধ্যমে দুর্নীতিকে একটি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। সেই দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা কঠিন চ্যালেঞ্জিং কাজ হলেও বর্তমান সরকারকে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখাতে হবে এবং এটা পরিবর্তিত বাংলাদেশের জনগণের চাওয়া।
পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা: বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সূত্র থেকে জানা যায় যে, বিগত আওয়ামী সরকার ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমতুল্য টাকা অবৈধভাবে বিভিন্ন দেশে পাচার করেছে। সেই অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত দুরূহ কাজ হলেও এরই মধ্যে এ বিষয়ে তিনটি দেশের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন সাধারণের মাঝে কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে। পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জিং কাজে সরকার কতটুকু সফল হবে, সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকবে সাধারণ জনগণ। সে ব্যাপারে নিশ্চয়ই সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সচেতন থাকবেন সর্বদা।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: বিগত দিনের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও তা এখনো আশানুরূপ নয়, বিশেষ করে বিগত কয়েক সপ্তাহে ঘটে যাওয়া নারী ও শিশু ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো নাগরিকদের বিবেককে দারুণভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। মাদকের নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার তরুণ যুবাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে, যার ফলে সমাজে অপরাধ কার্যক্রম বহুমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হারানো মনোবল যত দ্রুত সম্ভব ফিরিয়ে এনে চেইন অব কমান্ড সুসংগঠিত করতে হবে, যাতে সবাই পেশাদারি মনোভাব নিয়ে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকে এবং অপরাধ দমনে সদা সতর্ক থাকে। সমাজ থেকে সব ধরনের অপরাধকে নির্মূলের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সব স্তরে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জনমত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই জনমতকে নিজেদের পক্ষে রাখা খুব জরুরি এবং তা রাখা সম্ভব শুধু ভালো কর্মের মাধ্যমে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান গত ১০০ দিনে তার সাদামাটা চালচলন, আচার-আচরণ এবং কর্মের মাধ্যমে জনগণের মন জয় করে চলেছেন। তবে কিছু দায়িত্বশীল মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত আচার-আচরণ ও অতিকথনের মাধ্যমে জনগণের মাঝে বেশ কিছুটা বিরক্তির উদ্রেক করেছেন। ভবিষ্যতে তারা এ ব্যাপারে সচেতন থাকবেন, এটাই জনগণের প্রত্যাশা। সবশেষে যে চ্যালেঞ্জটির কথা উল্লেখ করে আজকের লেখাটি শেষ করছি আর তা হলো—কিছু কিছু দলীয় নেতা ও কর্মীবাহিনীর বিরুদ্ধে জবরদখল ও চাঁদাবাজির যে অভিযোগ শোনা যায়, সে ব্যাপারে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। মনে রাখতে হবে রাজনীতিতে জনগণই শেষ ভরসা, ৫ আগস্ট তার জলজ্যান্ত প্রমাণ!
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার
কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক