বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শুক্রবার সন্ত্রাসীদের মধ্যে গোলাগুলিতে পাঁচ রোহিঙ্গা নিহত হয়। মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন খোদ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। তিনি বলেছেন, ‘মিয়ানমার সীমান্তের কিছু অংশ অরক্ষিত রয়েছে। নাফ নদে কয়েকটি চরের মতো জায়গাও রয়েছে, যেটি নো-ম্যানস ল্যান্ড। সেখানে সন্ত্রাসীরা অভয়ারণ্য তৈরি করেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও হয়তো সন্ত্রাসীদের
দু-চারজন অনুপ্রবেশ করেছে। তাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়ে থাকতে পারে। এখানে কে নেতৃত্ব দেবে, সেটা নিয়ে সংঘর্ষ হচ্ছে।’ শুক্রবার রাজধানীর নটর ডেম কলেজে এক আলোচনা শেষে তিনি এসব কথা বলেন। এই পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে দেশের জন্য উদ্বেগের।
২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে প্রাণ রক্ষার জন্য পালিয়ে আসা ৭ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাসহ অন্তত ১০ লাখ রোহিঙ্গা শুধু মানবিক কারণে আশ্রয় পায় বাংলাদেশে। এর পর থেকেই তাদের বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। মাদক চোরাকারবারি, চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই, খুন-রাহাজানিসহ সব অপরাধমূলক ঘটনা রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ফলে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই একাধিক সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৫১ জনের। এ ছাড়া দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্য বান্দরবান, কক্সবাজারসহ সংলগ্ন এলাকার পর্যটন শিল্পের ওপর পড়েছে ব্যাপক বিরূপ প্রভাব। এতে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে জনমনে বেড়েছে আতঙ্ক। সেইসঙ্গে রয়েছে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী হওয়ার অবৈধ প্রবণতা। তারা অবৈধভাবে পাসপোর্ট করে বিভিন্ন দেশে গিয়ে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট করার কাজেও লিপ্ত হয়েছে। পরিস্থিতি যে কেবল বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ হচ্ছে, তেমনটি নয়; দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর জন্যও হুমকি হয়ে উঠছে। ফলে এখন তাদের প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বারবার দাবি জানিয়ে এলেও এখন পর্যন্ত আশানুরূপ কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এমনকি এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলের কোনো সদিচ্ছাও লক্ষ করা যাচ্ছে না। উপরন্তু প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বানচাল করার নানামুখী আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলছে ঠিকই, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অপ্রত্যাশিত। আরেকটি বিষয় লক্ষ করার মতো। আশ্রয়ে থাকা রোহিঙ্গারা শুরু থেকেই নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে দ্রুত মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু মিয়ানমারের প্রশাসন প্রত্যাবাসনে আন্তরিক নয় আবার জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নানা অজুহাত দেখিয়ে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। এটি কোনো শুভ লক্ষণ নয়।
আমরা মনে করি, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে বাংলাদেশের কোনো আইনি দায়বদ্ধতা নেই। তারা যখন বিপদে পড়ে এখানে আসে, তখন বাংলাদেশ সরকার তাদের মানবিক জায়গা থেকে আশ্রয় দেয়। বিষয়টি তখন আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রশংসিত হয়। এখন সেটিই পরিণত হয়েছে বড় সংকটে। এই সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের নেতৃস্থানীয় দেশ ও সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশ এমনিতেই সংকটের মধ্যে, তার ওপর দ্রুত বর্ধনশীল এ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বোঝা এবং তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দেশের জন্য অশনিসংকেত। এই পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো আমরাও বলতে চাই, ‘রোহিঙ্গারা যত তাড়াতাড়ি তাদের দেশে ফেরত যাবে, ততই তাদের এবং আমাদের জন্য মঙ্গল।’
মন্তব্য করুন