আন্তঃনগর ট্রেনে কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য কেনা হয় লাগেজ ভ্যান। লক্ষ্য ছিল, রেলের আয় বাড়ানো ও রাজধানীতে খাদ্যপণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। সেইসঙ্গে কৃষক যেন উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান। গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর এ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সাবেক রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন।
সাড়ে চার মাস পর খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেলওয়ের এসব ভ্যানে আজ পর্যন্ত কোনো কৃষিপণ্য পরিবহন করা হয়নি। মাঝে মধ্যে ফার্নিচার পরিবহন হচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আয় হচ্ছে না। ইতোমধ্যে কয়েকটি ট্রেনে এই সার্ভিস বন্ধও হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনোরকম সমীক্ষা ছাড়াই ৩৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২৫ লাগেজ ভ্যান কিনে অল্প সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আগামী জুনের মধ্যে ২৮টি শীতাতপ কোচসহ ১২৫ লাগেজ ভ্যান পুরোদমে চালু করতে চায় রেলওয়ে। রেফ্রিজারেটর কোচে মূলত হিমায়িত খাদ্য পরিবহন করা হবে। অথচ হিমায়িত খাদ্য পরিবহন ও বাজারজাতকরণ নিয়ে রেলের কোনো প্রস্তুতি নেই।
টানা এক সপ্তাহ কমলাপুরে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক ট্রেনে পণ্যবাহী কামরা খালি যাচ্ছে। ফাঁকা দেখা গেছে পণ্য বুকিংয়ের গুদামও। তবে এ ব্যাপারে কোনো তথ্য নিতে নারাজ দায়িত্বে থাকা বুকিং সহকারীরা। তারা জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী গণমাধ্যমে তথ্য সরবরাহ নিষেধ। এরপর কালবেলার পক্ষ থেকে রেলওয়ের উচ্চ মহলে টানা দুই সপ্তাহ যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সব তথ্য পাওয়া যায়নি।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ছাড়া ব্যক্তিগত স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় রেলের বিপুল পরিমাণ অর্থ গচ্চা যেতে বসেছে। এর বড় প্রমাণ, কৃষিপণ্য আমদানির সঙ্গে যুক্ত কৃষক ও ব্যবসায়ীরা এ সেবা কাজে লাগাতে উৎসাহী নন। প্রয়োজনীয় সমীক্ষা না হলে কোনো প্রকল্প সফলতার মুখ দেখতে পারে না। তবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, লাগেজ ভ্যানের আয় বাড়াতে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এর আগে করোনার সময়ে রাজধানীতে খাদ্যপণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন জেলার সঙ্গে পার্সেল ও কৃষি ট্রেন চালু করেছিল রেলওয়ে। তখনো কৃষকের কাছ থেকে সাড়া মিলেনি। সময় ও ব্যয় বিবেচনায় কৃষকরা সড়কপথে পণ্য সরবরাহে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এভাবে অনন্ত তিনবার এ ধরনের প্রকল্প নিয়ে পিছু হটেছে রেল কর্তৃপক্ষ।
এদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ে, বাণিজ্য বিভাগ ও পণ্য বুকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রকল্পটি গ্রহণের সময় কোনো সমীক্ষা হয়নি। আলোচনা হয়নি ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও। মূল উদ্দেশ্য সফল না হওয়ায় যাত্রা শুরুর সাড়ে চার মাস পর টনক নড়েছে কর্তৃপক্ষের। এখন রেলের এই সেবা প্রচারে বুকিং সহকারীদের মাঠে পাঠানো হচ্ছে। বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রেলের পণ্যসেবার লিফলেট বিতরণ করছেন তারা। তবুও ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে পণ্যের জন্য দিনভর তীর্থের কাকের মতো বসে থাকতে হয় সংশ্লিষ্টদের। দিন শেষে কিছু ফার্নিচার মাঝে মাঝে বুকিং হওয়ার কথা জানা গেছে। পণ্য বুকিংয়ের জন্য পুরো গুদাম ফাঁকা দেখা গেছে।
বাণিজ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ভুল পরিকল্পনায় প্রকল্পটি সফলতার মুখ দেখেনি। এ নিয়ে ঢাকা ও জেলা ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে প্রান্তিক কৃষক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় বৈঠক হয়নি। সরকারি যেসব প্রতিষ্ঠান পণ্য পরিবহনে যুক্ত সেগুলোকেও এ ব্যাপারে উৎসাহিত করতে চিঠি দেওয়া হয়নি। মাঠ থেকে রেলস্টেশনে কীভাবে পণ্য সরবরাহ হবে বা গন্তব্যে পৌঁছানোর পর সেগুলো কীভাবে আড়তে যাবে–এ নিয়েও কারও ভাবনা নেই।
জানা গেছে, আয় বাড়াতে মালবাহী বগি পরিচালনার পুরোনো চিন্তা থেকে লাগেজ ভ্যান আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় রেল কর্তৃপক্ষ। এ জন্য ৩৫৮ কোটি টাকায় ২৮টি রেফ্রিজারেটর কোচসহ ১২৫ লাগেজ ভ্যান কেনা হয়। এর মধ্যে ২০টির মতো লাগেজ ভ্যান ব্যবহার শুরু হলেও কিছু ট্রেনে তা বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে রেফ্রিজারেটর কোচে পণ্য পরিবহন শুরু হয়নি। তা দ্রুত সময়ে চালুর কথা বলছে রেল কর্তৃপক্ষ। এই কোচে কীভাবে দুধ, ডিম, মাংসসহ হিমায়িত পণ্য বিভিন্ন জেলা থেকে এনে রাজধানীর বাজার ধরা হবে–তা নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই সংশ্লিষ্ট বিভাগের। এ অবস্থায় হিমায়িত পণ্য পরিবহন সেবা চালু হলে তাও ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
এ ব্যাপারে রেলওয়ের মহাপরিচালক কামরুল আহসান কালবেলাকে বলেন, রেলের পক্ষ থেকে পার্সেল বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। কিছুটা সময় লাগলেও
আশা করি সামনের দিনগুলোতে এই প্রকল্প আলোর
মুখ দেখবে। এজন্য রেলের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হচ্ছে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, এই প্রকল্পের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ কার্যত অপচয় হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে কেউ লাভবান হতে হয়তো প্রকল্পটি নিয়েছিল। যে কারণে সমীক্ষার বিষয়টি মাথায় রাখা হয়নি। কৃষক কীভাবে পণ্য মাঠ থেকে স্টেশনে আনবেন বা স্টেশন থেকে বাজারে যাবেন, এসব বিষয় গুরুত্ব পায়নি। বর্তমান ব্যবস্থায় কৃষিপণ্য ট্রেনে পাঠালে একজন কৃষককে তিনবার পরিবহন সেবা নিতে হবে। অথচ সড়কপথে একবারেই পণ্য বাজারে আসছে। এ ছাড়া প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক সেবা সম্পর্কে অবগত নন। তাহলে কীভাবে প্রকল্প লাভের মুখ দেখবে।
তিনি বলেন, ফিজিবিলিটি স্টাডি সঠিক হলে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক পণ্য পরিবহনে উৎসাহী হতেন।
আগের অভিজ্ঞাতায়ও এ ধরনের প্রকল্পে রেলওয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। মোট কথা, বর্তমান লাগেজ ভ্যান প্রকল্পে কৃষকের উপকার হয়নি, লাভ বাড়েনি রেলওয়ের। মাঝখানে ব্যক্তিগতভাবে হয়তো অনেকেই লাভবান হবে।
রেলওয়ে সূত্রগুলো বলছে, চলতি জুন থেকে ১২৫ লাগেজ ভ্যান নামাচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ২০১৮ সালের ২৬ জুন পণ্য পরিবহন ও যাত্রীসেবার মানোন্নয়নে আধুনিক, নিরাপদ ও গুণগত মানসম্মত রোলিং বহরে স্টক যুক্ত করতে ৩ হাজার ৬০২ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের রোলিং স্টক অপারেশন উন্নয়ন প্রকল্পের (রোলিং স্টক সংগ্রহ) অনুমোদন দেয়। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত হলেও পরে তা বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়।
রেলওয়ের বাণিজ্যিক বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত জেলাগুলোর কৃষি বাজার বিশ্লেষণ না করেই লাগেজ ভ্যান কেনা হয়েছে।
রেলওয়ের ঢাকা বিভাগের বাণিজ্যিক কর্মকর্তা শাহ আলম শিশির বলেন, আমরা চেষ্টা করছি পণ্য পরিবহন বাড়াতে। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রচারপত্র বিলি ও কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।