রাষ্ট্রীয় পরিবহন নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (বিআরটিএ) হিসাবে রাজধানীতে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ২১ লাখ ৪৪ হাজারের বেশি। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ অনিবন্ধিত যানবাহন চলার আনুমানিক হিসাব প্রায় ৮ লাখের বেশি। সব মিলিয়ে নগরীতে বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখের বেশি যানবাহন চলছে। এর মধ্যে ছোট-বড় মিলিয়ে সড়ক আছে তিন হাজার কিলোমিটার। রাস্তার পাশে ভূমি ব্যবস্থাপনা বিবেচনায় ঢাকায় চলাচল করতে পারে সর্বোচ্চ ৮ লাখ যানবাহন। তবে প্রতিদিন ঢাকার বাইরে থেকে নগরীতে প্রবেশ করছে লাখের বেশি যানবাহন।
মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ নানা প্রকল্পের পরও মূলত বাড়তি যানবাহনের কারণেই যানজট সমস্যার সমাধান মিলছে না। উল্টো প্রকল্পের কারণে গাড়ি বাড়ছে। গত জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত নগরীতে শৃঙ্খলা ফেরেনি। নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ হিসেবে কার্যত নির্বিকার বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশ। এ সুযোগে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোসহ সব রাস্তায়ই বিনা বাধায় চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ নিষিদ্ধ যানবাহন, যা পথের বিশৃঙ্খলা বাড়িয়েছে বহুগুণ। তেমনি যানজটের ভোগান্তি বেড়েছে অনেক বেশি। ঘণ্টার পর ঘণ্টায় পথের জটলায় নাকাল হতে হচ্ছে নগরবাসীকে।
যদিও গত সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে ১৫২টি মামলা ও ৬ লাখ ৭৯ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। এ ছাড়া অভিযানকালে ৩৭টি গাড়ি ডাম্পিং ও ১৩টি গাড়ি রেকার করা হয়েছে। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার টাকা। ডিএমপির ট্রাফিক এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
গতকাল মঙ্গলবার ফার্মগেট থেকে মতিঝিলে বাসে যেতে সময় লেগেছে দুই ঘণ্টার বেশি। তেমনি উত্তরা থেকে শাহবাগ আসতে লেগেছে ৫ ঘণ্টা। নীলক্ষেত থেকে গাবতলী যেতে পোহাতে হয়েছে সীমাহীন দুর্ভোগ। যাত্রীরা বলছেন, নগরীর যানজটের দুর্ভোগ দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে।
এই প্রেক্ষাপটে ঢাকার যানজট সমস্যার সমাধান খুঁজতে শুরু করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর যানজট নিরসনে দীর্ঘসময় প্রকল্পভিত্তিক সমাধানের চেষ্টা হয়েছে, যা শতভাগ বিজ্ঞানসম্মত নয়। বিশ্বব্যাপী সমাদৃত ব্যবস্থাপনা ও আইনগত পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ২০ ভাগ যানজট নিরসন সম্ভব। ৬০ বা ৭০ শতাংশ নগরবাসীকে মানসম্মত গণপরিবহনে ওঠানো সম্ভব হলে অনেকাংশেই যানজটের সমাধান সম্ভব বলেও মনে করেন তারা।
সড়কে শৃঙ্খলা আনতে এ বছরের ১৫ মে রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদ। সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর অভিযানও শুরু করেছিল পুলিশ। ১৯ মে রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধের ঘোষণা দেন তৎকালীন সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এই ঘোষণার প্রতিবাদে টানা দুই দিন নগরীতে বিক্ষোভ দেখান অনিবন্ধিত এই যানের চালকরা। বিভিন্ন এলাকায় ভাঙচুর ও ট্রাফিক পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগ করেন তারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এক দিন পরই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ঘোষণা প্রত্যাহার করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলের অনুমতি দেন।
এর পর থেকেই নগরীর প্রায় সব সড়কেই অনুমোদনহীন এই যানবাহন রীতিমতো বাধাহীন চলতে দেখা যায়। প্রতিদিন নানা মডেলের যান্ত্রিক রিকশা ঢাকার প্রধান প্রধান সড়কে চলতে দেখা যাচ্ছে। তেমনি উৎপাদনও বেড়েছে অনেক বেশি। এ নিয়ে আপত্তি আছে পথচারী থেকে শুরু করে অন্যান্য যানবাহনের চালক ও যাত্রীদের।
কমলাপুর স্টেডিয়াম মার্কেটে ব্যাটারিচালিত যানবাহন তৈরি হয় সবচেয়ে বেশি। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, প্রতিদিন কমপক্ষে তিন শতাধিক গাড়ি বিক্রি হচ্ছে। এর একটা অংশ নামছে রাজধানী ঢাকায়।
নগরীর বিভিন্ন ধরনের পরিবহন চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবাধে রিকশা চলায় দ্রুতগতির যানবাহন স্বাভাবিকভাবে চলতে পারছে না। তেমনি ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা করছেন না কেউ। অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ পথে ট্রাফিক পুলিশকে দেখা যায় না। এমনকি ট্রাফিক আইন ভঙ্গের কারণে স্বাভাবিক মামলা কার্যক্রম দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে। এই সুযোগ নিচ্ছে সব ধরনের যানবাহন। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে রিকশার নতুন নতুন স্ট্যান্ড করতেও দেখা গেছে নগরীর বিভিন্ন এলাকায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি পরিকল্পিত শহরের জন্য প্রয়োজন ২৫ ভাগ সড়ক। আছে সর্বোচ্চ ৮ ভাগ। এর মধ্যে গণপরিবহন চলাচলের উপযোগী পথ সর্বোচ্চ আড়াই থেকে ৩ ভাগ। সরকারের দুর্বল কৌশলের কারণে গণপরিবহন চলাচলের উপযোগী রাস্তা কম বলেও মনে করেন তারা।
জানতে চাইলে বিশিষ্ট যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হাদীউজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘সড়কের পাশে ভূমি ব্যবস্থাপনা বিবেচনায় নিয়ে যানবাহন চলাচল নির্ভর করে। ভূমি ব্যবস্থাপনা দুর্বল হওয়ায় ঢাকার তিন হাজার কিলোমিটার সড়কের অপারেশনাল সক্ষমতা খুবই কম।’
অনুমানভিত্তিক পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বর্তমান ব্যবস্থাপনায় নগরীতে সর্বোচ্চ ৬/৮ লাখ যানবাহন চলতে পারে। দুই লাখ নিবন্ধিত রিকশার কথা বলা হলেও চলছে কমপক্ষে আট লাখ।’
এদিকে সারা দেশে বিআরটিএ কার্যক্রমও প্রায় স্থবির। জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলন শুরুর পর এখনো সড়কে প্রতিষ্ঠানটির মোবাইল কোর্টের সক্রিয় অভিযান চোখে পড়েনি। বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৬১ লাখ ১৩ হাজারের বেশি। রাজধানীতে ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৫৫টি। যানবাহন নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা ১৯। রাজধানীতে আটটি আদালতের মধ্যে চারটিতেই ম্যাজিস্ট্রেট নেই। বাকি চারটি আদালত কয়েকদিন ধরে বসছে বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির। যদিও নগরীতে বিআরটিএ মোবাইল কোর্টের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
বিআরটিএ ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ কালবেলাকে বলেন, ‘সীমিত আকারে বিআরটিএ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে। আস্তে আস্তে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আসবে।’
চলতি সপ্তাহের শুরুতে রাজধানীর অন্তত ১০টি স্থান ঘুরে কোথাও ট্রাফিক পুলিশকে মামলা করতে দেখা যায়নি। একাধিক ট্রাফিক কর্মকর্তা এর কারণও ব্যাখ্যা করেছেন কালবেলার কাছে। তাদের মতে, ছাত্র আন্দোলনের পর পুলিশের মানসিক শক্তি ফিরে পেতে আরও সময় লাগবে। তারপর পুরোদমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে রাস্তায় পুলিশ ভূমিকা রাখতে পারবে।
পরিবহন শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ হানিফ খোকন কালবেলাকে বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন নিয়ে নারী ও প্রতিবন্ধী লোকজন রাস্তা দাবড়ে বেড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ না হলে দুর্ঘটনা আরও বাড়বে।
ট্রাফিক সমস্যার সমাধান চায় সরকার:
এদিকে গত সোমবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস পুলিশ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের ঢাকার যানজট নিরসনের সমাধান খুঁজতে পরামর্শ দিয়েছেন। ডিএমপির শীর্ষ কর্মকর্তা এবং বুয়েটের ট্রাফিক সিস্টেম বিশেষজ্ঞের সঙ্গে এক বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা এ নির্দেশনা দেন।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ডিএমপিকে ঢাকার দুই কোটি মানুষের ট্রাফিক সমস্যার ‘দ্রুত ও কার্যকর সমাধান’ খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘আমাদের যানজট কমাতে হবে। আমাদের অবিলম্বে একটি সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।’
সভায় পরিবহন ও ট্রাফিক ব্যবস্থা বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন একটি উপস্থাপনায় বলেন, ‘শুধু ঢাকা শহরে যানজটের কারণে বছরে অন্তত ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়।’
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার কে. নাজমুল হাসান বলেন, ‘সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েনের পর ট্রাফিক পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।’ আগামী সপ্তাহের শেষের দিকে সম্পূর্ণভাবে ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েনের আশা করেন তিনি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাঈদুর রহমান কালবেলাকে বলেন, নিষিদ্ধ যানের উৎপাদন আগে বন্ধ করতে হবে। এলসির মাধ্যমে পার্টস আমদানি বন্ধ না হলে বিপজ্জনক এসব যানবাহন আরও বাড়বে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সারা দেশে ইজিবাইক ও ব্যটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যা কমপক্ষে ৪০ লাখ। এসব যানবাহন সরাসরি আমদানি নিষিদ্ধ থাকলেও পার্টস আমদানি বৈধ। মূলত এ কারণেই উৎপাদন বন্ধ রাখা যাচ্ছে না। এতে নগরীর পথে বিশৃঙ্খলাও কমছে না।