আমজাদ হোসেন শিমুল, রাজশাহী
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:৩৬ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

এক দশকের অচলায়তন ভেঙে ফিরছে সিনেট

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
এক দশকের অচলায়তন ভেঙে ফিরছে সিনেট

দীর্ঘ এক দশকের অচলায়তন ভেঙে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) আবারও ফিরছে সিনেট অধিবেশন। এতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতেও। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন ঘিরে ক্যাম্পাসজুড়ে চলছে নির্বাচনী উত্তাপ। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে প্রতিটি হল প্রাঙ্গণ আলোচনায় সরগরম, পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে গেছে পুরো ক্যাম্পাস। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সহসভাপতি (ভিপি) এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থীরা, তবে পিছিয়ে নেই অন্যান্য পদের প্রতিদ্বন্দ্বীরাও। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পরিষদ সিনেটের ছাত্র প্রতিনিধির পাঁচটি পদ নির্বাচনী উত্তাপে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। যদিও শিক্ষার্থীদের বড় অংশ এখনো সিনেটের কার্যকারিতা ও গুরুত্ব সম্পর্কে তেমন সচেতন নন। অথচ এই পাঁচটি পদের বিপরীতে লড়ছেন ৫৮ জন প্রার্থী।

বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের ৭৩ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম হলো সিনেট। এটি উপাচার্য নির্বাচন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট অনুমোদন, নতুন বিভাগ খোলা এবং আইন সংশোধনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বে থাকে। সিনেটের সভাপতি হিসেবে পদাধিকারবলে থাকেন উপাচার্য। এ ছাড়া দুই উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষসহ ১০৪ সদস্যের এ পরিষদে রয়েছেন ২৫ জন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট, গবেষণা সংস্থার পাঁচজন প্রতিনিধি, রাষ্ট্রপতি (আচার্য) মনোনীত পাঁচজন শিক্ষাবিদ, সরকার মনোনীত পাঁচ সরকারি কর্মকর্তা, জাতীয় সংসদের স্পিকার মনোনীত পাঁচ সংসদ সদস্য, পাঁচজন অধিভুক্ত কলেজের অধ্যক্ষ প্রতিনিধি, শিক্ষা পরিষদ মনোনীত ১০ জন কলেজ শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয় আওতাধীন শিক্ষা বোর্ডের দুই চেয়ারম্যান। এর বাইরে শিক্ষক সমাজের ভোটে নির্বাচিত ৩৩ জন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধি সিনেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৭২ বছরে ২০০০ সালের আগে অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯টি সিনেট অধিবেশন; পরবর্তী ২৫ বছরে হয়েছে মাত্র তিনটি। অধ্যাদেশ অনুযায়ী বছরে অন্তত একবার সিনেট অধিবেশন হওয়ার কথা থাকলেও, রাবিতে সর্বশেষ এ অধিবেশন বসেছিল ২০১৬ সালে।

এবারের রাকসু নির্বাচনে সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোটের ভিপি ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি প্রার্থী মোস্তাকুর রহমান জাহিদ কালবেলাকে বলেন, ‘সিনেট কেবল নীতিনির্ধারণী সংস্থা নয়, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরুদণ্ড। একজন সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করেন। নির্বাচিত হলে শিক্ষার্থীবান্ধব বাজেট প্রণয়ন, হলের সিট সংকট সমাধান, গ্রন্থাগার উন্নয়ন, আইসিটি সুবিধা বৃদ্ধি এবং ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বরাদ্দ বাড়াতে কাজ করব। শিক্ষার্থীদের মতামত নিয়মিত সংগ্রহ করে তা সিনেটে তুলে ধরাই হবে আমার মূল লক্ষ্য।’

ছাত্রদলের ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’ প্যানেলের ভিপি ও সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি প্রার্থী শেখ নূর উদ্দীন আবীর বলেন, ‘সিনেট হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নীতি ও পরিকল্পনা নির্ধারণের জায়গা। এটি মর্যাদার পাশাপাশি দায়িত্বেরও আসন। দীর্ঘদিন ধরে আবাসন সংকট, ল্যাব ঘাটতি, গবেষণা তহবিলের অভাব ও লাইব্রেরিতে হালনাগাদ বইয়ের সংকট চলছে। এসব বিষয় সরাসরি সিনেটে তুলে ধরে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। আমি চাই, বাজেটে শিক্ষার্থীদের দাবি সঠিকভাবে প্রতিফলিত হোক এবং গবেষণায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো হোক।’

সিনেটের ছাত্র প্রতিনিধি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রাবি প্রেস ক্লাবের সভাপতি মনির হোসেন মাহিন। তিনি বলেন, ‘সিনেট সদস্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ। রাকসু যেখানে শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করে, সেখানে সিনেট সদস্যরা পুরো বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের কথা বলেন। ক্যাম্পাসের কলম সৈনিক হিসেবে আমি জানি কোথায় সমস্যা, কোথায় অনিয়ম বা দুর্নীতি রয়েছে। আমার সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীদের পরামর্শ অনুযায়ী বাজেট অনুমোদন ও নীতিনির্ধারণে তাদের প্রতিফলন ঘটাতে চাই।’

রাবি প্রেস ক্লাবের সিনিয়র সভাপতি সৈয়দ সাকিবও লড়ছেন সিনেটের ছাত্র প্রতিনিধি পদের জন্য। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘২০০০ সালের আগে সিনেট অধিবেশন হয়েছিল ১৯টি, এরপর মাত্র ৩টি। ২০০০ সালের পর থেকে স্থানীয় রাজনীতিকদের অযাচিত হস্তক্ষেপে সিনেট কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। এতে উপাচার্যদের জবাবদিহি কমে যায়। সিনেট অচল থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় আর অধ্যাদেশ অনুযায়ী পরিচালিত হয়নি। আমি নির্বাচিত হলে শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, স্বচ্ছ বাজেট বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক দুর্নীতির প্রতিবাদে সোচ্চার থাকব।’

নির্বাচিত হলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে সম্পর্কের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করার প্রত্যাশার কথা জানান রাবি সাংবাদিক সমিতির সভাপতি ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি প্রার্থী ইরফান তামিম। তিনি বলেন, ‘সিনেট এমন এক মঞ্চ—যেখানে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন ও প্রশাসনের নীতি মিলিত হয়। আমি নির্বাচিত হলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সমন্বয়ের সেতুবন্ধন তৈরি করাই হবে আমার মূল কাজ।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক তাসিন খানও রয়েছেন সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি প্রার্থীদের তালিকায়। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের মতো, যেখানে বৈচিত্র্যের পাশাপাশি বৈষম্য ও সংঘাতও আছে। একজন সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি সেই রাষ্ট্রের সংসদ সদস্যের মতো ভূমিকা পালন করেন। সিনেটে থেকে ন্যায়বিচার, সমতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে চাই। ক্যাম্পাসে বৈষম্যমূলক আচরণ, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার দূর করে আবাসন, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও শিক্ষা সুবিধায় সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করব। প্রান্তিক ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বরাদ্দও নিশ্চিত করব।’

দীর্ঘ এক দশক পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট অধিবেশন ফিরছে—এটি শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং ক্যাম্পাসের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি পুনরুদ্ধারের একটি সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতিতে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা নতুন করে জেগে উঠেছে। এমন প্রেক্ষাপটে সিনেট যেন এবার সত্যিকার অর্থেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি, ন্যায় ও অগ্রগতির মঞ্চ হয়ে ওঠে—সেটাই প্রত্যাশা সাধারণ শিক্ষার্থীদের।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নাহিদ রানার ভয়ে কাঁপছে অস্ট্রেলিয়াও

এআইইউবিতে নোবেলজয়ী ড. অ্যান ল’হুইলিয়ারের ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত

দ্বিতীয় ধাপে ১০০ উপজেলা-পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা করবে এনসিপি

রাজশাহীর আম যাচ্ছে ফ্রান্সে

আরেক প্রশাসকের বিদেশযাত্রার আবেদন বাদ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার

২ কোটি টাকা নিয়ে নারী হকির পাশে ব্র্যাক ব্যাংক

সিআইডি পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগ, যুবক গ্রেপ্তার

হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে ইরানের ওপর ইইউ’র নতুন নিষেধাজ্ঞা

নারী ফুটবলারদের পাশে আমিনুল হক

১০

কর্ণফুলীতে ভেসে উঠল মরদেহ

১১

ট্রাম্পের অনুরোধে ইরানে হামলা স্থগিত করেছে ইসরায়েল!

১২

টেস্ট দলে কি জায়গা হারাচ্ছেন শাহীন আফ্রিদি?

১৩

সাড়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ঝুঁকিতে বাংলাদেশ : বাণিজ্যমন্ত্রী

১৪

ইরানের আকস্মিক হামলার পর ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ফোনালাপ

১৫

মেয়ের ফাঁসির রায়ে খুশি বাবা

১৬

নতুন শিক্ষাক্রমে যুক্ত হচ্ছে ৪ বিষয় : শিক্ষামন্ত্রী

১৭

দীর্ঘ বিরতির পর অভিনয়ে ফিরছেন বিন্দু

১৮

যুদ্ধ বা আলোচনা, কোনোটিই ছাড়েনি ইরান : পেজেশকিয়ান

১৯

বিএনপি-আ.লীগ সংঘর্ষ, ওসিসহ অর্ধশত আহত

২০
X