

সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিনের মতোই মায়ের খোঁজ করতে গিয়েছিলেন মেয়ে নাজনিন আক্তার (১৯)। বাবা-মায়ের ঘরের দরজায় কড়া নাড়লে দরজা খুলে দেন বাবা নজরুল ইসলাম। মেয়ের প্রশ্নে তিনি হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে জবাব দেন, ‘তোর মা অন্য ছেলের সঙ্গে ভেগে গেছে।’ এরপরই শুরু হয় এক নারকীয় ঘটনার পর্দা উন্মোচন। মেয়েটি জানতে পারেন, তার মা তাসলিমা খাতুনকে শ্বাসরোধে হত্যার পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ডিপ ফ্রিজে মাছ-মাংসের নিচে মরদেহ লুকিয়ে রেখেছেন তার বাবা।
ঘটনাটি ঘটে সোমবার, রাজধানীর কলাবাগানের ফার্স্ট লেন এলাকার একটি বাসায়। এর আগে নজরুল ইসলাম কৌশলে পালিয়ে যান। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। নিহত তাসলিমার ভাই নাঈম ইসলাম কলাবাগান থানায় একটি হত্যা মামলা করেন, যেখানে সন্দেহভাজন হিসেবে নজরুল ইসলামের নাম উল্লেখ করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, স্ত্রীর বাবার বাড়ির জমি নিজের নামে লিখে না দেওয়া এবং স্ত্রীকে পরকীয়া করার সন্দেহেই তাসলিমাকে হত্যা করা হয়েছে।
কলাবাগান থানার উপপরিদর্শক আতিকুর রহমান জানান, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এটি পারিবারিক কলহ এবং সন্দেহ থেকে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড।’ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রোববার রাত সাড়ে ১১টা থেকে সোমবার সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে হত্যার ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, চার মাস আগে নজরুল ইসলাম পরিবারসহ ওই ফ্ল্যাটে ওঠেন। তার তিন মেয়ে থাকলেও বড় মেয়ে নাজনিন (১৯) ও মেজো মেয়ে নাজিফা (১২) বাসায় থাকত। ছোট মেয়ে নিশাত আনজুম (৫) থাকত নানার বাড়িতে।
নজরুল তার স্ত্রীকে মোবাইল ব্যবহার করতে দিতেন না এবং দুই মেয়ের পড়াশোনাও বন্ধ রেখেছিলেন। ভবনের নিরাপত্তারক্ষী বাবুল হাওলাদার জানান, সোমবার সকাল ৮টার পরে নজরুল দুই মেয়েকে নিয়ে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে বাসা থেকে বের হয়ে যান এবং এরপর আর ফিরে আসেননি। এর আগের রাত সাড়ে ১০টায় তিনি গাড়ি নিয়ে বাসায় ফিরেছিলেন।
ভবনের বাসিন্দারা জানান, তারা তাসলিমা বা মেয়েদের তেমন দেখতেন না। কেউ বের হলেও নজরুল সঙ্গে থাকতেন। এক বাসিন্দা বলেন, ‘তাদের যখন দেখেছিলাম, তখন ট্রাকভর্তি নতুন আসবাব নিয়ে এসেছিলেন। এরপর আর তেমন দেখা যায়নি।’
পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নিহত তাসলিমার মাথায় ধারালো অস্ত্রের চারটি গভীর আঘাত ছিল। ক্ষতগুলোর গভীরতা ৫ থেকে ১১ ইঞ্চি পর্যন্ত এবং আঘাতে মাথার মগজ বের হয়ে আসে। ২১ বছরের দাম্পত্যজীবনের অবসান ঘটে নির্মমভাবে।
নিহতের ভাই নাজমুল হোসেন জানান, নজরুল একসময় কাপড়ের ব্যবসা করলেও পরে ব্যবসা বন্ধ করে দেন। আদাবরে নিজের বাড়িও বিক্রি করে দেন। এরপর গাজীপুরের পুবাইলে স্ত্রীর বাবার বাড়ির জমি নিজের নামে লিখে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। পরিবার থেকে পাঁচ কাঠা জমি স্ত্রী ও মেয়েদের নামে দিতে রাজি হলেও নজরুল তাতে রাজি হননি। এ নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে নজরুল ঢাকায় চলে আসেন। তিন দিন আগে তিনি তাসলিমার বাবা-মাকে ফোন করে অসুস্থতার কথা বলে দেখা করতে বলেন। দেখা হলে ক্ষমাও চান।
নাজমুল আরও জানান, ‘সোমবার সকালে আমার বড় ভাগ্নি ঘুম থেকে উঠে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করে, মা কোথায়? তখন নজরুল বলে, ‘তোর মা অন্য ছেলের সঙ্গে চলে গেছে। তোরে নানাবাড়ি নিয়ে যাব।’ তখন আমার ভাগ্নি ঘরের দেয়ালে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ দেখতে পায়; কিন্তু ভয় পেয়ে কিছু বলেনি। বাবার কথামতো ছোট বোনকে নিয়ে বের হয়ে যায়। নজরুল তাদের নানাবাড়ি না নিয়ে ফুপুর বাসায় মোহাম্মদপুরে নিয়ে গিয়ে একই কথা বলে। পরে বাচ্চাদের রেখে নজরুল সেখান থেকে চলে যান। এরপর নাজনিন আমাদের ফোন করে সন্দেহের কথা জানায়। আমরা বাসায় গিয়ে তালা লাগানো অবস্থায় দেখতে পাই। পুলিশ ডেকে তালা খুলে দেখি, বিছানার তোশক ও চাদরে রক্ত। মরদেহ কোথায় বুঝে উঠতে পারছিলাম না। পরে ডিপ ফ্রিজ থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তখন আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।’
তাসলিমার মোবাইল ব্যবহার করতে না দেওয়া, মেয়েদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নেওয়া—সবকিছুই ছিল নজরুলের কঠোর নিয়ন্ত্রণের অংশ। বড় মেয়ে নাজনিন এসএসসি পাস করে মাদ্রাসায় হেদায়েতুন নহমি পর্যন্ত পড়ে। এরপর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। মেজো মেয়েও ষষ্ঠ শ্রেণির পর আর পড়াশোনা করতে পারেনি। ছোট মেয়ে গাজীপুরে নানাবাড়িতে থেকে প্রথম শ্রেণিতে পড়ছে।
ডিএমপির রমনা বিভাগের (নিউমার্কেট-কলাবাগান) সহকারী পুলিশ কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম জানান, ‘নিহতের ভাই বাদী হয়ে মামলা করেছেন। আমরা আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তাকে গ্রেপ্তার করতে পারলেই ঘটনার বিস্তারিত জানা যাবে।’