সজিব ঘোষ
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৬ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

কাজ নেই, তবু আছে কোম্পানি

বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট
ছবি : সংগৃহীত।
ছবি : সংগৃহীত।

গাজীপুর থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত বাস চলাচলের একটি বিশেষায়িত সড়ক তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দিতে ২০১২ সালে কাজ শুরু হয়, যা ২০১৬ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে এসেও শেষ হয়নি কাজ। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শেষ না হলেও প্রকল্পের অধীনে যেসব সড়ক তৈরি হয়েছে, সেগুলো এরই মধ্যে সব ধরনের যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। ময়মনসিংহ থেকে গাজীপুরের প্রবেশমুখের সড়কে আরও কিছু কাজ বাকি।

সেই কাজ শেষে পুরো সড়ক সব ধরনের যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। তবে দীর্ঘ ১৩ বছরে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ের পর এখন সেই বিশেষায়িত বাস চলাচলের পরিকল্পনাটিই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যে পরিকল্পনা নিয়ে এ সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল, সেই বিশেষায়িত বাস চালানোর কোনো উদ্যোগ আপাতত অন্তর্বর্তী সরকারের নেই।

অন্যদিকে, বিশেষায়িত বাস চালানোর জন্য যে ‘ঢাকা বিআরটি কোম্পানি (পিএলসি)’ তৈরি করা হয়েছিল, বর্তমানে কাজ না থাকলেও সেই কোম্পানিটি ঠিকই টিকে আছে। কাজহীন এ প্রতিষ্ঠানের পেছনে অর্থ ব্যয় অব্যাহত থাকলেও প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন।

২০১২ সালে ‘গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট (বিআরটি, গাজীপুর-এয়ারপোর্ট)’ নামে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। শুরুতে অনুমোদিত ব্যয় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা থাকলেও ধাপে ধাপে মেয়াদ বাড়িয়ে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ পথে ১৬ কিলোমিটার সমতলে এবং ৪ কিলোমিটার উড়াল পথ নির্মাণ করা হয়েছে।

প্রকল্প দপ্তর সূত্র বলছে, বিআরটি প্রকল্প সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর এবং মেয়াদ আরও চার বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত করার প্রস্তাব ফেরত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার বিআরটি করিডোরে বিশেষ ইলেকট্রিক (বিদ্যুৎ-চালিত) বাস চলাচলের ধারণা বাতিল করে প্রকল্পের আওতায় নির্মিত চার লেনের সড়কটি সব ধরনের যানবাহনের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। ৯৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হলেও প্রকল্প এলাকা এখনো পুরোপুরি চলাচলযোগ্য নয়। স্টেশনগুলোর ফিনিশিং কাজ, গাজীপুর অংশে ময়মনসিংহ রোডের অসম্পূর্ণ অংশ, ফুটপাত ও এসকেলেটর স্থাপনসহ কিছু কাজ এখনো বাকি। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিভিন্ন স্টেশনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশও মেরামত করতে হবে।

প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার প্রধান কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা সরকারি তিন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন। একটি পথ তৈরির কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে (এলজিইডি)। কাজ নিয়ে এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্যটির যোগাযোগ না থাকায় একেক দপ্তরের কাজ একেক সময় শেষ হয়েছে, যা পুরো প্রকল্পের গতি কমিয়ে দেয়।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘সময়ের কাজ সময়ে না হলে এর কোনো অর্থনৈতিক উপযোগিতা থাকে না। আবার ১৩ বছর পর এসে করিডোর ধারণা বাতিল করা বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও নীতিগত ব্যর্থতা। এ প্রকল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ও জনসম্পদ ব্যয় হয়েছে।’

বিআরটি রুট পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গঠিত শতভাগ সরকারি মালিকানাধীন ‘ঢাকা বিআরটি কোম্পানি (পিএলসি)’ বর্তমানে একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (যুগ্ম সচিব পদমর্যাদা) নেতৃত্বে ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এ কোম্পানির মূল দায়িত্ব ছিল বাস কেনা, বিআরটি পরিচালনার জন্য আইটিএস সরঞ্জাম কেনা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র ও সিগন্যাল সিস্টেম স্থাপন, বিদ্যমান বাস অপারেটরদের সঙ্গে সমন্বয় এবং বিআরটি বাস অপারেটর নির্বাচন।

কিন্তু গত ১২ বছরে এসব কাজের কোনোটিই সম্পন্ন করতে পারেনি কোম্পানিটি। একাধিক সূত্র বলছে, শেষ পর্যন্ত বিআরটি করিডোর চালু না হলে বিআরটি কোম্পানিকে অন্য কোনো কাজে যুক্ত করার বিষয়ে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) একাধিক প্রস্তাব দিয়েছে।

এ বিষয়ে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মু. নুরুল আমিন খান কালবেলাকে বলেন, ‘প্রকল্পটি কোম্পানির অধীন নয়। ফলে প্রকল্প চলবে নাকি বাতিল হবে তা আমরা বলতে পারি না। তবে কোম্পানি যেভাবে চলার এখনো সেভাবেই চলছে। এই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটা সরকার নির্ধারণ করবে।’

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বড় প্রকল্পগুলো পুনঃমূল্যায়নের অংশ হিসেবে এ প্রকল্পটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। বর্তমানে বিশেষায়িত ইলেকট্রিক বাস চালানোর ধারণা থেকে সরে এসে সড়কটি সব ধরনের যানবাহনের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে এখন প্রকল্পের কাজ শেষ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আর প্রকল্পের তহবিলে এখনো ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। সেই বরাদ্দের টাকাও কাজের মধ্য দিয়ে খরচ হবে। তবে বাড়তি বরাদ্দ যুক্ত করা হবে না। প্রকল্পের আওতায় বিশেষায়িত বাস চলবে কি না তা অন্তর্বর্তী সরকার ঠিক করে রেখে যাবে না। ভোটের পর নির্বাচিত সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

এদিকে, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিআরটি প্রকল্প চালু হলেও যানজট নিরসন সম্ভব নয়। বিশেষায়িত লেনে শুধু বিআরটি বাস চললে অন্য লেনে যানজট আরও বাড়বে। ফলে সামগ্রিকভাবে পরিবহন পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন বলেন, ‘আমরা কাজটা শেষ করে রাখতে চাচ্ছি। তারপর পুরো পথ স্বাভাবিক ব্যবস্থায় খুলে দেওয়া হবে। কিন্তু বিআরটি করিডোর এখনই বাতিল করছি না। যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকবে। পরের সরকার যদি চায় বিআরটি চালু করতে, তারা যেন সেটি করতে পারে। তখন কোম্পানি লাগবে। তাই কোম্পানিও বাতিল করছি না। ভোটের পর নতুন সরকার সব সিদ্ধান্ত নেবে।’

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সেই ছবি দেখিয়ে ট্রাম্পকে হত্যার হুমকি

অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত বিপিএল

উন্নত ফিচার ও শক্তিশালী ব্যাটারিসহ নতুন স্পার্ক গো ৩ উন্মোচন করলো টেকনো

এসএসসি পরীক্ষা শুরুর তারিখ প্রকাশ

নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণ জানালেন রাশেদ প্রধান

নগরবাউল জেমসের উদ্দেশ্যে যে প্রশ্নটি করলেন আসিফ আকবর

নতুন কর্মসূচি দিয়ে সড়ক ছাড়লেন শিক্ষার্থীরা

জামায়াত কর্মীকে ছুরিকাঘাতের পর হাতুড়িপেটা

নাজমুলের যে বক্তব্যে উত্তাল হয়ে ওঠে ক্রীড়াঙ্গন

রাজনৈতিক দলগুলোতে কালো টাকার প্রভাব বাড়ছে : বদিউল আলম

১০

জুলাই-আগস্টের ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহার করবে সরকার

১১

শাহ্ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারীর দ্বিশততম জন্মবার্ষিকীতে মোড়ক উন্মোচন

১২

চট্টগ্রামে বিভাগীয় ইমাম সম্মেলন / জুলাই সনদে ’৭১ মুছে দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয় : আলী রীয়াজ

১৩

বায়রার নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা

১৪

চবিতে ছাত্রদলের অবস্থান কর্মসূচি, ভিন্ন পথে কার্যালয়ে গেলেন উপ-উপাচার্য

১৫

মানুষ নয়, গ্যালারিতে বসে খেলা দেখছে বানর

১৬

মিনিস্টার ‘নির্বাচনী উৎসবে’ টিভি-ফ্রিজে ৫৩ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়

১৭

নাজমুলকে অব্যাহতি, বিসিবির অর্থ কমিটির দায়িত্ব পেলেন যিনি

১৮

মার্কিন অভিবাসী ভিসা স্থগিত, যে কৌশল নিচ্ছে সরকার

১৯

ওরসের দোহাই দিয়ে ৫ দিন স্কুল বন্ধ রাখে প্রধান শিক্ষক

২০
X