

নিখোঁজের পর টানা দুই মাস ঢাকার আশুলিয়ায় আমিন হাউজিং এলাকার ৬০ ফিট সড়ক সংলগ্ন কাশবনের ভেতর পড়ে ছিল ১৫ বছর বয়সী অটোরিকশাচালক মিলন হোসেনের মরদেহ। কিন্তু এ দীর্ঘ সময়ে কেউই বিষয়টি টের পায়নি। কাশবনের ভেতর পড়ে থাকায় মরদেহটি সম্পূর্ণ পচে গলে যায় এবং বন্যপ্রাণীর আক্রমণে দেহাংশ নষ্ট হয়ে পড়ে। পরে পুলিশ সেখান থেকে মানবদেহের মাথার খুলিসহ ৩৮টি হাড় ও পরিধেয় কিছু কাপড় উদ্ধার করে।
শনাক্তের পর নিশ্চিত হওয়া যায়, দেহাবশেষটি নিখোঁজ কিশোর মিলনেরই। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা জেলা। গতকাল সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে পিবিআইয়ের ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ এসব তথ্য জানান।
এই পিবিআই কর্মকর্তা আরও জানান, গত বছরের ১ ডিসেম্বর আশুলিয়া মডেল টাউন (আমিন মোহাম্মদ হাউজিং) এলাকা থেকে মানব কঙ্কালের ৩৮ টুকরো হাড় এবং মাথার খুলি উদ্ধার হয়। এরপর কিশোর মিলন হত্যায় জড়িতদের গত ১৬ জানুয়ারি সাভারের আক্রান বাজার ও গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে আটক করা হয়। উদ্ধার করা হয় মিলনের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া অটোরিকশা।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টার দিকে মিলন হোসেন অটোরিকশা নিয়ে গ্যারেজ থেকে বের হয়। রাত গভীর হলেও বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর আশুলিয়া থানায় তার নিখোঁজ থাকার তথ্য উল্লেখ করে করা হয় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি)। পরে ১৮ নভেম্বর মিলনের মা জোসনা বেগম বাদী হয়ে মো. সুমনসহ অজ্ঞাতপরিচয়দের আসামি করে আশুলিয়া থানায় অপহরণের মামলা করেন, যা রুজু হয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ দণ্ডবিধির একাধিক ধারায়।
মামলাটির তদন্ত চলাকালে গত ১ ডিসেম্বর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে স্থানীয় লোকজন আমিন হাউজিংয়ের ৬০ ফিট সড়ক-সংলগ্ন সাইপাড়া স্কুলের দক্ষিণ পাশে কাশবনের ভেতর মানুষের মাথার খুলি, হাড় ও পরিধেয় কাপড় দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন। পরে সাভার মডেল থানা পুলিশের একটি দল সেখানে গিয়ে মাথার খুলিসহ ৩৮টি হাড় ও কাপড় উদ্ধার করে। এরপর মামলার বাদী কিশোর মিলনের মা গিয়ে উদ্ধার হওয়া গেঞ্জি ও জিন্সের প্যান্ট দেখে সেগুলো তার নিখোঁজ ছেলের বলে শনাক্ত করেন।
বাদীর আবেদনের পর গত ১ জানুয়ারি আদালতের আদেশে মামলার তদন্তভার পিবিআই ঢাকা জেলা গ্রহণ করে। তদন্তের একপর্যায়ে ১৬ জানুয়ারি গভীর রাতে সাভারের আক্রান বাজার এলাকা থেকে মো. রনি মিয়াকে (২৪) গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আটক করা হয় মো. এরশাদ আলী (৩৪) ও মো. আবুল কালামকে (৫২)। একই সঙ্গে আসামিদের দেখিয়ে দেওয়া জায়গা থেকে উদ্ধার করা হয় মিলনের লুট হওয়া অটোরিকশা।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রনি মিয়া এ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। রনি নিজেও অটোরিকশাচালক এবং নিহত মিলন ছিল তার পূর্বপরিচিত। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাতে পিবিআই কর্মকর্তা এম এন মোর্শেদ বলেন, ‘পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে আসামি সুমন ভিকটিম মিলনের অটোরিকশা ভাড়া করে আক্রান বাজারে যায়। সেখানে সে আসামি রনি মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ভিকটিমের অটোরিকশা নিয়ে সাভার মডেল থানাধীন আশুলিয়া মডেল টাউন (আমিন হাউজিং) এলাকার ৬০ ফিট-সংলগ্ন কাশবনের ভেতরে যায়। তারা কাশবনের পাশের রাস্তায় অটোরিকশাটি রেখে তিনজন মিলে গাঁজা সেবন করে। একপর্যায়ে মিলন হোসেনের গলা চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে এবং মরদেহ কাশবনে ফেলে রেখে অটোরিকশাটি নিয়ে পালিয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘অটোরিকশা নিয়ে যাওয়ার পথে সুমন জিরাবো বাজারে নেমে পড়ে এবং রনি মিয়া অটোরিকশাটি নিয়ে রাতের বেলায় কালিয়াকৈরের টানসূত্রাপুর এলাকার মো. এরশাদ আলীর কাছে ৬২ হাজার টাকায় বিক্রি করে তার বাসায় রাত কাটায়। অটোরিকশা বিক্রির টাকার মধ্যে সুমনকে ৪৪ হাজার টাকা দেওয়া হয় এবং রনি নিজের কাছে রেখে দেয় ১৮ হাজার টাকা। পরে আসামি এরশাদ আলী দাড়িয়াপুর এলাকার অটোরিকশা গ্যারেজ মালিক আবুল কালামের কাছে ৬৫ হাজার টাকায় অটোরিকশাটি বিক্রি করে। এরপর রনি মিয়া ও এরশাদ আলীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আবুল কালামের গ্যারেজ থেকে মিলনের অটোরিকশাটি উদ্ধার করা হয়। আবুল কালামকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, এরশাদ আলীর কাছ থেকে অটোরিকশাটি কেনার পর তিনি এটির রং পরিবর্তন করেন।
পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ জানান, আসামিরা নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত থাকার কথাও জানান।
মন্তব্য করুন