

সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হলেও জ্বালানি তেল নিয়ে ক্রেতাদের শঙ্কা কাটছে না। গতকাল রোববার রাজধানীর অধিকাংশ পাম্পেই তেলের জন্য ছিল দীর্ঘ সারি। তেল না থাকায় অনেক পাম্প ছিল বন্ধ। তেল পাম্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জানান, গত শুক্র ও শনিবার ডিপো বন্ধ থাকায় তেলের সরবরাহ ছিল না। এ কারণে অনেক পাম্পে তেল নেই। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তারা জানান, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় এবার ২৫ শতাংশ কম তেল বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। এই ২৫ শতাংশ তেলই রেশনিং করা হচ্ছে।
জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোর নিরাপত্তা জোরদার করতে পুলিশি টহলের অনুরোধ জানিয়েছে বিপিসি। এদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরে তেল-গ্যাসের ১০টি জাহাজ ভিড়েছে বলে বন্দর সূত্রে জানা গেছে।
জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ও সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে গতকাল এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য রেশনিং করে চলতে হবে। সব একেবারে না খেয়ে চলার মতো ব্যবস্থা করে যদি একবার চলি, তাহলে আমরা দীর্ঘদিন চলতে পারব। এ সময় তিনি আপাতত বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর কথাও জানান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২০তম কারাবন্দি দিবস উপলক্ষে প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত উত্তরাঞ্চল ছাত্র ফোরাম আয়োজিত এক সভায় ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, আমরা ভঙ্গুর এবং ঋণে জর্জরিত একটি বাংলাদেশ পেয়েছি। আমরা এমন এক সময়ে এসে সরকার গঠন করেছি, তার কয়েকদিন পরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। জ্বালানির উৎপত্তিস্থল হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। আমি যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছি, এখন প্রতিদিন আমাকে জবাবদিহি করতে হয়। তিনি আরও বলেন, পেট্রোল পাম্পের পাশে বিশাল লাইন দেখা যায়। আমরা বলেছি, যেহেতু যুদ্ধ লেগেছে এবং যুদ্ধকালীন অবস্থার মধ্যে বসবাস করছি, যেখান থেকে পেট্রোলিয়াম আসে, সেখানে যুদ্ধ লেগেছে। এই যুদ্ধ কতদিন চলবে জানি না। তবে আমার কাছে যে মজুত আছে, সেটা সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহার করার জন্য জনগণের কাছে আহ্বান জানিয়েছি। আমরা রেশনিং শুরু করেছি।
এদিকে দেশে জ্বালানি তেল বিপণন ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করতে পুলিশি টহল বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়েছে বিপিসি।
শনিবার জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানান, বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি নিয়ে নেতিবাচক খবর প্রচারের কারণে ভোক্তাদের মধ্যে অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে ফিলিং স্টেশন ডিলাররা আগের তুলনায় বেশি পরিমাণ জ্বালানি তেল ডিপো থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।
চিঠিতে আরও বলা হয়, কিছু ভোক্তা প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি তেল কিনে অননুমোদিতভাবে মজুত করার চেষ্টা করছেন—এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এরই মধ্যে ফিলিং স্টেশন থেকে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ সীমিত করার বিষয়ে বিপিসি একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে।
বিপিসি জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল ক্রয়কে কেন্দ্র করে ক্রেতা ও স্টেশনকর্মীদের মধ্যে অনভিপ্রেত ঘটনার সৃষ্টি হচ্ছে। কোথাও কোথাও উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলার ঘটনাও ঘটছে। এসব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফিলিং স্টেশনগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এ কারণে দেশের সব ফিলিং স্টেশনে পুলিশি টহল জোরদার করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগকে।
জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হবে:
জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত ও নিরবচ্ছিন্ন রাখার লক্ষ্যে এখন থেকে মাঠপর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জ্বালানি তেলের বাজারে সংকট তৈরির লক্ষ্যে অবৈধ মজুত করছে মর্মে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ সংকট নিরসনকল্পে এরই মধ্যে সরকার যানবাহনভিত্তিক তেলের পরিমাণ নির্ধারণ করেছে। ফলে বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প বা ফিলিং স্টেশনে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্যে জ্বালানি তেল বিক্রয়, অধিক মুনাফার লোভে অতিরিক্ত মজুত, খোলা বাজারে বিক্রি, পাচারের প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে তেল-গ্যাসের ১০ জাহাজ:
প্রায় পৌনে ৪ লাখ টন জ্বালানি পণ্য দিয়ে গতকাল চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছেছে ১০টি জাহাজ। এসব জাহাজের মধ্যে চারটিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং দুটিতে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) রয়েছে। এ ছাড়া ডিজেলসহ বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি পণ্য নিয়ে পৌঁছেছে আরও চারটি জাহাজ।
বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, কাতার থেকে ১ লাখ ২৬ হাজার টন এলএনজি নিয়ে ‘আল জোর’ ও ‘আল জাসাসিয়া’ নামে দুটি জাহাজ এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। এ ছাড়া আজ সোমবার ‘লুসাইল এবং বুধবার ‘আল গালায়েল’ নামে আরও দুটি জাহাজ বন্দরের জলসীমায় পৌঁছানোর কথা। সব মিলিয়ে এই চার জাহাজে এলএনজি রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টন। কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে এই জাহাজগুলো এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের আগেই ওমান উপসাগর থেকে ‘সেভান’ নামে একটি জাহাজ গতকাল চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। জাহাজটিতে রয়েছে ২২ হাজার ১৭২ টন এলপিজি, যা ওমানের সোহার বন্দর থেকে এসেছে। এর আগে একই বন্দর থেকে ‘জি ওয়াইএমএম’ নামে আরেকটি এলপিজিবাহী জাহাজ বন্দরে পৌঁছেছে। ওই জাহাজে ছিল ১৯ হাজার ৩১৬ টন এলপিজি। সব মিলিয়ে দুটি জাহাজে এলপিজি রয়েছে ৪১ হাজার ৪৮৮ টন। দুটি জাহাজে প্রায় ৩৫ হাজার টন এলপিজি রয়েছে মেঘনা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির। বাকি এলপিজি এনেছে জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস লিমিটেড।
এ ছাড়া ডিজেল নিয়ে ‘এসপিটি থেমিস’ নামের ৩১ হাজার টনের একটি জাহাজ বন্দরের পথে রয়েছে। আগামী ১২ মার্চ জাহাজটি বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে ১৪ হাজার টন গ্যাসের উপজাত কনডেনসেট নিয়ে পৌঁছেছে হুয়া সুন নামের একটি জাহাজ। কনডেনসেট থেকে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও এলপিজি উৎপাদন করা হয়। এর বাইরে সিঙ্গাপুর থেকে ৪০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল নিয়ে পৌঁছেছে দুটি জাহাজ। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর ৪ মার্চ এলপিজি ও ডিজেলের দুটি জাহাজ বন্দরে পৌঁছায়। জাহাজ দুটি তেল-গ্যাস খালাস করে শুক্রবার বন্দর ছেড়েছে। এই দুটি জাহাজ হলো ওরিয়েন্টাল গ্রিনস্টোন ও পল।