

প্রতি বছর বাবা দিবস আসে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে ওঠে বাবার সঙ্গে হাসিমুখের ছবিতে; কিন্তু চকমকে সেই উৎসবের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে কিছু বাবার বুকফাটা আর্তনাদ। তাদেরই মধ্যে একজন ১০৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ বাবা এসকান্দার আলী খলিফা। এক শতাব্দী পার করা এই মানুষটির জীবনের গল্প যেন সিনেমার চেয়ে নাট্যময় এবং বাস্তবতার চেয়ে নির্মম।
বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার আউলিয়াপুর গ্রামের বাসিন্দা এসকান্দার আলী। একাত্তরের স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশের চরম সংকটের দিনে পাঁচ সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করতে বুক দিয়ে লড়েছেন। কখনো আটা-রুটি বিক্রি করেছেন, কখনো বিল থেকে শাপলা তুলে বাজারে বেচেছেন, আবার কখনো অন্যের জমিতে দিনমজুরি করেছেন। অভাবের সংসারে নিজে না খেয়ে সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছেন, করিয়েছেন লেখাপড়া। তার ভাগ্যের চাকাও ঘুরেছিল একসময়। নিজে চাকরি পেয়েছিলেন ঢাকাস্থ জাপান দূতাবাসে। সে সুবাদে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সন্তানদেরও। চার ছেলের মধ্যে বড় ছেলে বাবুল নোয়াখালীতে সফল ব্যবসায়ী। মেজো ছেলে ফারুক হোসেন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য। সেজো ছেলে সাইদুর রহমান ঢাকা মেডিকেলের ওয়ার্ড বয়; কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস, বাবা যখন কর্মহীন হয়ে পড়লেন, তখন প্রতিষ্ঠিত তিন ছেলেই যেন অন্ধ হয়ে গেলেন। বিত্ত-বৈভব থাকার পরও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের খোঁজ নেওয়া তো দূরের কথা, নাতি-নাতনিরাও আর দাদা-দাদির ছায়া মাড়ায়নি। অনাহারে-অর্ধাহারে কাটতে শুরু করে এসকান্দার আলী ও তার স্ত্রীর দিন।
কিন্তু এসকান্দার আলী তো শুধু নিজের সন্তানদের বাবা নন, তিনি যে এক বিশাল হৃদয়ের বাবা। নিজের এই চরম অবহেলা আর কষ্ট থেকে তিনি অনুভব করলেন সমাজের অন্য অসহায় বাবা-মায়েদের যন্ত্রণা। ২০১৫ সালে স্ত্রীর জমানো শেষ সম্বলটুকু নিয়ে বরিশাল নগরীর কাউনিয়া এলাকায় ভাড়া বাসায় গড়ে তুললেন এক অনন্য আশ্রয়—একটি বৃদ্ধাশ্রম। তার এই লড়াইয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ছোট ছেলে শাখাওয়াত হোসেন। এজন্য ঢাকায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজিতে (বিইউবিটি) অফিস সহকারীর চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। এরপর ঢাকা ও বরিশালের মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে অর্থ সাহায্য নিয়ে বাবা-ছেলের এই যৌথ লড়াই সচল রেখেছিল শত অসহায় মানুষের শেষ ঠিকানা।
দুর্ভাগ্য যেন পিছু ছাড়ে না এ বাবার। ২০২০ সালে সহধর্মিণী নূরজাহান বেগমকে হারিয়ে একা হয়ে পড়েন এসকান্দার আলী। এরপর করোনা মহামারির থাবায় শুরু হয় চরম আর্থিক সংকট। বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দিতে হয় ‘বাবাদের নিবাস’। তবে বুক ভাঙলেও হাল ছাড়েননি, এখনো কোনোমতে চালু রেখেছেন ‘মায়েদের আশ্রম’। সেই আশ্রমেই এখন বসবাস করেন অসহায় বৃদ্ধ বাবা এসকেন্দার আলী খলিফা।
সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে মাত্র এক সপ্তাহ আগে। ১০৫ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ বাবা যখন বাকেরগঞ্জের নিজ বাড়িতে পরিত্যক্ত ঘরটুকু দেখতে যান, তখন সামান্য জমিজমার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে মেজো ছেলে অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য ফারুক হোসেন ও তার স্ত্রী চড়াও হন এই বাবার ওপর। যে হাত দিয়ে একসময় সন্তানকে আগলে রেখেছিলেন, সেই বাবার গলায় দা ধরেন মেজো ছেলে! এসব বলে কেঁদে ফেলেন মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ সমস্যায় ভোগা এই বাবা। তার ওপর আগুনে ঝলসে গেছে তার একটি পা।
তবুও বাবা তো বাবাই। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে, মৃত্যুর প্রহর গুনতে গুনতে এই শতায়ু বৃদ্ধের মনে সন্তানদের প্রতি বিন্দুমাত্র ক্ষোভ বা আক্ষেপ নেই। পরম মমতায় এখনো সন্তানদের জন্য হাত তোলেন স্রষ্টার দরবারে। চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন—‘ওগো প্রতি আমার কোনো রাগ নাই। আল্লাহর কাছে শুধু এই দোয়া করি, ওগো সন্তানরা বড় হয়ে যেন ওগো সঙ্গে এমন ব্যবহার না করে।’
এদিকে এ বয়সেও নিজের শেষ সম্বল বিলিয়ে দিচ্ছেন পরার্থে। বরিশাল নগরীর হরিণাফুলিয়া বিলামঘর এলাকায় স্থায়ী বৃদ্ধাশ্রমের জন্য কিনেছেন ১৩ শতক জমি, আর ২০ শতক জমি দান করেছেন কবরস্থানের জন্য।
এসকান্দার আলীদের মতো যে বাবারা জীবনের সবটুকু নিঙড়ে দিয়ে আজ সন্তানদের কাছেই ‘ছুড়ে ফেলা আবর্জনা’, তাদের এই দীর্ঘশ্বাসের দায় কার?