

নাইজেরিয়ান নাগরিক ডন ফ্রাঙ্কি ওরফে জ্যাকব ফ্রাঙ্কি। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল। চক্রের সদস্যদের কাছে সে বিগ বস নামে পরিচিত। ফ্রাঙ্কি বাংলাদেশ নাইজেরিয়ান কমিউনিটির প্রেসিডেন্ট। ৯ বছর ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করা ফ্রাঙ্কি ৯ মাস আগে নিজ দেশে পাড়ি জমিয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সলিড কোকেনের সবচেয়ে বড় চালান জব্দের পর উঠে আসে এই ডন ফ্রাঙ্কির নাম।
গতকাল রোববার রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় ডিএনসির উত্তরা কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মহাপরিচালক মুস্তাকীম বিল্লাহ ফারুকী এ সব তথ্য জানান। এর আগে ২৪ জানুয়ারি রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন থেকে মালাউয়ের নাগরিক সুকুকে ৮ কেজি ৩০০ গ্রাম কোকেনসহ গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন রাতে ২০০ গ্রাম কোকেনসহ তানজানিয়ার নাগরিক মোহামেদি আলীকে গ্রেপ্তার করে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।
মাত্র এক দিনের ব্যবধানে একাধিক অভিযানে দেশের ইতিহাসে সর্বাধিক কোকেন উদ্ধারের ঘটনায় জড়িতদের ধরতে মাঠে নামে ডিএনসি। এরপর ২৫ জানুয়ারি থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ধারাবাহিক অভিযানে দুই বাংলাদেশিসহ আরও পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর পরই বেরিয়ে আসে দেশে গার্মেন্টস ব্যবসার আড়ালে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রের তথ্য।
গ্রেপ্তাররা হলো সাইফুল ইসলাম রনি (৩৪), আসাদুজ্জামান আপেল (২৭), ক্যামেরুনের নাগরিক কেলভিন ইয়েং, নাইজেরিয়ান নাগরিক ননসো ইজিমা পেটার ওরফে অস্কার (৩০) ও নুডেল ইবুকা স্টানলি ওরফে পডস্কি (৩১)।
ডিএনসির মহাপরিচালক ফারুকী বলেন, মালাউয়ের নাগরিক ও তানজানিয়ার নাগরিককে গ্রেপ্তারের পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ, ডিজিটাল ডিভাইস ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কোকেন চোরাচালান চক্রের অন্যান্য সদস্যসহ মূলহোতা ডন ফ্রাঙ্কির সন্ধান পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, পরে তথ্য বিশ্লেষণ করে রাজধানীর বসুন্ধরায় অভিযান চালিয়ে ক্যামেরুনের কেলভিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কেলভিন চলতি মাসের ২০ তারিখ আরেক বিদেশি নাগরিক মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। কেলভিন মাদক চক্রের অন্যতম সদস্য। সে বাংলাদেশে বসে মাদকের দেশি-বিদেশি সদস্যদের সমন্বয় করে। ২৪ জানুয়ারি কোকেনসহ মালাউয়ের নাগরিক গ্রেপ্তারের খবরে দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল কেলভিন। প্রস্তুতিকালেই তাকে গ্রেপ্তারের করা হয়।
ফারুকী বলেন, মাদক চক্রের মূলহোতা ডন ফ্রাঙ্কির বাংলাদেশি সহযোগী রনিকে গ্রেপ্তারের পর চক্রের অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালায় ডিএনসি। রনি সিন্ডিকেটের বাংলাদেশি সমন্বয়কারী। তার কাজ ছিল মাদক বহনকারীদের দেশে প্রবেশের প্রয়োজনীয় ইনভাইটেশন, হোটেল বুকিং ও ভিসা পাওয়ার কার্যক্রমে সহযোগিতা করা। ম্যাসপেক্স লিমিটেড নামের কথিত একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এই আমন্ত্রণ পত্র ইস্যু করা হতো।
রনির মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও অন্যান্য প্রযুক্তির ডিভাইস বিশ্লেষণ করে একাধিক ভুয়া ইনভাইটেশন লেটার পাঠানো ও চক্রের মূলহোতা ফ্রাঙ্কির সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বারিধারার একটি বাসায় ফ্রাঙ্কির অফিসে অভিযান চালিয়ে কোকেন চোরাচালান সিন্ডিকেটের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত লাগেজ পাওয়া গেছে।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও বাড়ির মালিকদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ফ্রাঙ্কি দীর্ঘ ৯ মাস আগে বাংলাদেশ ত্যাগ করেছে। তার অবর্তমানে ফ্রাঙ্কির ভাই উইসলি ও তাদের ম্যানেজার আসাদুজ্জামান আপেল ওই বাসায় থেকে ব্যবসা দেখাশুনা করত। কোকেন চালান আটকের সংবাদ পেয়ে তারা আত্মগোপন করে। পরে অভিযান চালিয়ে আপেলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে আপেল ডিএনসিকে জানিয়েছে, বাংলাদেশে কোকেনের চালান প্রবেশের পরে পুনপ্যাকেজিং, নিরাপত্তা নিশ্চিতে সহায়তা দায়িত্ব ছিল তার। তার ডিজিটাল ডিভাইস বিশ্লেষণ করে এ-সংক্রান্ত প্রমাণাদিও পাওয়া গেছে। উইসলি কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ ত্যাগ করেছে। পরে আপেলের দেওয়া তথ্যে বসুন্ধরা থেকে অস্কার ও পডস্কিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এই চক্রের সঙ্গে আরও যারা জড়িত তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে বলে জানিয়েছেন ডিএনসির মহাপরিচালক।