রওশন এরশাদের ডাকা সম্মেলনে জাতীয় পার্টির (জাপা) ইতিহাসে সর্ববৃহৎ জমায়েত ঘটাতে চান তার অনুসারীরা। তবে জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুরসহ ১৯টি সাংগঠনিক জেলার তৃণমূল থেকে কোনো সাড়া পাননি তারা। ফলে সম্মেলন ঘিরে রওশনপন্থিদের মধ্যে তৈরি হওয়া আকাশচুম্বী প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত কতটা পূরণ হবে, তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। আগামীকাল শনিবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
জানা গেছে, জাতীয় পার্টির ৭৮ সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৫৯টির প্রতিনিধিরা রওশনের ডাকা সম্মেলনে উপস্থিত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এসব জেলার ১৬০ উপজেলার নেতাকর্মীরা সম্মেলনে যোগ দেবেন।
জাপার রওশন অংশের মুখপাত্র সুনীল শুভ রায় কালবেলাকে বলেন, ‘শনিবার এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ কাউন্সিলের আয়োজন করা হয়েছে। সম্মেলনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আমন্ত্রণ জানানোর কাজও শেষ পর্যায়ে। কারও সাধ্য নেই সম্মেলন বানচাল করার।’
রওশনপন্থিদের অভিযোগ, ঘরে-বাইরে সম্মেলন বানচালের ষড়যন্ত্র চলছে। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় রওশনপন্থি প্রভাবশালী একাধিক নেতা শনিবার সম্মেলন না করার পরামর্শ দিয়েছেন। এই নেতাদের জি এম কাদের অংশের এজেন্ট বলেও আখ্যায়িত করা হয়েছে।
জাপার ভেতরে গুঞ্জন আছে, জাতীয় পার্টির নামে কাউন্সিলের আয়োজন করায় রওশনপন্থি অনেক নেতা গ্রেপ্তার হতে পারেন। সে আতঙ্কে অনেকেই সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করছেন। সম্মেলনের উদ্যোক্তা কয়েকজনকে বৃহস্পতিবার মোবাইল ফোনে পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে রওশনের ডাকা সম্মেলন ঘিরে উভয় পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে চাপা উত্তেজনা।
প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। দলটি বর্তমানে ছয় ভাগে বিভক্ত। সর্বশেষ এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ ও ভাই জি এম কাদেরের মধ্যে নেতৃত্বের কোন্দলে আরেক দফা বড় ধরনের ভাঙনের মুখে পড়তে যাচ্ছে দলটি, যার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে ৯ মার্চ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে।
রওশন অংশের নেতাদের দাবি, এর আগে নানা কারণে অনেকেই জাতীয় পার্টি নামে আলাদা দল করলেও প্রতিষ্ঠার পর এটাই সবচেয়ে বড় রকমের ভাঙন। এবারের সম্মেলনে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে প্রভাবশালী অনেক কেন্দ্রীয় নেতা জি এম কাদেরকে ছেড়ে আসায় মাঠ পর্যায়ে বিভক্তি বেড়েছে।
রওশনপন্থিদের দাবি, জি এম কাদেরের সঙ্গে থাকা অনেকেই আগামী শনিবার রওশনের সম্মেলনের মঞ্চে উঠে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে পারেন। অন্তত ১০ জন প্রেসিডিয়াম সদস্য আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় ৩০ জনের বেশি নেতা যোগ দিতে পারেন এ অংশে। জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন নেতারাও আসবেন রওশনের দলে।
জানা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার বাইরে যারা জাতীয় পার্টি থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন তাদের বেশিরভাগই জি এম কাদেরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের এমপি প্রার্থীদের মধ্যে প্রায় শতাধিক নেতাও আসছেন সম্মেলনে।
রওশনপন্থিদের দাবি, গত ৬ মার্চ জি এম কাদেরের ডাকা প্রেসিডিয়াম ও সংসদ সদস্যদের যৌথ সভা থেকে পাঁচজন শীর্ষ নেতা সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে বিতর্কের মধ্যে বেরিয়ে যান।
সূত্র বলছে, বনানী কার্যালয়ে জি এম কাদেরের বৈঠক চলাকালেই চট্টগ্রামের দুই নেতার নেতৃত্বে সোনারগাঁও হোটেলে ১১ জন প্রেসিডিয়াম সদস্য আলাদা বৈঠক করেন। যদিও তারা শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে কাদেরের ডাকা বৈঠকে অংশ নেননি। সব মিলিয়ে ১৬ জন প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশনের দলে যোগ দিতে পারেন বলে একাধিক সূত্রের দাবি।
রওশনের পক্ষ নেওয়া একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য কালবেলাকে বলেন, ‘অর্ধশতাধিক প্রেসিডিয়ামের মধ্যে জি এম কাদেরের যৌথ সভায় মাত্র ১৭ জন ছিলেন। বাকিদের অনুপস্থিতি প্রমাণ করে, তারা কোথায় যাচ্ছেন। এ ছাড়া ১৩ সংসদ সদস্যের মধ্যে অন্তত ৭ জন রওশনের দিকে আছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এরই মধ্যে সম্মেলনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য বিএনপি ও জামায়াত ছাড়া সব রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করবেন এরশাদপত্নী রওশন।
এদিকে সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক দল গঠনের আগেই রওশন অংশে নেতৃত্ব নিয়ে চাপা বিভক্তি বিরাজ করছে। রওশনের দলের মহাসচিব হতে চান সাবেক এমপি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা। যদিও রওশনের পছন্দের তালিকায় আছেন কাজী মামুনুর রশীদ। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত মহাসচিবের বিষয়টি সুরাহা হয়নি। আজ শুক্রবার এ বিষয়ে রওশনের বাসায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
সম্মেলনের একজন উদ্যোক্তা জানান, জাতীয় পার্টিকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিচালনার জন্য এবার গঠনতন্ত্রে আমূল পরিবর্তন আনা হবে। একজনের নিয়ন্ত্রণে দল পরিচালনা হবে না। দলীয় সিদ্ধান্তের সর্বময় ক্ষমতা থাকবে প্রেসিডিয়ামের কাছে।
এদিকে রওশনের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন জি এম কাদের। বিজ্ঞপ্তিতে দলের চেয়ারম্যান ও মহাসচিব ছাড়া জাতীয় পার্টির নাম ব্যবহার করে অন্য কারও আহ্বানে ঢাকায় বা অন্য কোনো স্থানে আয়োজন করা কোনো সম্মেলন, সভা, সমাবেশ কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ না নিতে কেন্দ্রীয়, জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়নের সব স্তরের নেতাকর্মীদের অনুরোধ করা হয়েছে।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু কালবেলাকে বলেন, ‘জাতীয় পার্টি এক ও ঐক্যবদ্ধ। একটি পক্ষ দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদকে ব্যবহার করে জাপা ভাঙার চেষ্টা করছে। তারা এতে সফল হবে না। সবাই আমাদের সঙ্গে আছেন। কেউ দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জানা গেছে, নির্বাচনের পর দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে প্রভাবশালী নেতাকে বহিষ্কার করেন জি এম কাদের। তাদের মধ্যে রয়েছেন সফিকুল ইসলাম সেন্টু, কাজী ফিরোজ রশিদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, শুনীল শুভ রায়সহ অনেকেই। এর মধ্যে সেন্টু ও বাবলা রাজধানীতে জাপার যে কোনো অনুষ্ঠানে লোক জমায়েত করতেন। রওশনের সম্মেলনে তারা একই দায়িত্ব পালন করবেন।
সূত্রগুলো বলছে, দল থেকে বহিষ্কারের ভয়ে এ মুহূর্তে জাপার এমপিদের কেউ সরাসরি রওশনের সঙ্গে যাচ্ছেন না। কারণ দল থেকে বহিষ্কার হলে সংসদ সদস্যপদ হারাতে পারেন তারা। সম্মেলনের পর জাতীয় পার্টি নামে দল পরিচালনা ও প্রতীকের বিষয়টি ফয়সালা হলে এমপিরা বিকল্প চিন্তা করতে পারেন বলে জানা গেছে।