

অশ্রু
অশ্রু, তুমি কি শুধু একজন মানুষের নাম, নাকি ভোরের জানালায় জমে থাকা নিঃশব্দ কুয়াশার মতো কোনো মায়া? আমি তোমাকে ডেকেছি প্রেম বলে, আর জীবন তোমাকে চিনিয়েছে চোখের কোণে জমে থাকা লবণাক্ত সত্য হয়ে।
তুমি যখন পাশে ছিলে, দুঃখও যেন ফুল হয়ে ফুটত— ভাঙা রাস্তায়ও আমি আলোর ঠিকানা খুঁজে পেতাম। তোমার হাসি ছিল এক টুকরো রোদ, যা ক্লান্ত দুপুরের গায়ে লেগে আমাকে আবার বাঁচতে শিখিয়েছে।
তারপর একদিন তুমি দূরে গেলে— ঠিক যেমন নদী সরে যায় তীর থেকে, তবু তার স্রোত রয়ে যায় মাটির ভেতর। সেদিন বুঝেছি, অশ্রু শুধু হারানোর ভাষা নয়, অশ্রু মানে হৃদয়ের গভীরে বেঁচে থাকারও এক গোপন শপথ।
চোখের অশ্রু ঝরে, কারণ মন এখনো মৃত হয়নি; যে কাঁদতে জানে, সে আবার হাসতেও জানে। যে হারানোর ব্যথা বয়ে নেয়, সে-ই একদিন নতুন ভোরের সামনে দাঁড়িয়ে বলে— ‘আমি এখনো ভাঙিনি, আমি এখনো মানুষ, আমি এখনো ভালোবাসি।’
অশ্রু, তোমার নাম উচ্চারণ করলে আজও বুকের ভেতর ঢেউ ওঠে, তবু সেই ঢেউ আমাকে ডুবায় না, বরং তীরে ফিরিয়ে আনে। কারণ আমি জেনেছি— জীবনে সব চলে যাওয়া শেষ নয়, কিছু চলে যাওয়া মানুষকে আরও গভীর, আরও সত্য, আরও সুন্দর করে তোলে।
তাই আজ তোমাকে মনে পড়ে চোখে জল এলে আমি লুকাই না; এই অশ্রুই তো প্রমাণ আমি পাথর হয়ে যাইনি এখনো। এই অশ্রুই তো বলে— প্রেম ছিল, আছে, থাকবে; আর জীবন, যত কষ্টই দিক, শেষ পর্যন্ত বাঁচার পক্ষেই কথা বলে।
অশ্রু, তুমি আমার প্রিয় নাম, আবার তুমি আমার চোখের ভাষা— তুমি হারিয়ে গিয়ে শিখিয়েছো, ভালোবাসা কখনো বৃথা যায় না। কারণ যে প্রেম মানুষকে কাঁদায়, সেই প্রেমই একদিন তাকে আরও সুন্দরভাবে বাঁচতে শেখায়।
জীবনে যা কিছু সঞ্চয়
জীবনে যা কিছু সঞ্চয়— সবই কি আলমারির তাকে তুলে রাখা যায়? কিছু সঞ্চয় থাকে চোখের কোণে, কিছু জমে থাকে দীর্ঘশ্বাসের ভাঁজে, কিছু থেকে যায় পুরোনো চিঠির হলদে পাতায়, আবার কিছু গোপনে আশ্রয় নেয় মানুষের ব্যবহারে।
জীবনে যা কিছু সঞ্চয়, তা শুধু টাকা-পয়সা, জমি-জমা, স্বর্ণালংকার নয়— বরং কিছু অব্যক্ত কষ্ট, কিছু অসমাপ্ত স্বপ্ন, কিছু প্রিয় মুখের উষ্ণতা, আর কিছু হারিয়ে যাওয়া দিনের নরম আলো। মানুষ বেঁচে থাকে তার এই অদৃশ্য সঞ্চয় নিয়েই। কারণ, বাহ্যিক প্রাপ্তি একদিন ফুরিয়ে যায়, কিন্তু হৃদয়ে জমে থাকা মমতা, ভালোবাসা, স্মৃতি আর ত্যাগ কখনও একেবারে নিঃশেষ হয় না।
জীবনে যা কিছু সঞ্চয়, তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে অনেক না-বলা গল্প। কত অপমান চেপে রেখে মানুষ হাসতে শিখেছে, কত বেদনা বুকের ভেতর পুঁতে রেখে অন্যকে সাহস দিয়েছে, কত অভাব নিজের ভিতরে বেঁধে রেখে অন্যের প্রয়োজন মিটিয়েছে— এসবও তো একেকটা সঞ্চয়। যে সঞ্চয় ব্যাংকে জমা থাকে না, থাকে আত্মার গভীরে।
একদিন যখন জীবনের হিসাব মেলাতে বসি, তখন বুঝি— আমরা আসলে যা পেয়েছি, তার চেয়েও বেশি জমিয়েছি মানুষ, সম্পর্ক, মায়া আর স্মৃতি। এই সঞ্চয়ই শেষ পর্যন্ত মানুষকে ধনী করে, নয়তো ভরা ঘরেও কত মানুষ নিঃস্ব থেকে যায়।
জীবনে যা কিছু সঞ্চয়, তা যেন কেবল নিজের জন্য না হয়— কিছু সঞ্চয় থাকুক ভালোবাসায়, কিছু ক্ষমায়, কিছু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহসে। কারণ শেষ বেলায় মানুষ গুনে দেখে না তার কাছে কত ছিল, মানুষ গুনে দেখে— সে কতটুকু রেখে যেতে পেরেছে অন্যের হৃদয়ে।
রাজু ভাস্কর্যের সামনে
মার্চের তেরো এলেই ঢাকার বাতাসে এক অদৃশ্য ব্যথা ভেসে ওঠে। মঈন হোসেন রাজু— একটি নাম, একটি প্রতিবাদ, একটি অমলিন দাঁড়িয়ে থাকা ইতিহাস।
রাজু ভাস্কর্য-এর সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, সময়ের বুক চিরে কেউ যেন এখনও হাত দু’টি প্রসারিত করে বলছে— ‘থামো, আর নয়।’
সেই হাত দুটি ছিল প্রতিরোধের প্রতীক, ভয়ের বিরুদ্ধে সাহসের উচ্চারণ, অন্যায়ের সামনে এক তরুণের অদম্য প্রতিবাদ।
রোদে, বৃষ্টিতে, ঝড়ে— রাজু ভাস্কর্য নীরবে বলে যায় এক তরুণের অসমাপ্ত স্বপ্নের গল্প। যে স্বপ্ন ছিল ক্যাম্পাসে শান্তির, বন্ধুত্বের, ভয়হীন চলার।
১৩ মার্চ শুধু একটি দিন নয়— এটি স্মৃতির দরজা খুলে দেয়, যেখানে একজন তরুণ ছাত্র নিজের বুক দিয়ে থামাতে চেয়েছিল সহিংসতার ঢেউ।
আজও বিশ্ববিদ্যালয়ের পথ ধরে হেঁটে গেলে মনে হয় রাজু দাঁড়িয়ে আছে— দুই হাত মেলে, সময়ের কাছে প্রশ্ন রেখে—
মানুষ কী এখনো মানুষ হতে শিখেছে?
মর্যাদার শেষ প্রহর
উৎসর্গ : হরিশ রানা
দীর্ঘ তেরো বছরের নিঃশব্দ রাত। হাসপাতালের সাদা দেয়াল, মেশিনের টিকটিক শব্দ, আর নিঃশ্বাসের ধীর ওঠানামা— এই ছিল তার পৃথিবী।সময় যেন তার পাশে বসে থেকেও তাকে আর স্পর্শ করতে পারছিল না।
কখনো সে ছিল আলোভরা জীবনের মানুষ—স্বপ্ন ছিল, পথ ছিল, আকাশের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস ছিল।একদিন হঠাৎ সেই পথ থেমে গেল, শরীর রইল, কিন্তু জীবনের দরজা যেন আধখোলা হয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখ আর কথা বলেনি, কিন্তু নীরবতা অনেক কথা বলেছে।পরিবারের অপেক্ষা, মায়ের প্রার্থনা, আর ভালোবাসার দীর্ঘশ্বাস— সব মিলিয়ে সময়ের বুক ভারী হয়ে উঠেছিল।
শেষ পর্যন্ত আদালত বলল— জীবন যেমন মর্যাদার, মৃত্যুও তেমনি মর্যাদার।কখনো কখনো মুক্তিই সবচেয়ে বড় দয়া।
সেদিন হয়তো হাসপাতালের জানালা দিয়ে নরম আলো ঢুকছিল।মেশিনের শব্দ ধীরে ধীরে স্তব্ধ হচ্ছিল।কেউ হয়তো তার কপালে হাত রেখে বলেছিল— ‘এবার বিশ্রাম নাও, দীর্ঘ পথের ক্লান্তি শেষ হোক।’
জীবন তাকে দীর্ঘ নীরবতা দিয়েছিল,মৃত্যু তাকে দিল শান্তি।
আর পৃথিবী শিখল—কখনো কখনো বিদায়ও ভালোবাসারই আরেক নাম।