

লিকার চা
রাগি পাখির মতো তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে অশ্রুগুলো উড়ে যাচ্ছে ক্রুদ্ধ হয়ে চিৎকার করছো— কী চাও তুমি? খাবার জলের মতো শান্ত জলদস্যু হয়ে হয়তো সে বলছে... এক কাপ চা, লিকার রং... যেমন তোমার চোখ।
কাক
একটা কালো কাক তীব্র চোখে তাকায় আর খুট করে ঠোঁটে চতুর্দিক নিয়ে উড়ে পালায়। তারা কতিপয়, বেঁচে থাকার অনেক দূরে, দিকশূন্য নিষ্ফল ক্ষোভ ঝাড়ে আর একবার আসুক শালায়!
বউশীত
জালি নগ্নতার খলবলে রসে মেলেছে শরীর উলে বোনা অন্ধকার তাকে পরে নাও এই যুবা, তোমার কি বউশীত করে না? তুলতুলে আবরণ লাগে না?
এসেছে অনাঘ্রাতা তোমার অঘ্রাণে শব্দবন্দি দুজন নিঃশব্দে বলা তাড়ার ভেতরও একটা ঝড়ের আস্তে আস্তে চলা। খা-খা যৌবনে মেঘের ছায়া গুরুগম্ভীর কে যেন ডাকে দেহের মোম গলছে ধিক নেবে কি ওম দিগ্বিদিক? এই যুবা, তোমার কি বউশীত করে না? তুলতুলে আবরণ লাগে না?
শব্দ
শব্দটি বাতাস থেকে বেরিয়ে এলো আশ্চর্যে হা! কেমন আগুনের মতো ঘুরতে ঘুরতে কলমের ভেতর ঢুকে পড়লো কাঁপুনিতে কা!
শব্দটি বের করতে বসে পড়লো সে ধীরে ধীরে গাছের মাথা থেকে উড়ে গেল পাতাদের সবকটা ফিসফাস। না কিছুতেই বের হচ্ছে না।
উল্টো শব্দটি থেকে বেড়েই চলেছে শব্দের বংশ। না না না একটা স্ফুলিঙ্গের ভেতর ঢুকে পড়া ছাড়া আর কিচ্ছু করার নেই।
সে আর তার শহরটা সে আর তার শহরটা সে আর তার শহরটা একসাথে বুড়ো হচ্ছিল
তার স্ত্রী চায়ের কাপে চিনি নাড়তে নাড়তে বললো, দ্যাখো ওই দিকে আকাশে আগুনের জিহ্বা লকলক করছে আর রক্ত বয়ে যাচ্ছে, তখনো কুঁজো হয়ে হাঁটছে চলন্ত ট্রেনের পাশে পাশে আর প্ল্যাটফর্মের কুপকুপ জ্বলা কেরোসিনের বাতি ধরা স্টেশন তার পিছু পিছু।
ক্রমেই ঢুকে যাচ্ছে তন্তুর অরণ্যে, মাংস ভেদ করে অন্ত্র, পাকস্থলী, শিরায় শিরায় যেখানে তার শব্দ জীবাণুর মতো দুরারোগ্য রোগের ধূর্ত পরিকল্পনায়।
বাইরে মিটিমিটি শব্দে বেজে উঠেছে পুরনো বাড়ি ধসিয়ে দেওয়া রাজমিস্ত্রির হাম্বুল করোটির মতো পলেস্তারা খসা মুখ এদিক-সেদিক ছুটছে চুনকামে ধুলো ওড়া বাতাসে পুরনো ইটের গন্ধে ঘনিয়ে আসে গৌড় ঘনঘটা কালি সন্ধ্যায়
কবির হাতে নতুন শব্দ আর সে মরে পড়ে থাকে স্ত্রীর পাশে সাধারণ। কী ভয়ংকর সাধারণ! স্ত্রী তখনো বলছে... দ্যাখো দ্যাখো ওই দিকে...
বাবা
বাবা ছিলেন একটা বড় দিঘি, পরে ছোট হতে হতে জুন-জুলাইয়ের মধ্য মজা পুকুর, আরও কয়েক দিন পরে মানে আগস্টের শেষের দিকে একটা ছোট ডোবা হয়ে গেলেন।
ভেঙে পড়া পাড়ে পানির ওপর কলমিলতা আর বেগুনি রঙের ফুল, হেলেঞ্চার ঝোপ, এখানে ওখানে ঢেঁকিশাকের প্যাঁচানো শুঁড়। একটা হলদে ফড়িং আর নীল প্রজাপতি উড়ে উড়ে সেই শুঁড়ে বসছে আর সরে যাচ্ছে।
তাতানো দুপুরে পানির গন্ধ ছড়িয়ে যাচ্ছে—চুপ চুপ সব চুপ শব্দতরঙ্গে।
ভালোই হলো এই ছোট ডোবাটা মাটি দিয়ে ভরাট করা যাবে অনায়াসে। অত বড় দিঘি কি মাটিতে ঢেকে দেওয়া যায়!
ওভেন
নরক হিসেবে সে খুব অলস যদিও বাইরে এসে উঁকি দিয়ে একবার সময়কে ডেকেছিল একটু শুনবে? এই এদিকে সময়টা কী বুঝল কে জানে, এলো না সে-ও আর চ্যাঁচামেচি না করে চুপচাপ নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়ল। সে শুনতে পায় কারা যেন বলাবলি করছে—থেমে আছে। গাছেরা প্রতি বর্ষায় আরও সবুজ হয় চাঁদটাও ওপালের মতো চকমক করে সূর্যটা গলিত সোনার মতো উপচে পড়ে পৃথিবীটা উর্বরতা নিয়ে আরও সম্ভবা হচ্ছে বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা তরল ডায়মন্ডের মতো ঝরে যাচ্ছে।
সে যাই হোক ওরা হয়তো বলছে, একবার বাইরে এসে শেষবারের মতো চুমু খাও, আমাদের সুখী করে যাও। কিন্তু নরক হিসেবে সে খুব অলস নিজের ঘরেই শুয়ে আছে। সুইচ অন-এ উত্তপ্ত হচ্ছে, অফ-এ—শীতল।
অন্ধ ভিক্ষুক
লোকটা এ মহল্লায় সপ্তাহে দু-এক দিন আসে যখন হাতের লাঠি ঠুকে ঠুকে হাঁটে উচ্ছল গাছের আগা থেকে খ্যাপে ওঠা বর্ধন নেমে আসে রোডে।
গান গায়, ভিক্ষা করে। তার অন্ধ চোখে ফুটন্ত ঘূর্ণির ভেতর মৃত পানি উচ্চস্বরের গলা ঘিরে মহল্লার সন্ধ্যা বসে যায় বেদনার গিঁটে। পাখির নরম পালকের সুর বামে কোলাহল ডানে তারই নিঃশ্বাসের মতো একা নিঃসঙ্গতার ইকো করা ছোট্ট গুহা।
লোকটা এ মহল্লায় সপ্তাহে দু-এক দিন আসে এতো এতো ভিড়ের মাঝে ভিড়হীন চাঁদ হাঁটা নির্মেঘ চেয়ে চেয়ে হাসে।
অচল পয়সা ও খালি চেয়ার সাদা সূর্য তার একটা বাঘ ছিল, রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করত। সে কিনা খেতে পাবার আশায় লোকজনকে তার গায়ে আদর করে হাত বুলাতে দিত। তবু দিন শেষে তাঁর ডেরায় এসে ঘুমাত। তাঁর হাতে গোসল নিত। সে কিনা বাস করছিল বর্তমানের ভেতর, আবার অনন্তের ভেতর।
হলুদ সূর্য
তার একটা কুকুরও ছিল, বাংলা-ইংরেজি ভাষা জানত। সে কিনা বেঁচে থাকার আশায় লোকজনকে তার মহান স্তুতি আর ভক্তি দিয়ে সম্মান বেচত। তবু দিন শেষে তার ডেরায় এসে ঘুমাত। তার হাতে গোসল নিত। সে কিনা যেমন আছে তেমনের ভেতর থাকতে চাইত না। যেমন বস্তু চায় বস্তু হয়ে থাকতে, সমুদ্র চায় সমুদ্র হয়ে থাকতে। লাল সূর্য এখন সে অতীত, অচল পয়সা একজন খালি খালি খালি বসে আছে ধর্মের মতো শূন্যতার পূজা নিতে।
রবি দেখতে পাচ্ছে তার মধ্যবিত্ত ফ্রিজ থেকে চুরি হয়েছে। দুধের বোতলে আশা ছিল কেউ এটাকে অর্ধেক করে দিয়েছে রুটি, মাছ, মাংস, তরকারি ভরা পুষ্টি আর স্বপ্নের এক কৌটা বিয়ার ছিল তিনটে সাধ্যের কলা ছিল, তাও উধাও সাবধান! এই চৌর্য চক্রান্ত, লুণ্ঠনের দৌরাত্ম্য বন্ধ কর অন্যথায় চরম মূল্য দিতে হবে।
সোম
দেখতে পাচ্ছে দুধের বোতলটা ভরে কেউ উপরের শ্রেণিতে রেখে দিয়েছে দুটি কলা ‘ভি’ আকারে পড়ে আছে নিশ্চয়ই হারামজাদা দুধটা শোষণ করে বিজয় উল্লাস করছে এখন থেকে স্টক এক্সচেঞ্জের অফিসে বসেই মনিটরিং করবে সে ক্ষুধার্তের চুম্বক, ঠান্ডা সৌন্দর্যের নিগূঢ় অভ্যর্থনা,
তুমি থাকবে ওখানেই থাকবে পচন সংহারি প্রিয় সংকোচনকারী, কালো ফ্রিজ। নিশ্চয়ই শয়তান তুই ধরা পড়বি।
মঙ্গল
দেখতে পাচ্ছে ক্যামেরা ফ্রিজটার পরিবর্তে নজরদারি করছে মহিলা টয়লেটের দরজা, ছদ্ম প্রগতির ফেলে যাওয়া টিস্যু। এটা অসহনীয় এবং মূল্যস্ফীতিক কর্তৃত্ব সব দখল করে নিয়েছে। নতুন কলাপাতার মতো তোমাদের নেতৃত্ব গুটানো হবে সম্ভাবনার বেদিতে বিরাজ করা ভবিষ্যৎ না দেখা পর্যন্ত ফ্রিজ তার অফিসের ভেতরেই থাকবে।
বুধ
দেখতে পাচ্ছে তার অফিসে কেউ অনুপ্রবেশ করেছে ফ্রিজটি তুলে নিয়ে ডেস্কে একটা শর্তের চিঠি লিখে গেছে কে জানে কোন মায়োপিক এই দুষ্কর্ম করছে কিন্তু ঠিকই খুঁজে বের করা হবে এবং শাস্তি তাকে পেতেই হবে।
বৃহস্পতি
দেখতে পাচ্ছে এগারোটা ফ্রিজ অফিসের সমস্ত ফ্লোরে ছড়িয়ে আছে প্রশাসন হয়ে যাচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্র!
সে তোমাদের ব্যবস্থাপনা স্বীকার করে নিচ্ছে দয়া করে পরিত্রাণ দাও ফিরিয়ে দাও তার রুটি, দুধ, চাকরি, জীবন।
তাকে একা থাকতে দাও। অতি শীতল ঠান্ডা কুঠুরিতে জমাট, হিমায়িত।
সালমান রাইয়ান। পৈতৃক বাড়ি বরিশাল। জন্ম ২০ অক্টোবর ১৯৭৭ সালে বাবার কর্মস্থল পটুয়াখালী শহরে হলেও বেড়ে ওঠা বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন শহরে। বরিশাল শহরের নূরিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস থেকে এমবিএ করে ব্যবসার সাথে যুক্ত হোন।