

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বহুমাত্রিক চাপের মধ্যে রয়েছে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচও বেড়েছে। শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ কমে এসেছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আসন্ন ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ঘিরে বাড়ছে প্রত্যাশা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল কর কাঠামো গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতি বছর করহার ও নীতির পরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে এবারের বাজেটে অন্তত পাঁচ বছরের জন্য স্থিতিশীল করনীতি, কর ব্যবস্থার সরলীকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
তাদের মতে, দেশের কর ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে। প্রায় প্রতি অর্থবছরেই করহার, উৎসে কর, ন্যূনতম কর কিংবা কর অব্যাহতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়। এতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়। কারণ একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সাধারণত পাঁচ থেকে ১০ বছরের পরিকল্পনা সামনে রেখে বিনিয়োগ করে। কিন্তু কর কাঠামো বারবার পরিবর্তিত হলে বিনিয়োগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ডক্টর রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, অর্থনৈতিক নীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। শুধুমাত্র করের হার বাড়িয়ে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর চিন্তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বরং করের আওতা বাড়ানো, অপ্রদর্শিত অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন গড়ে তোলার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। তিনি আরও বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায়। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর করনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে শিল্প উদ্যোক্তারা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারেন না। ফলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কর কাঠামোর জটিলতাও বড় একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা। বর্তমানে বিভিন্ন খাতে ভিন্ন ভিন্ন করহার বিদ্যমান। কোথাও ২০ শতাংশ, কোথাও ২৫ শতাংশ, আবার কিছু ক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপ করা হয়। এতে একই অর্থনীতির মধ্যে বৈষম্য তৈরি হয় এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন, কর কাঠামো সহজ ও ব্যবসাবান্ধব না হলে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের করনীতি এখনও অনেকাংশে জটিল ও ব্যাখ্যানির্ভর। এতে উদ্যোক্তাদের প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ে এবং কর সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তিনি বলেন, একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান যখন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করে, তখন তারা স্থায়ী নীতিগত পরিবেশ প্রত্যাশা করে। কিন্তু করনীতি ঘন ঘন পরিবর্তিত হলে ব্যবসার ব্যয় কাঠামো হিসাব করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় পড়েন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বরাবরই কর প্রশাসনের সংস্কার ও নীতির স্থিতিশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। তার মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় করদাতাবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। শুধুমাত্র করের চাপ বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা করলে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। তাই করমুক্ত আয়সীমা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যক্তি ও করপোরেট কর ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত রূপরেখা ঘোষণা করা হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা যাবে। একই সঙ্গে কর প্রশাসনে ডিজিটালাইজেশন বাড়ানো, অনলাইনভিত্তিক রিটার্ন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা এবং কর কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়েও জোর দেওয়া প্রয়োজন।
সাকিফ শামীম বলেন, বর্তমানে রাজস্ব আদায়ের বড় অংশই সীমিত সংখ্যক করদাতার ওপর নির্ভরশীল। অথচ দেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি এখনও কর নেটের বাইরে রয়েছে। এই খাতকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে করহার না বাড়িয়েও রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব হবে। তিনি বলেন, আসন্ন ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘোরানোর সুযোগ তৈরি করেছে। যদি সরকার স্বল্পমেয়াদি রাজস্ব আহরণের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা ও ব্যবসাবান্ধব কর কাঠামোর দিকে অগ্রসর হয়, তাহলে তা বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যথায় নীতি অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগ স্থবিরতার বর্তমান পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারমতে, বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নীতির ধারাবাহিকতার অভাব।
প্রায় প্রতি অর্থবছরেই করহার, উৎসে কর, ন্যূনতম কর বা কর অব্যাহতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়। ফলে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে পারেন না। একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান সাধারণত ৫ থেকে ১০ বছরের পরিকল্পনায় বিনিয়োগ করে। কিন্তু কর কাঠামো যদি প্রতি বছর বদলে যায়, তাহলে সেই বিনিয়োগের ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়।
তিনি জানান, বর্তমান কর কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, আয়কর রাজস্ব ধীরে ধীরে বাড়লেও তা এখনও জিডিপির তুলনায় খুবই কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয়কর রাজস্ব দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির মাত্র ২.৪৪ শতাংশ। একই সময়ে কর আহরণের লক্ষ্যমাত্রাও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার ভেতরে এখনও বড় ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে।
এছাড়া করদাতার সংখ্যাও আশানুরূপ নয়। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ব্যক্তিগত টিআইএন-ধারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ হলেও মোট জনসংখ্যার তুলনায় এটি মাত্র ৬.৬৮ শতাংশ। অন্যদিকে রিটার্ন জমার হার আরও কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যক্তিগত করদাতাদের মধ্যে মাত্র ৩৯ শতাংশ রিটার্ন জমা দিয়েছেন। অর্থাৎ দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী এখনও কার্যকর কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে।
সাকিফ শামীম বলেন, এই সীমাবদ্ধতার কারণে সরকার উৎসে করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে মোট আয়কর রাজস্বের প্রায় ৬৮ শতাংশই উৎসে কর থেকে আসে। কিন্তু অতিরিক্ত উৎসে কর ব্যবসার ব্যয় বাড়ায় এবং উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখে পড়েন। এতে ব্যবসার ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ বৃদ্ধি পায় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সক্ষমতা কমে যায়। দেশের কর ব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা হলো জটিল করহার কাঠামো। বিভিন্ন খাতে ভিন্ন ভিন্ন করহার বিদ্যমান। কোথাও ২০ শতাংশ, কোথাও ২৫ শতাংশ, আবার কোথাও ৪০ বা ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপ করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে অধিকাংশ দেশে এক বা দুই ধরনের করহার অনুসরণ করা হলেও বাংলাদেশে কর কাঠামোর এই বৈচিত্র্য বিনিয়োগকারীদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
ন্যূনতম কর ব্যবস্থাও বর্তমানে অনেক বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত লাভ না হলেও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ন্যূনতম কর দিতে হচ্ছে। ফলে ক্ষতির মধ্যেও কর পরিশোধ করতে হয়। এটি বিশেষ করে নতুন ও ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে। একইভাবে অতিরিক্ত উৎসে কর এবং জটিল রিটার্ন ব্যবস্থাও ব্যবসায়িক পরিবেশকে কঠিন করে তুলছে। তিনি আরও বলেন, কর অব্যাহতির ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে কর অব্যাহতির কারণে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির প্রায় ২.২৯ শতাংশের সমান। কিন্তু এই কর সুবিধাগুলো কতটা কার্যকরভাবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়েছে, তার সুস্পষ্ট মূল্যায়ন খুব কম দেখা যায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কর অব্যাহতি কাঙিক্ষত অর্থনৈতিক ফল দিচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটে সিএসইআর-এর পক্ষ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে যা বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের কর ব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব হতে পারে বলেও জানান এই ব্যবসায়ী নেতা।