মোহাম্মদ যায়েদ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৩, ০৭:৫১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
এশিয়ার প্রথম ‘এলিফ্যান্ট ওভারপাস’

নিচে চলবে ট্রেন, ওপর দিয়ে পার হবে হাতি

চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে নির্মিত এশিয়ার সর্বপ্রথম এলিফ্যান্ট ওভারপাস। ছবি : কালবেলা
চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে নির্মিত এশিয়ার সর্বপ্রথম এলিফ্যান্ট ওভারপাস। ছবি : কালবেলা

দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইনে লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বুক চিরে নির্মিত হয়েছে এশিয়ার সর্বপ্রথম এলিফ্যান্ট ওভারপাস। এই ওভারপাসের উপরে হাতি ও নিচ দিয়ে ট্রেন চলাচল করবে। রেললাইনের কারণে বন্যপ্রাণী চলাচলে যেন কোনো প্রকার বাধার সৃষ্টি না হয়, এজন্য তৈরি করা হয়েছে এলিফ্যান্ট ওভারপাস।

জানা যায়, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বুক চিরে গেছে রেললাইন। এর প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশ অভয়ারণ্যের মধ্যে পড়েছে। এই অংশে বন্যহাতির চলাচলে যাতে সমস্যা না হয় বিষয়টি মাথায় রেখে ৩টি আন্ডারপাস ও একটি ওভারপাস নির্মাণ করা হয়েছে। ‘এলিফ্যান্ট ওভারপাস’ নির্মাণের জায়গা নির্ধারণে জন্য এশিয়ার উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ দল প্রায় দুই বছর কাজ করেছেন। ভারত-বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে যাতায়াত করা এশিয়ান প্রজাতির হাতি সবচেয়ে বেশি চলাচল করে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এলাকা দিয়ে। ওভারপাস দিয়ে হাতিরা এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে যাতায়াত করতে পারবে। অপরদিকে অভয়ারণ্য এলাকায় বন্যপ্রাণীরা যাতে রেললাইনে আসতে না পারে তার জন্য করা হচ্ছে লবণ পানির লেক। বন্যহাতি লবণ পানি পান করতে পছন্দ করে। এ ছাড়া বন্যহাতির দল কোথাও পানি দেখলে সেখানে অবস্থান করতেও পছন্দ করে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ৫০ মিটার দীর্ঘ এলিফ্যান্ট ওভারপাসের কাজ প্রায় পুরোটা সম্পন্ন হয়েছে। ওভারপাসের উপরে লাগানো হয়েছে হাতির পছন্দের কলা, বাঁশসহ প্রায় ৪১ প্রজাতির গাছ। যার ফলে এই ওভারপাস দিয়ে যাতায়াতে আকৃষ্ট হবে বন্যহাতির দল। ওভারপাসের দুই পাশে নির্দিষ্ট এলাকা পর্যন্ত সীমানা প্রাচীরের কাজ চলমান রয়েছে। ফলে চেষ্টা করলেও এই সীমানা প্রাচীরের কারণে বন্যহাতির দল রেললাইনে যেতে পারবে না।

দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণাধীন প্রতিষ্ঠানের ইনচার্জ রেজাউল হক জানান, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে এলিফ্যান্ট ওভারপাস নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে সাইড ওয়াল নির্মাণের কাছ চলছে। আগামী ১৫ অক্টোবর রেলপথে ট্রয়াল হবে। এ ছাড়া আগামী ২৮ অক্টোবর দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।

চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মাহমুদ হোছাইন জানান, বন্যহাতির দল যেই করিডোর দিয়ে বেশি যাতায়াত করে, সেখানেই এলিফ্যান্ট ওভারপাস নির্মাণ করা হয়েছে। মূলত অভয়ারণ্যের বন্যহাতিসহ অন্যান্য প্রাণীরা ওভারপাস ও আন্ডারপাস দিয়ে যাতায়াতে অভ্যস্ত না। সেহেতু রেললাইন এড়িয়ে বিকল্প পথ দিয়ে চলাচল করতে একটু সময় লাগবে তাদের। রেললাইনের কাজ শুরুর পর থেকে বন্যহাতির চলাচল আগের তুলনায় অনেকটা কমে গেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হাতি বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আবদুল আজিজ জানান, অভয়ারণ্য এলাকায় রেললাইনে নির্মিত আন্ডারপাসগুলো স্ট্যান্ডার্ড সাইজের হয়নি। এ ছাড়া বন্যাহাতি চলাচলের জন্য নির্মিত এলিফ্যান্ট ওভারপাসের সাইজও আরো দীর্ঘ হওয়া প্রয়োজন ছিল। হাতি খুবই বুদ্ধি সম্পন্ন প্রাণী। সুতরাং চলাচলের পথে সামান্য পরিবর্তন হলেও তারা বুঝতে পারে। ওভারপাস দিয়ে বন্যহাতি চলাচল করাতে কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। ওভারপাস দিয়ে প্রথমে বন্যহাতি চলাচল করতে দ্বিধাবোধ করলেও উপযোগী পরিবেশ পেলে তারা অভ্যস্ত হয়ে যাবে।

চুনতি ইউনিয়নের বাসিন্দা ও পরিবেশ কর্মী সানজিদা রহমান বলেন, পৃথিবীর বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মধ্যে এশিয়ান হাতি উল্লেখযোগ্য যার কিছু সংখ্যক বর্তমানে অবস্থান করছে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এলাকায়। চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মধ্য দিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার জুড়ে তৈরি হয়েছে ঢাকা কক্সবাজার রেললাইন। এ রেললাইনের প্রস্তাবিত নকশা অনুসরণ না করে হাতি চলাচলের জন্য মাত্র তিনটি আন্ডারপাস করা হয়েছে যার সংখ্যা এবং সাইজ কোনোটাই মানা হয়নি। একটা মাত্র ওভারপাস দেওয়া হয়েছে যার দৈর্ঘ্য এবং চওড়া আরও বড় হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। হাতি অত্যন্ত সতর্ক এবং বুদ্ধিমান প্রাণী, চলাচলের পথে কোনো বিপদ বা পরিবর্তন আঁচ করতে পারলে তারা পথ পরিবর্তন করে ফেলে। এ ক্ষেত্রে তাদের খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। রেলের উচ্চমাত্রার শব্দ শুনলে ওই পথে হাতি চলাচলে ভয় পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ‘উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় সরকারের এই রেললাইন একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বরাবরের মতো এবারেও তাদের স্বার্থপর উচ্চাকাঙ্ক্ষী আচরণ করেছেন যার কারণে এই মেগা প্রজেক্টটা প্রশ্নবিদ্ধ হলো। আমরা আশা করব, রেল চলাচল শুরু হওয়ার আগেই চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বন্যপ্রাণীদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করবেন।’

এদিকে, গত ২৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. হুমায়ুন কবীর চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে নির্মিত এলিফ্যান্ট ওভারপাস পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি জানিয়েছেন, প্রকৃতি ও পরিবেশ সবকিছু বিবেচনা করে এলিফ্যান্ট ওভারপাস নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফিজিক্যালি স্ট্যাডিতে ন্যাচারালি ওই জায়গা দিয়েই বন্যহাতি যাতায়াত করে। তাই তাদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে ওই স্থানে এলিফ্যান্ট ওভারপাস নির্মাণ করা হয়েছে। এশিয়ার কোনো দেশে বন্যপ্রাণীর জন্য এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এটিই রেলপথে প্রথম এলিফ্যান্ট ওভারপাস।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চ্যাম্পিয়ন দল পেল ২ কোটি ৭৫ লাখ? তানজিদ-শরিফুলরা পেলেন কত টাকা?

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে এনসিপির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা : রিজভী

অস্ত্রসহ ছাত্রলীগ নেতা উজ্জ্বল আটক

প্রতীক পাওয়ার ২ দিন মাঠ ছাড়লেন প্রার্থী, হতাশ কর্মী-সমর্থক 

সুযোগ পেলে যুবকদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়ব : জামায়াত আমির

চট্টগ্রাম বন্দরে আয়ের ইতিহাস, সেবায় জট

দুর্বৃত্তদের গুলিতে ‘লেদা পুতু’ নিহত

রাজধানীতে ভবন থেকে পড়ে ব্যাংক কর্মকর্তার মৃত্যু

জলবায়ু সংকট / আসছে মাথা ঘুরানো গরম, ভয়ংকর কিছু বাস্তবতা

স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে পদ হারালেন মাসুদ

১০

সর্বোচ্চ আয়ের রেকর্ড গড়ে ফুটবল দুনিয়াকে চমকে দেওয়া কে এই নারী ফুটবলার?

১১

আজ থেকে নতুন দামে স্বর্ণ বিক্রি শুরু, ভরি কত

১২

পলোগ্রাউন্ড ময়দানে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান / ‘স্মরণকালের সবচেয়ে বড়’ মহাসমাবেশ আয়োজনে প্রস্তুত চট্টগ্রাম

১৩

বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে নির্বাচনী প্রচার, এলাকায় চাঞ্চল্য

১৪

টিভিতে আজকের যত খেলা

১৫

মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সামরিক সম্পদ সরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

১৬

আজ যেমন থাকবে ঢাকার আবহাওয়া

১৭

যশোরে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিবেন ১২৯ কারাবন্দি

১৮

রাজধানীতে আজ কোথায় কী

১৯

তারেক রহমানের বরিশাল সফরের নতুন তারিখ ঘোষণা

২০
X