পাসপোর্ট-বোর্ডিং পাস ছাড়া বিমানে উঠে আলোচনায় আসা শিশু জোনায়েদ মোল্লা বাড়ি ফিরেই বাঁধা পড়ে শিকলে। বাড়ি ফেরার পর মঙ্গলবার সকালে পরিবারের সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় জুনায়েদ।
এরপর অনেক খোঁজাখুঁজি করে সন্ধান পেয়ে জুনায়েদকে ধরে এনে শিকলবন্দি করা হয়। পরে আজ শুক্রবার (১৫ সেপ্টেম্বর) এলাকার ব্যক্তিবর্গের অনুরোধে তাকে শিকল মুক্ত করা হয়। জোনায়েদ মোল্লার বিমানে চড়ার ইচ্ছা পূরণ করা হবে বলেও জানান এলাকাবাসী ও আত্মীয়-স্বজন।
এর আগেও কাউকে কোনো কিছু না বলে চলে যাওয়ায় ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখা হতো তাকে। ৪ দিন আগে দাদিকে মাদ্রাসায় যাওয়ার ওয়াদা করে বের হয়ে ঢাকায় গিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গেটের নিরাপত্তা কর্মীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে উঠে পড়ে বিমানে। এ নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
জানা যায়, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের পারইহাটি গ্রামের সবজি ব্যবসায়ী ইমরান মোল্লার প্রথম পক্ষের ছেলে জোনায়েদ মোল্লা (১০)। বেশ কয়েক বছর আগে মা অন্যত্র চলে যাবার পর সৎ মায়ের কাছে বড় হতে থাকে জোনায়েদ। ভর্তি করে দেওয়া হয় উপজেলার উজানী হাফিজিয়া মাদ্রাসায়। তবে বিভিন্ন সময় বাড়ির কাউকে না বলে বাইরে চলে যায় জোনায়েদ।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত এক সপ্তাহ আগে জোনায়েদ মোল্লা তালাবদ্ধ ঘর থেকে বের হয়েই প্রথমে ইজিবাইকে করে মুকসুদপুর থেকে বাসে উঠে চলে যায় ঢাকার সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডে। সেখান থেকে বসুন্ধরা হয়ে যায় এয়ারপোর্টে। পরে উপরে উঠতে গেলে বাধা পেয়ে অন্য পাশ দিয়ে ঘুরে সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠে জোনায়েদ। পরে এয়ারপোর্টের গেটের নিরাপত্তাকর্মীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে অন্যান্য যাত্রীদের সঙ্গে সোজা উঠে পড়ে কুয়েতগামী এয়ারওয়েজের (কেইউ-২৮৪) রাত ৩টা ১০ মিনিটের একটি ফ্লাইটে। প্রায় ১ ঘণ্টার মতো বিমানের সিটে বসে থাকার পর জুনায়েদ প্লেনের ভেতরে কোরিডোরে হাঁটাচলা করছিল। এ সময় কেবিন ক্রু জোনায়েদকে সিটে বসার পরামর্শ দেন। তখন শিশুটি একটি সিটে বসে পড়ে। একপর্যায়ে জুনায়েদ যে সিটে বসেছিল পাশের সিটের যাত্রী শিশুটিকে তার বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে বসতে বলে। কিন্তু শিশুটি তার বাবা-মায়ের বিষয়ে কোনোকিছু বলতে পারেনি।
এর আগেও বাড়ির কাউকে কিছু না বলে ঢাকা, মংলা, ফরিদপুর, বাড়বাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে চলে যায় বলে জানিয়েছে জোনায়েদের পরিবার।
জোনায়েদের বাবা ইমরান মোল্লা বলেন, জোনায়েদ চলে যাবার পর খোঁজাখুঁজি করা হয় বিভিন্ন স্থানে। পরে এয়ারপোর্ট থানা থেকে ফোন আসার পর জোনায়েদের খোঁজ পাই আমরা। পরে আমার ভাই (জোনায়েদের চাচা) ঘটনাস্থলে গিয়ে জুনায়েদকে পুলিশের কাছ থেকে বাড়িতে নিয়ে আসে। বাড়ি এসে সকালে পালিয়ে যায় জোনায়েদ। পরে খুঁজে বের করে পায়ে শিকল দিয়ে তালাবন্ধ করে ঘরের খুঁটির সঙ্গে আটকিয়ে রাখা হয়। পরে এলাকাবাসী ও আত্মীয়-স্বজনের অনুরোধে তাকে শিকল মুক্ত করা হয়
শিশুটির চাচা ইউসুফ মোল্লা বলেন, আমার ভাতিজা জোনায়েদ মোল্লা ছোটবেলা থেকে খুবই দুরন্ত। তাকে হাফেজিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়েছিল। সেখান থেকে সে বারবার পালিয়ে আসে বলে তাকে মাদ্রাসা থেকে এনে স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। শিশু জোনায়েদ বাড়ি থেকে মাঝে মধ্যে হারিয়ে যায় আবার একাই ফিরে আসে। গত এক সপ্তাহ আগে সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে আমরা তার খোঁজ পাই। সেখানে গিয়ে জানতে পারি, সে সেখান থেকেও পালিয়ে গেছে। বিমানে উঠে পড়ার ব্যাপারে আমরা কিছুই জানি না। বিমানবন্দর থানা থেকে আমাদের ফোন করা হলে তাকে বিমানবন্দর থানা থেকে নিয়ে আসি। বাড়িতে আনার পর সকালে আবারও অন্যত্র চলে গিয়েছিল জোনায়েদ। পরে তাকে খুঁজে এনে পায়ে শিকল দেওয়া হয়। পরে এলাকাবাসী ও আত্মীয়-স্বজনের অনুরোধ তাকে আজ শিকল মুক্ত করা হয়।
শিশু জোনায়েদ মোল্লার সঙ্গে কথা হলে সে বলে, আমি বিমানবন্দরের সব নিরাপত্তারক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিমানে উঠে পড়ি। আমি কোনো কিছু না বুঝেই শখের বসে বিমানে উঠে পড়ছিলাম। বিমানে ওঠার পর আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এজন্য বিমানের মধ্যে হাঁটাচলা করেছিলাম।
জোনায়েদ আরও বলে, আমার ইচ্ছা বিমানে চড়া। এর আগে কাছ থেকে কখনো বিমান দেখি নাই। ওইখানে (এয়ারপোর্ট) গিয়ে ভেতরে ঢোকার পর বিমান দেখতে পেয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিমানে উঠে পড়ি। এখন বিমান চড়তে পারলে মনের ইচ্ছা পূরণ হতো।
মন্তব্য করুন