ফরহাদ সুমন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

হত্যা মামলার আসামিকে রক্ত দিয়ে নজির সৃষ্টি করলেন এএসআই রাশেদ

চট্টগ্রামে হত্যা মামলার আসামিকে রক্ত দিয়ে নজির সৃষ্টি করলেন এএসআই রাশেদ। ছবি : কালবেলা
চট্টগ্রামে হত্যা মামলার আসামিকে রক্ত দিয়ে নজির সৃষ্টি করলেন এএসআই রাশেদ। ছবি : কালবেলা

মানবিক ও মানবতা হত্যা মামলার আসামির কাছে হার মেনেছে। নিজের থেকে হত্যা মামলার আসামিকে এক ব্যাগ রক্ত দিয়ে নজীর সৃষ্টি করেছেন পাহাড়তলী থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রাশেদুল ইসলাম রাশেদ। তার এমন উদারতায় সহকর্মীদের প্রশংসায় ভাসছেন রাশেদ। তার মহতি এ কাজ পুলিশ বাহিনীতে নজির হয়ে থাকবেন বলে মন্তব্য করেছেন রাশেদের সহকর্মীরা।

জানা গেছে, গার্মেন্টস কর্মী ফাতেমা আক্তার বৈশাখী ও তার চাচা মিজানুর রহমানকে ছুরিকাঘাত করে জয়নাল আবেদীন (২৫) নামে এক যুবক। এ সময় প্রতিবেশীরা তাকে আটক করে পুলিশকে খবর দিলে নিজেকেও ছুরিকাঘাত করে জয়নাল আবেদীন। পরে ঘটনাস্থল থেকে পাহাড়তলী থানা পুলিশ জয়নাল আবেদীনকে গ্রেপ্তার করে।

পুলিশ জানায়, জয়নাল আবেদীন বৃহস্পতিবার (০১ জানুয়ারি) রাতে পাহাড়তলী থানাধীন বশির শাহ মাজার সংলগ্ন সূচনা আবাসিক নিজাম সাহেবের ভাড়াঘর থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। সেদিন রাতে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ফাতেমা আক্তার বৈশাখী (২৯) তার সাবেক স্ত্রী। হত্যা মামলার আসামি হওয়ায় চমেক হাসপাতালে তাকে পাহারায় রেখেছেন পাহাড়তলী থানা পুলিশ।

পাহাড়তলী থানার সেকেন্ড অফিসার উপপরিদর্শক মাসুদুর রহমান জানান, শনিবার (০৪ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ক্যাজুয়েলিটি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন জয়নাল আবেদীন রক্ত সংকটে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন। প্রচুর রক্তক্ষরণে তার শরীরে রক্ত শূন্যতা দেখা দিয়েছে বলে পুলিশকে জানায় দায়িত্বরত চিকিৎসক। সেদিন পাহাড়তলী থানার সহকারী উপপরিদর্শক রাশেদুল ইসলাম রাশেদ চমেক হাসপাতালে জয়নাল আবেদীনের পাহারায় ছিলেন। উপায় না দেখে উপপরিদর্শক রাশেদ নিজেই (O পজেটিভ) রক্ত দেন এবং ব্লাড ব্যাংক থেকে আরেক ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে জয়নাল আবেদীনের শরীরে ঢুকানো হয়।

পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, জয়নাল আবেদীন গার্মেন্টস কর্মী । নোয়াখালী জেলার হাতিয়া থানার পূর্ব রহমতপুর ৬নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মৃত ইব্রাহীমের ছেলে। বিগত ছয় মাস আগে নিহত বৈশাখী আক্তারের সাথে তার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। দুজনই নগরের পাহাড়তলী এলাকায় থাকেন। বিবাহবিচ্ছেদের পর সম্প্রতি আবার বিয়ে করেন বৈশাখী। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জয়নাল বৈশাখীর বাসায় ঢুকে তাকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করেন।

এ সময় বৈশাখীর চাচা মিজানুর রহমান বাঁচাতে এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করে জখম করে জয়নাল। গুরুতর আহত অবস্থায় বৈশাখীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় বৈশাখের বাবা মোহাম্মদ আবুল বাশার পাহাড়তলী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

নিহত ফাতেমা আকতার বৈশাখী নগরের পাহাড়তলী থানাধীন সাগরিকাস্থ রেডিয়াম ডেনিম ইন্ডাস্ট্রিয়াল গার্মেন্টসের পোশাক শ্রমিক ছিলেন। তার বাড়ি নোয়াখালী জেলার কবিরহাট থানার সুন্দরপুর জাগিদার বাড়ি।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয় যে, দুই বছর আগে আমার মেয়ের বিবাদী জয়নাল আবেদীনের (২৫) সঙ্গে পারিবারিকভাবে ইসলামিক শরিয়াহ্ মোতাবেক ৬,০০,০০০/- (ছয় লাখ) টাকা দেনমোহর ধার্য করে ১,০০,০০০/- (এক লাখ) টাকা উসুল দিয়ে বিয়ে হয়। ২নং বিবাদী শাজেদা আক্তার (২০) আমার মেয়ের বান্ধবী। সেও একই গার্মেন্টসে চাকরি করে। সেই সুবাদে শাজেদার সঙ্গে জয়নাল আবেদীনের (২৫) পরিচয় হয়।

পরিচয়ের সূত্র ধরে তারা প্রেমে জড়িয়ে পড়ে এবং আমার মেয়েসহ আমাদের না জানিয়ে গোপনে বিয়ে করে। বিষয়টি আমার মেয়ে জানতে পেরে আমাদের জানায়। তারা বিয়ে করার পর থেকে জয়নাল আবেদীন ও শাজেদা আক্তার (২০) আমার মেয়ে ভিকটিম ফাতেমা আক্তার বৈশাখীকে (১৯) বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করে। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আমার মেয়ে ভিকটিম ফাতেমা আক্তার বৈশাখী জয়নাল আবেদীনের সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়।

পরে উভয় পরিবারের সম্মতিক্রমে গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর ফাতেমা আক্তার বৈশাখীর (১৯) সঙ্গে ডিভোর্স হয়। ডিভোর্সের পর আমার মেয়ে গার্মেন্টসে চাকরিরত অবস্থায় শাজেদা আক্তার (২০) আমার মেয়েকে মেরে ফেলবে বলে গালাগাল করে চট্টগ্রাম শহর ছেড়ে চলে যেতে বলে। না হলে তাকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।

পাহাড়তলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল আবছার বলেন, বৈশাখীকে ছুরিকাঘাতের সময় তাকে রক্ষার জন্য তার এক চাচা এগিয়ে আসেন। এ সময় চাচাকেও ছুরিকাঘাত করেন জয়নাল। আহত চাচাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সাবেক স্ত্রীকে ছুরিকাঘাতের পর লোকজন জয়নালকে ধরতে এলে ওই সময় তিনি নিজের পেট, বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাত করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। তিনিও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

পাহাড়তলী থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রাশেদুল ইসলাম রাশেদ বলেন, সেবাই পুলিশের ধর্ম। হত্যা মামলার আসামি রক্তশূন্যতায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জালড়ার সময় বিবেক ও মানবতার দৃষ্টিকোণ থেকে আমি নিজেই এক ব্যাগ রক্তদান করি। ব্লাড ব্যাংক থেকে আরও এক ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে আসামি জয়নাল আবেদীনের শরীরে প্রবেশ করাই। যা মানবিকতার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (পশ্চিম) আলমগীর হোসাইন কালবেলাকে বলেন, নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো কাজ। আমি নিজেও আমাদের ব্লাড ব্যাংকে রক্ত দিয়ে থাকি। পাশাপাশি আমাদের পুলিশ সদস্যদের রক্ত দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করি। এএসআই রাশেদ রক্ত দিয়ে মহতি কাজ করেছেন।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ায় আইসিসির ওপর ক্ষোভ ঝাড়লেন পাক কিংবদন্তি

লাগাতার বিতর্কে আলোচনার তুঙ্গে ডাকসু নেতা সর্বমিত্র

বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েও বিপত্তিতে পড়েছে স্কটল্যান্ড

চিনি ছাড়া কফি কি স্বাস্থ্যকর, জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ

গোপালগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ

চাকরি দিচ্ছে বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক

একদিকে গায়ে হাত, অন্যদিকে ফ্যামিলি কার্ড চলবে না : জামায়াত আমির

বাংলাদেশ ইস্যুতে পাকিস্তানের বিশ্বকাপ বর্জনের বিপক্ষে ওয়াসিম আকরাম

জবিতে এআই ও বিজনেস ইনকিউবেশন ফাইনাল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত

অক্সফোর্ডের গবেষণা / তাপমাত্রা নিয়ে বড় দুঃসংবাদ পেল বাংলাদেশ

১০

ইসরায়েলি হামলায় টিভি উপস্থাপক নিহত

১১

তিন রুটে ৭ ঘণ্টা ধরে বন্ধ ট্রেন চলাচল, শিডিউল বিপর্যয়ে ভোগান্তি

১২

সাদ্দামের মায়ের প্রশ্ন, ‘এই জামিন দিয়ে কী হবে’

১৩

ঢাবির বিজ্ঞান ইউনিটে ৯২ শতাংশ ফেল

১৪

বিশ্বকাপ ইস্যুতে পাকিস্তানের বড় সিদ্ধান্ত, শতকোটি টাকা ক্ষতির মুখে আইসিসি!

১৫

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ডাক পেতে পারে বাংলাদেশ!

১৬

তারেক রহমানের জনসভাস্থলে নিরাপত্তা জোরদার

১৭

দাম বৃদ্ধির পর আজ থেকে নতুন দামে স্বর্ণ বিক্রি শুরু

১৮

এবার নির্বাচনের জন্য টাকা চাইলেন জোনায়েদ সাকি

১৯

আপনি কি জাজমেন্টাল? জেনে নিন

২০
X