

ফুটবল উন্মাদনায় ভাসছে সিলেট। নগর থেকে গ্রাম সবখানেই এখন বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনা, প্রস্তুতি আর উৎসবের আমেজ। প্রিয় দলকে সমর্থন জানাতে বিভিন্ন দেশের পতাকা টাঙানো, জার্সি কেনা ও সাজসজ্জায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ফুটবলপ্রেমীরা।
বিশ্বকাপকে ঘিরে নগরের ক্রীড়াসামগ্রীর দোকানগুলোতেও বেড়েছে ক্রেতাদের ভিড়। দোকানের পাশাপাশি ফুটপাতেও বসেছে অস্থায়ী স্টল। এসব দোকানে বিভিন্ন দেশের জার্সি, পতাকা, ক্যাপ, বাঁশি ও ফুটবলসামগ্রী কিনতে ভিড় করছেন সমর্থকেরা। এছাড়া খেলার দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে সিলেট সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পয়েন্টে এলিডি মনিটরের মাধ্যমে খেলা দেখতে পারবেন সিলেট নগরের বান্দিারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, সিলেট নগরীর শাবি, সিকৃবি, এমসি কলেজ, পাঠানঠুলা, মদিনা মার্কেট, বাগবাড়ি, জিন্দাবাজার, জল্লারপাড়, মির্জাজাঙ্গাল, আম্বরখানা, সুবিদবাজার, শাহপরান, টিলাগড়, উপশহর, কুমারপাড়া, মীরাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার দেয়াল, বাসাবাড়ি ছাদ, বারান্দাসহ ও সড়কের দুই পাশে ঝুলছে নানা দেশের নানা রঙের পতাকা।
এছাড়া টিভির দোকানে নতুন টিভি কিনতে ও পুরাতন টিভি মেরামত করতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। এদিকে, শিক্ষার্থীদের উৎসবমুখর পরিবেশে ‘ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল-২০২৬’ উপভোগের জন্য ৬টি আবাসিক হলে বড়োপর্দায় খেলা দেখানোর উদ্যোগ নিচ্ছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) প্রশাসন।
ব্যবসায়ীরা কালবেলাকে জানান, বিশ্বকাপ সামনে রেখে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্রি বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি পর্তুগাল, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের জার্সিও ভালো বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করেজার্সির দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় জমেছে।
ফুটবলপ্রেমীরা জানান, বিশ্বকাপ শুধু খেলার আসর নয় এটি আমাদের কাছে উৎসব। প্রিয় দলকে সমর্থন জানাতে নানা আয়োজনের মাধ্যমে আমরা নিজেদের ভালোবাসা প্রকাশ করছি। খেলা শুরু হওয়ার আগে সিলেটজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বকাপ উন্মাদনা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, বিশ্বকাপৈ প্রিয় দলের খেলায় এ উন্মাদনা আরও বাড়বে। রাত জেগে খেলা দেখা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, বড় পর্দায় ম্যাচ উপভোগ এবং দলভিত্তিক নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে জমে উঠবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসব। নগরীর লামাবাজারে বাসিন্দা নাসিম হোসেন কালবেলাকে বলেন, বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিলকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা। ব্রাজিলের আক্রমণাত্মক ফুটবল সবসময় আমাকে মুগ্ধ করে। খেলা শুরু হওয়ার আগেই বাসার ছাদে ব্রাজিলের পতাকা টানিয়েছি। আশা করি এবারও দলটি ভালো কিছু উপহার দেবে।
আমবরখারার বাসিন্দা পড়শি কালবেলাকে বলেন, ছোটোবেলা থেকেই আর্জেন্টিনার সমর্থক আমি। বিশ্বকাপ এলেই অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে। এবারও মেসিদের উত্তরসূরিদের ভালো খেলার প্রত্যাশা করছি। প্রিয় দলের জার্সি ও পতাকা কিনে বিশ্বকাপ উপভোগের প্রস্তুতি নিয়েছি।
সুবিদবাজারের বাসিন্দা রাসেল আহমদ কালবেলাকে বলেন, বিশ্বকাপকে ঘিরে সিলেটে যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে তা সত্যিই দারুণ। পতাকা, জার্সি আর সমর্থকদের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হচ্ছে খেলা শুরু হওয়ার আগেই বিশ্বকাপ চলে এসেছে।
বাসদ সিলেট জেলার আহ্বায়ক আবু জাফর কালবেলাকে বলেন, কোটি কোটি মানুষের আবেগ ও স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা খেলাটির নাম ফুটবল। বিশ্বকাপ হলে এর প্রভাব সারা বিশ্বজুড়েই পড়ে, যা ইতোমধ্যে স্পষ্ট। তবে এবারের বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আয়োজন এবং তাদের কিছু বিধিনিষেধ, বিশেষ করে ইরানের খেলোয়াড়দের নিয়ে সিদ্ধান্ত ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। খেলাধুলা হওয়া উচিত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আনন্দের উৎসব।
তিনি বলেন, খেলাধুলার এই উৎসবে মানুষ আনন্দে মেতে উঠুক, তবে উন্মাদনা যেন নিয়ন্ত্রণে থাকে। আমি আনন্দময় ফুটবলের সমর্থক হিসেবে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করি এবং দলের জন্য শুভকামনা জানাই।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. খায়রুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, আমরা চাই শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি উৎসবমুখর পরিবেশে নিরাপদে এই ক্রীড়া উৎসব উপভোগ করুক। বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের মাঝে সব সময়ই অন্যরকম একটা আবেগ ও উদ্দীপনা কাজ করে। শিক্ষার্থীদের এই সুস্থ বিনোদন ও মানসিক রিফ্রেশমেন্টের কথা বিবেচনা করেই ৬টি আবাসিক হলে বড়োপর্দায় খেলা দেখানোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে রেজিস্ট্রারকে ইতোমধ্যে বলে দিয়েছি। আশা করি শিগগিরই ব্যবস্থা করা হবে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, বিসিবির পরিচালক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে সিলেট নগরবাসীর জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে এলইডি মনিটরের ব্যবস্থা করা হবে। এর মাধ্যমে ফুটবলপ্রেমীরা সারা রাত খেলা উপভোগ করতে পারবেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ফুটবলও ইতিবাচক ধারায় এগিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় দল যদি বর্তমান অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে পারে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আমরাও বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের স্বপ্ন দেখতে পারি।
নিজের পছন্দের দল সম্পর্কে আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, আমি ব্রাজিল দলের সমর্থক। এবারের বিশ্বকাপেও ব্রাজিল ভালো খেলবে এবং শিরোপা জিতে সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ করবে।
বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী। তিনি কালবেলাকে বলেন, প্রায় ২০ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। কিন্তু এখনো আমরা বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারিনি। কবে আমরা বিশ্বকাপে খেলতে পারব, কবে নিজেদের জাতীয় দলকে বিশ্বমঞ্চে সমর্থন করতে পারব সেই অপেক্ষায় আছি। আমরা চাই একদিন বাংলাদেশ দলকে নিয়েই বিশ্বকাপের উন্মাদনায় মাততে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে ঘিরে যে উন্মাদনা দেখা যায়, সেটি স্বাভাবিক। তবে আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের ফুটবলের উন্নয়ন। তৃণমূল পর্যায় থেকে খেলোয়াড় তৈরি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পুরো ফুটবল ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিয়ে যেতে হবে।
মিফতাহ সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে। আমরা আশা করি, খুব বেশি সময় লাগবে না। আগে এশিয়ার ফুটবলে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে হবে। এশিয়ান কাপে নিয়মিত অংশগ্রহণ ও ভালো ফল করার মধ্য দিয়ে একদিন বিশ্বকাপেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে।
নিজের পছন্দের দল সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি ব্রাজিলের সমর্থক। তবে বিশ্বকাপের সময় অন্য দেশের পতাকার পাশাপাশি যদি আমাদের জাতীয় পতাকাও সমানভাবে উড়ত, তাহলে বিষয়টি আরও গর্বের হতো। আমি ইতিবাচকভাবে দেখি যে, অনেকেই বিদেশি দলের পতাকার সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকাও প্রদর্শন করেন। এতে দেশের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটে। এছাড়া বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না থাকায় মানুষ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, জার্মানি কিংবা অন্যান্য দলকে সমর্থন করে। এটি ফুটবলপ্রেমীদের আবেগের বিষয়। তবে বিশ্বকাপকে সবাই বিনোদনের অংশ হিসেবেই দেখুক, সেটাই প্রত্যাশা।
ফুটবলপ্রেমীদের উদ্দেশে মিফতাহ সিদ্দিকী বলেন, আমরা খেলা দেখব, খেলা উপভোগ করব। কিন্তু খেলাকে কেন্দ্র করে এমন কোনো ঘটনা ঘটানো যাবে না, যা সমাজকে কলঙ্কিত করে। মারামারি, সংঘর্ষ কিংবা অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়ানো থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। খেলাকে খেলাই হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।