

চলতি অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট মধ্যপ্রাচ্যের কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের বাজেটের চেয়েও বড় বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী।
তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন ও জনকল্যাণে সরকার সময়োপযোগী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও প্রণীত এ বাজেটে ৪১ লাখ নারীকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে।
শুক্রবার (১২ জুন) সন্ধ্যায় সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত ২৪তম চারুকলা প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, দেশের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করেন এবং সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করেন। খুব অল্প সংখ্যক সহকর্মী নিয়ে তিনি চলাফেরা করেন ও তার গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যালে দাড়াচ্ছে। তিনি মানুষকে কাছে টেনে নিতে চান। এরকম প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের মানুষ চেয়েছিল, আমরা চেয়েছিলাম। এই প্রধানমন্ত্রীর পাশে আমাদেরকে থাকতে হবে। আমাদের বাংলাদেশকে বিজয়ী হতে হবে। মানুষ যেন বাংলাদেশকে সম্মানের চোখে দেখে সেই প্রয়াস চালাতে হবে। এবং এটাও স্বীকার করতে হবে সেই প্রচেষ্টা চলছে। আজ ৯ লক্ষ ৩৪ হাজার কোটি টাকার বাজেট জাতীয় সংসদে দেয়া হয়েছে। টাকার অংকে এটি মধ্যপ্রাচ্যের কাতার, কুয়েত, বাহরাইনের চেয়ে বড়ো বাজেট। বাংলাদেশকে এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে, যাকে বিশ্ব সম্মানের চোখে দেখবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এগিয়ে যাবে।
তিনি আরো বলেন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল প্রথাগত উৎসব-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এগুলোকে প্রকৃত অর্থে মেধা অন্বেষণ, সৃজনশীলতা বিকাশ এবং সুস্থ চিন্তার ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শুধু গান, নাচ বা আবৃত্তি নয়, দেশের ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির প্রকৃত প্রতিফলন ঘটাতে হবে এসব প্রতিষ্ঠানে।
শিল্পকলা একাডেমিকে আরও অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় অভিভাবক, শিশু-কিশোর এবং সংস্কৃতিকর্মীদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাণবন্ত করে তুলতে হবে।
ইতিহাসের উদাহরণ টেনে রাষ্ট্রদূত বলেন, মানব সভ্যতার সূচনা এবং ভাষা-সংস্কৃতির বিকাশে চিত্রকলার ভূমিকা অপরিসীম। মিশরীয় ও রোমান সভ্যতা থেকে শুরু করে ইউরোপীয় রেনেসাঁর লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ও মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর মতো শিল্পীদের সৃষ্টি আজও বিশ্বকে সমৃদ্ধ করছে।
সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি তরুণদের প্রশংসা করে বলেন, তোমরাই রাস্তায় আলপনা এঁকেছো, গ্রাফিতিতে দেশকে রাঙিয়েছ। তোমাদের শিল্পকর্মে যেমন প্রতিবাদ ছিল, তেমনি ছিল মানবিকতা ও সহমর্মিতার প্রকাশ। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, বর্তমান প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া তরুণ শিল্পীদের মধ্য থেকেই ভবিষ্যতে কেউ হয়তো বিশ্বের খ্যাতনামা লুভর মিউজিয়াম কিংবা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে নিজের শিল্পকর্মের স্থান করে নেবে।
অভিভাবকদের উদ্দেশে রাষ্ট্রদূত বলেন, সন্তানদের ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। কেউ আইন বা অর্থনীতি পড়তে চাইলে তাকে জোর করে ডাক্তার বা প্রকৌশলী বানানোর চেষ্টা করা ঠিক নয়। একইভাবে কেউ সংগীতে দক্ষ হলে তাকে চিত্রকলায় বা চিত্রকলায় আগ্রহী কাউকে সংগীতে বাধ্য করা উচিত নয়। শিশুদের মেধা ও আগ্রহ অনুযায়ী বিকাশের সুযোগ দিতে হবে।
তিনি বলেন, শিশুদের স্বাধীন ও সৃজনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও পরিবারের যৌথ দায়িত্ব। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সঠিক পথনির্দেশনা দেওয়া, তবে তাদের নিজস্ব ইচ্ছা ও স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া।
সরকারি স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণে উদাসীনতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশে অনেক সুন্দর স্থাপনা নির্মিত হলেও সেগুলোর যথাযথ পরিচর্যার অভাব রয়েছে। ব্যবহারকারীদেরও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে জনসাধারণের সম্পদ দীর্ঘদিন কার্যকর থাকে।
সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও প্রযুক্তি) মাসুদ রানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন) পদ্মসেন সিনহা, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সিলেট ইউনিটের ভাইস চেয়ারম্যান বদরুজ্জামান সেলিম, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী এবং যমুনা অয়েল পিএলসির সতন্ত্র পরিচালক কবি ও বাচিকশিল্পী সালেহ আহমদ খসরু। স্বাগত বক্তব্য দেন জেলা কালচারাল অফিসার আল মামুন বিন সালেহ। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির সদস্য সচিব ও মদন মোহন সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ফরিদ আহমদ, সিলেট জেলা জাসাসের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ নিজাম উদ্দিন তরফদার এবং সদস্য সচিব রায়হান এইচ খান।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে শিশু ও সাধারণ বিভাগে দুইজন শিল্পীকে ‘প্রদর্শনী শ্রেষ্ঠ পুরস্কার’ প্রদান করা হয়। এছাড়া উভয় বিভাগে চারজন করে মোট আটজন শিল্পীকে সনদ ও ক্রেস্ট দেওয়া হয়। পরে রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী আনুষ্ঠানিকভাবে ২৪তম চারুকলা প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। এবারের প্রদর্শনীতে জেলা শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগের ৭৮ জন শিক্ষার্থীর আঁকা ১১৩টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। আগামী ১৬ জুন পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। আলোচনা ও পুরস্কার বিতরণ শেষে শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।