সিলেট ব্যুরো
প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৪, ১০:৩৫ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

বন্যায় ঈদ আসেনি সিলেটের নিম্নাঞ্চলে

সুরমা নদীর ডাউক ভেঙে লোকালয়ে ঢুকছে বন্যার পানি। ছবি : কালবেলা
সুরমা নদীর ডাউক ভেঙে লোকালয়ে ঢুকছে বন্যার পানি। ছবি : কালবেলা

টানা বৃষ্টি আর ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা উজানের পানিতে সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। একইসঙ্গে নদ-নদীর পানিও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে অতিক্রম করছে। এদিকে বন্যার কারণে সিলেটে এবার ৫ হাজারের অধিক পশু কোরবানি হয়নি। পশু ক্রয় করে বন্যার কারণে কোরবানি না দিতে পারায় অনেকেই মাদ্রাসা ও এতিমখানায় পশু দান করেছেন আবার অনেকেই কোরবানি না দিয়ে পশু নিয়ে উঠেছেন আশ্রয়কেন্দ্রে।

সিলেট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কৃষিবিদ মিজানুর রহমান মিয়া কালবেলাকে বলেন, এবারের কোরবানি ঈদে সিলেটে ১ লাখ ৮০ হাজার গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল। কোরবানি হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯০৬টি। বন্যার কারণে অনেকেই কোরবানি দিতে পারেনি বলে তিনি জানান।

এবার কতজন কোরবানি দিয়েছে এবং অন্যরা কী কারণে কোরবানি দিতে পারেনি এ বিষয়ে তিনি বলেন, সে হিসাবে আমাদের কাছে এখন নেই। তবে তিনি বলেন, গতবার ১ লাখ ৫০ হাজার পশু কোরবানি হলে এবার পশু কোরবানি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার।

এদিকে, সিলেটের সীমান্তর্বী জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাটসহ অন্যান্য উপজেলা বন্যায় প্লাবিত মানুষ ঈদ করছেন আশ্রয়কেন্দ্রে সিলেটের জৈন্তাপুরে ভারি বৃষ্টিপাতে ফের, বড় সারী ও করিচ নদীর পানি বেড়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত করেছে। সোমবার (১৭ জুন) পবিত্র ঈদুল আজহার নামাজ কোনো ঈদগাহে পড়তে পারেনি এসব উপজেলার মানুষ। এ ছাড়া অনেকেই কোরবানিও দিতে পারেননি। বিকেলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কোরবানির মাংস এবং ওনার নিজ বাংলোতে রান্না করা খাবার বিতরণ করে বানবাসী মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেন। এসময় দেখা যায় অধিকাংশ মানুষ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে পরিবার পরিজন নিয়ে ঈদ করছেন। রোববার ও সোমবার সারা রাতের বৃষ্টিপাতের কারণে মঙ্গলবার ২টায় সারী নদীর পানি বিপৎসীমার ১২.৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে করিচ ও কাপনা নদীর পানি অতিরিক্ত মাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানায় পানি উন্নয়ন বোর্ড জৈন্তাপুর। এ ছাড়া সোমবার থেকেই প্লাবিত আছে উপজেলার প্রায় অর্ধেকেরও বেশি গ্রাম। ভোগান্তিতে আছে হাজার হাজার মানুষ। সারি, করিচ, বড়গাং, ও কাপনা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় উপজেলার ৬ ইউনিয়নে বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়ে মানুষের ঘর বাড়িসহ ভেসে গেছে হাজারও মৎস্যচাষির স্বপ্ন। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক, কমিউনিটি ক্লিনিক, স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদসহ অসংখ্য ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এসব উপজেলার বাসিন্দারা। দুই উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রামের বসতভিটায় পানি আসায় মানুষ দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। বাড়ি-ঘরে পানি প্রবেশ করায় জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পানিতে ভেজা বোরো ধান এ ছাড়া আমন ধানের বীজতলা ও শতাধিক মৎস্য খামার পানিতে তলিয়ে গেছে।

জানা গেছে, পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। গৃহপালিত পশুপাখি নিয়েও তারা পড়েছে বিপদে। বন্যায় কারো ঘরে পানি, কারো দুয়ারে। বন্যাকবলিত এসব মানুষ আশ্রয় নিয়েছে উঁচু স্থানে ও অন্যের বাড়িতে। কেউ টং পেতে পরিবার নিয়ে নানা কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় তাদের ভোগান্তির শেষ নেই। অনেকের রাত দিন কাটাতে হচ্ছে নৌকায়। পানি কমার অপেক্ষায় বন্যাকবলিত মানুষ। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষগুলোর কষ্টের শেষ নেই। তিনবেলা খেতেও পারছেন না অনেকেই।

সরেজমিনে বন্যাকবলিত এলাকা উপজেলা দরবস্ত ইউনিয়নের মহাইল, মুটগুঞ্জা, সেনগ্রাম, গর্দনা, ফরফরা, শুকইনপুর, রনিফৌদ, সাতারখাই। ফতেপুর ইউনিয়নের হেমু ভাটপাড়া, মাঝপাড়া, দত্তপাড়া, বালিপাড়া, নয়াগ্রাম, নয়াগ্রাম দক্ষিণ, ভেলোপাড়া, হরিপুর। জৈন্তাপুর ইউনিয়নের মুক্তাপুর, বিরাইমারা, বিরাইমারা হাওর, লামনীগ্রাম, কাটাখাল, খারুবিল, চাতলারপাড়, ডুলটিরপাড়, ১ নম্বর লক্ষ্মীপুর, ২ নম্বর লক্ষ্মীপুর, আমবাড়ি, ঝিঙ্গাবাড়ি, নলজুরী হাওর। নিজপাট ইউনিয়নের মেঘলী, বন্দরহাটি, লামাপাড়া, ময়নাহাটি, জাঙ্গালহাটি, মজুমদার পাড়া, হর্নি, বাইরাখেল, গোয়াবাড়ি, তিলকৈপাড়া, বড়খেল, ফুলবাড়ি, ডিবির হাওর, ঘিলাতৈল, হেলিরাই। ৩ নম্বর চারিকাটা ইউনিয়নের বালিদাঁড়া, লালাখাল, রামপ্রসাদ, থুবাং, বাউরভাগ উত্তর, বাউরভাগ দক্ষিণ, পুঞ্জিসহ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তাদের চলাচলের একমাত্র বাহন নৌকা। বন্যায় কবলিত যারা দিনমজুর তাদের কষ্টের শেষ নেই। তিনবেলা তিন মুঠো খাবার যোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ওইসব পরিবারের। অনেকেই রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। বন্যায় প্লাবিত হওয়া এলাকার শিশু-কিশোরদের নিয়েও অনেক কষ্টে রয়েছে তাদের পরিবার।

হেমু ভাটপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্বাস উদ্দিন বলেন, আমার ঘরসহ আশপাশের আরও কয়েকটি এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। আমার ঘরের ভেতরে কোমর পানি। যা ছিল সব নষ্ট হয়ে গেছে। এখনো আরও পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, খুব দুশ্চিন্তায় আছি। ঘরের সব ফেলে রেখে উপরের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। এখানে রান্না-বান্না সহ নানা সমস্যায় চরম ভোগান্তিতে রয়েছি। গরু-ছাগলসহ গৃহপালিত পশুপাখি নিয়ে রয়েছি মহাবিপদে।

আবহাওয়ার একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ নয়, ভারতের মেঘালয় রাজ্যে বৃষ্টিপাত কমলে জৈন্তাপুরের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে। তা নাহলে এই বন্যা ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিবেশবিদ কবি জোয়াহিদ আহমেদ বলেন, আমার ইউনিয়ন ফতেপুরসহ সিলেটের প্রায় এলাকায় পাহাড় খেকো চক্র টিলা কেটে নদী নালা খাল বিল ভরাট করে দোকানপাট তৈরি করছে এতে করে নদী তার নাব্যতা হারাচ্ছে, যার কারণে এই বন্যা সৃষ্টি হয়েছে। আরেকটি কারণ হাওরের বুক চিরে মিঠামইন অষ্টগ্রাম সড়ক হওয়ায় সিলেটের নদ-নদীর পানি দ্রুত যেতে পারছে না, যার কারণে সিলেটে ঘন ঘন বন্যা সৃষ্টি হচ্ছে।

জৈন্তাপুর উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. হাসান পারভেজ রিয়াদ বলেন, সারি নদীর পানি বিপৎসীমার ১২.৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পাহাড়ে বৃষ্টি থেমে গেলে পানি নিচের দিকে প্রবাহিত হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে সালিক রুমাইয়া বলেন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। আমরা ইতোপূর্বে পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার করছি। উপজেলায় এ পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হয়েছে মোট ৪৮টি। মানুষের মাঝে ত্রাণ ও শুকনো খাবার বিতরণ করেছি। একইসঙ্গে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটও বিতরণ করা হচ্ছে। আমরা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পানিবন্দি মানুষের সহায়তায় সার্বক্ষণিক কাজ করতে প্রস্তুত আছি।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে পাল্টা আঘাতের হুঁশিয়ারি ইরানের

বাংলাদেশে এখন বিনিয়োগের উপযুক্ত সময়: ইতালির রাষ্ট্রদূত

চরমোনাই পীর / যুক্তরাষ্ট্রকে ‘পরীক্ষিত বন্ধু’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ‘প্রয়াস’ চালানো হচ্ছে 

সিলেটে নতুন ডিসি নিয়োগ

জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় সব সংস্থার সমন্বয় জোরদারের নির্দেশ চসিক মেয়র শাহাদাতের

বিদ্যুতের বদলে জনগণের হাতে হারিকেন ধরিয়েছে বিএনপি: হাসনাত আব্দুল্লাহ

সংবিধান সংশোধনীতে মুখ্য বিবেচ্য থাকবে জুলাই সনদ: আইনমন্ত্রী

জার্মানিতে তীব্র তাপপ্রবাহে ৫ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু

চীনের জুতা কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, নিহত অন্তত ২৮ 

হাসনাতের উপস্থিতিতে এনসিপির পদযাত্রায় হাতাহাতি

১০

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পুরস্কার পেল জাবির প্রাণিবিদ্যা বিভাগ

১১

ফ্রান্স নাকি মরক্কো? / এআই জানাল, আজ রাতে বাড়ি ফিরছে কারা

১২

আনচেলত্তিকে বরখাস্ত করতে বললেন ব্রাজিল কিংবদন্তি

১৩

কান্নার শব্দ পেয়ে জঙ্গলে গিয়ে মিলল ফুটফুটে নবজাতক

১৪

৮ কোটি টাকা বিতরণে ৫৩ কোটি ব্যয় / অন্তর্বর্তী সরকারের সেই বিতর্কিত প্রকল্প বাতিল 

১৫

মিরসরাইয়ে সব পাহাড়ি ঝরনায় পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ

১৬

চবিতে দুপুরের খাবারে মিলল নারীর ছবিযুক্ত স্টিকার

১৭

টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড়ধসে প্রাণহানি ৩০

১৮

সারজিস আলম / কর্মসংস্থান না হলে বেকারদের হাত ধরেই হবে আরেকটি গণঅভ্যুত্থান

১৯

সাতক্ষীরায় ফেনসিডিলসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

২০
X