

জীবনের বাস্তবতায় মৃত্যু যেমন অনিবার্য, ঠিক তেমনি সম্পর্কের জগতে বিচ্ছেদও এক নির্মম বাস্তবতা। তবু এই বিচ্ছেদ যখন নিজের জীবনে এসে দাঁড়ায়, তখন পুরো পৃথিবীটাই যেন হঠাৎ থমকে যায়। প্রতিদিনের পরিচিত মানুষটি—যার সঙ্গে সকাল শুরু হতো, যার কণ্ঠে রাত শেষ হতো, হঠাৎ করে একদিন সে আর থাকে না। সেই শূন্যতা শুধু সম্পর্ক ভাঙার নয়, নিজের জীবনের একটা বড় অংশ হারানোরও।
বিচ্ছেদের যন্ত্রণা এমন এক ব্যথা, যা চিৎকার করে নয়; নীরবে, ধীরে ধীরে মনটাকে কুরে কুরে খায়। কেউ সেই কষ্ট ভুলতে ডুবে যান বইয়ের পাতায়, কেউ গানের সুরে খুঁজেন স্বস্তি। কেউ আবার নিজেকে ব্যস্ত রাখেন কাজের ভিড়ে, যেন ভাবার সময় না থাকে। কিন্তু সত্যি বলতে, এসব কিছুই সাময়িক। তাতে যে পুরোপুরি যন্ত্রণামুক্তি হয়, তা বলা যায় না। কিছু কষ্ট থাকে, যা মানুষ আজীবন মনের গভীরে যত্ন করে লালন করে।
তবু আশপাশে তাকালেই দেখা যায়, কেউ তুলনামূলকভাবে সহজেই বিচ্ছেদের যন্ত্রণা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান, আবার কেউ দীর্ঘ সময় ধরে সেই ব্যথা বয়ে বেড়ান। প্রশ্ন একটাই, একজন মানুষকে ভুলে নতুন করে এগিয়ে যেতে আসলে কতটা সময় লাগে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রত্যেক মানুষের জন্যই একটি নির্দিষ্ট সময় প্রয়োজন হয়। তার আগে কোনোভাবেই পুরোপুরি পিছু ছাড়ে না বিচ্ছেদের কষ্ট।
বিচ্ছেদ মানে শুধু একজন মানুষকে হারানো নয়
চিকিৎসকদের মতে, বিচ্ছেদ মানে কেবল একজন মানুষ জীবন থেকে সরে যাওয়া নয়। ছোট্ট এই শব্দের ভেতর লুকিয়ে থাকে বিশাল এক পরিবর্তন। একটি বিচ্ছেদ পুরো জীবনটাকেই নতুন করে সাজাতে বাধ্য করে—প্রতিদিনের অভ্যাস, রুটিন, এমনকি ভাবনার ধরনও বদলে যায়।
যার সঙ্গে প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতের বিছানায় যাওয়া পর্যন্ত কথা হতো, হঠাৎ করে সে নেই; এই বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া ভীষণ কষ্টের। এক লহমায় বদলে যায় চারপাশ। যদিও সময়ের নিয়মে বদলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক, কিন্তু সেই পরিবর্তনকে মেনে নেওয়া সহজ হয় না কারও পক্ষেই।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, বিচ্ছেদ মানে দৈনন্দিন রুটিন ভেঙে যাওয়া, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা স্বপ্নগুলোর চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাওয়া। আর এই ভাঙন থেকেই জন্ম নেয় গভীর মানসিক যন্ত্রণা।
কেন কারও বেশি, কারও কম সময় লাগে?
বিচ্ছেদের যন্ত্রণা ভুলতে একেক জন একেক রকম সময় নেন। কেউ কয়েক মাসের মধ্যেই নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নিতে পারেন। আবার কেউ বছরের পর বছর প্রাক্তনের স্মৃতির হাতছানি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না।
এক্ষেত্রে বিচ্ছেদের পেছনের কারণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব, ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা অপূর্ণ স্বপ্ন; এসবই সামনে এগোনোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই যারা বিচ্ছেদ মেনে নিতে পারেন না, তারা নিজেদের চেয়ে সঙ্গীকে বেশি ভালোবেসেছেন।
তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। যে সম্পর্ক কোনো ক্লোজার ছাড়াই শেষ হয়ে যায়—অর্থাৎ যেখানে অনেক কথা, অনেক প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে যায়; সেখান থেকে বেরিয়ে আসা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি কষ্টের।
সময় কি সব ঠিক করে দেয়?
বিশেষজ্ঞরা একবাক্যে স্বীকার করছেন, সময় নিজের নিয়মেই সবকিছু সহজ করে দেয়। কারও ক্ষেত্রে সেই সময় কম লাগে, কারও ক্ষেত্রে বেশি। কিন্তু একটা সময়ের পর প্রাক্তনের স্মৃতি ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়, জীবন এগিয়ে যায় নিজের গতিতে।
তবু সত্যিটা হলো, মনের এক কোণে প্রাক্তনের অস্তিত্ব থেকে যায় আজীবন। কোনো এক মেঘলা বিকেলে, কোনো মন খারাপের রাতে হঠাৎ করেই তারা উঁকি দেন স্মৃতির জানালায়। সেটাই হয়তো বিচ্ছেদের সবচেয়ে মানবিক দিক; ভুলে যাওয়া নয়, বরং নিয়ে বেঁচে থাকা।
সূত্র : সংবাদ প্রতিদিন
মন্তব্য করুন