কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৭:১০ পিএম
আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৭:১১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর সেদিন কী ঘটেছিল?

সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান
সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকে।

ঘটনার আগের দিন, অর্থাৎ ১৯৮১ সালের ২৯ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুই দিনের সফরে চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন। তার সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল নিজের প্রতিষ্ঠা করা রাজনৈতিক দল বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মধ্যকার বিরোধ নিরসন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমদিন নেতাকর্মীদের সঙ্গে একের পর এক বৈঠক শেষে মধ্যরাতে ঘুমাতে যান তিনি। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেনাবাহিনীর একটি দল তার উপর গুলি চালায় এবং তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ঘটনার পর ৩০ মে সকালে রেডিওতে প্রথমবারের মতো জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর খবর ঘোষণা করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টা পরেই জিয়াউর রহমানের মরদেহ গোপনে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা রাঙ্গুনিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই একটি পাহাড়ের পাদদেশে জিয়াউর রহমানকে কবর দেওয়া হয় বলে তখনকার একাধিক পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে ১৯৮১ সালের দোসরা জুনে দৈনিক সংবাদের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩০ মে সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে সেনাবাহিনীর একটি দল চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে আসে।

তারা নিহত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ অন্তত তিনজনের মৃতদেহ গাড়িতে তুলে ‘অজ্ঞাত’ স্থানে নিয়ে যায়। ঘটনার পর ৩০ মে সকালে সার্কিট হাউজে গিয়েছিলেন সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর রেজাউল করিম রেজা।

কয়েক বছর আগে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে রেজাউল বলেন যে, তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে সার্কিট হাউজে পাঠানো হয়েছিল, সেখানে আগে থেকে অবস্থান নিয়ে থাকা সৈন্যদের নিরাপদে সরিয়ে নেবার জন্য।

‘কর্নেল মতিউর রহমান আমাকে ডাকেন। ডেকে বলেন যে জিয়াউর রহমান ডেডবডিটা কিছু ট্রুপস সাথে নিয়ে সার্কিট হাউজ থেকে নিয়ে পাহাড়ের ভেতরে কোথাও কবর দেবার জন্য। আমি তখন তাকে বললাম যে আমাকে অন্য কাজ দেন। তারপর উনি মেজর শওকত আলীকে ডেকে ওই দায়িত্ব দিলেন।’

বেশ কয়েকজন সেনা সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে মেজর শওকত আলীই এরপর জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে দাফন করেন বলে জানান তিনি।

তখনকার পত্র-পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে যে, অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে সকাল সাতটায় সংবাদ সম্প্রচার শুরু হয়। কিন্তু মাত্র তিন মিনিট চলার পর হঠাৎ-ই সংবাদ পাঠ বন্ধ হয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর চট্টগ্রাম সেনানিবাসের তৎকালীন জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের বরাত দিয়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নিহত হওয়ার খবর প্রচার করা হয়।

এই খবর প্রচারের আগ পর্যন্ত চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ এবং স্থানীয় প্রশাসনের বেশিরভাগ কর্মকর্তারা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে কিছু জানতেন না বলেও তৎকালীন পত্র-পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে।

রেডিওতে ঘোষণা দেওয়ার পর জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর খবর দ্রুতই চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এক বিবৃতিতে তৎকালীন সরকার জানায় যে, ‘বিপ্লবী পরিষদ’ পরিচয় দেওয়া কিছু সেনা সদস্য রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করেছে।

এমন পরিস্থিতিতে তৎকালীন উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্য এবং বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে কয়েক দফায় বৈঠক করেন আবদুস সাত্তার।

বৈঠকে তিন বাহিনীর প্রধানসহ সবাই অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন বলে তখনকার গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। এরপর ৩০ মে দুপুরে রেডিও এবং টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছিলেন আবদুস সাত্তার।

ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি গভীর বেদনা ও দুঃখ ভরে জানাচ্ছি যে, আমাদের প্রিয় নেতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আজ (৩০শে মে, শুক্রবার) সকালে চট্টগ্রামে দুষ্কৃতকারীদের হাতে নিহত হয়েছেন।’

এর পরের লাইনেই তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সংবিধানের ৫৫ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদে অধিষ্ঠিত হয়েছি।’

দেশে তখনকার পরিস্থিতিকে ‘দুর্যোগময়’ উল্লেখ করে ধৈর্য্য ও সংহতি বজায় রাখার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান আবদুস সাত্তার। একই সঙ্গে, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার লক্ষ্যে সরকারকে সব ধরনের সহায়তা করারও আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানানো হয় যেন তারা আগের মতোই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেন।

নিজের ভাষণে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট এটাও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যদেশের যত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চুক্তি রয়েছে, সেগুলো স্বাভাবিক নিয়মেই কার্যকর থাকবে। রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে ৪০ দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করার মাধ্যমে আবদুস সাত্তার তার ভাষণ শেষ করেন।

ক্ষমতা গ্রহণের পর ৩০ মে থেকে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক একটি বিবৃতিও প্রকাশ করা হয়।

সেখানে বলা হয় যে, রাষ্ট্রপতিকে হত্যার ঘটনায় জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করে সরকার। ফলে পরিস্থিতি বিবেচনায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দেশের কোথাও সভাসমাবেশ, গণ-জমায়েত ও মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়। তবে জরুরি অবস্থা ঘোষণার ফলে সংবিধান বা সংসদ বাতিল হবে না বলে বিবৃতিতে জানায় সরকার। সঙ্গে এটাও জানানো হয়, দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ামাত্রই জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া হবে।

জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার পর চট্টগ্রাম শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয় অভ্যুত্থানকারীরা। জারি করা হয় সান্ধ্য আইন। ৩০ মে থেকে পরবর্তী দু’দিন রাস্তায় রাস্তায় অভ্যুত্থানের পক্ষে থাকা সেনা সদস্যদের টহলও দেখা গেছে বলে তখনকার পত্র-পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে।

খবরে আরও বলা হয়েছে, ওইদিন সকাল ৯টার পর ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। অন্যদিকে, অভ্যুত্থানকারীরা অবস্থান নেওয়ায় সড়ক ও আকাশপথেও যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে চট্টগ্রাম পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

কালবেলা
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আজকের নামাজের সময়সূচি

শুক্রবার রাজধানীর যেসব এলাকায় মার্কেট বন্ধ

ভারতের বান্দা / পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণ শহরে জীবন কেমন

শৌচাগারে সিগারেট ধরানোর সময় বিস্ফোরণ, কলেজছাত্রের মৃত্যু

ভেড়ামারায় সাপের কামড়ে স্বামীর মৃত্যুতে পাগলপ্রায় অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী

থানায় সেবা নিতে এসে কেউ যেন কষ্ট না পায়: আইজিপি

মাইক্রোবাসে আগুন, প্রাণে বাঁচলেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের সংবাদকর্মীরা

তিন ঘণ্টার ব্যবধানে ময়মনসিংহে আবারও ট্রেন লাইনচ্যুত

চট্টগ্রাম বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত

২৫টি এয়ারক্রাফট দিয়ে ২০টি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স

১০

প্রথম ফিউচারনেশন ফিল্ম ফেস্ট ২০২৬ 

১১

শিক্ষক সংকটে মান হারাচ্ছে তারাগঞ্জ ওয়াকফ এস্টেট সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়

১২

সুরে সুরে মোহাম্মদ রফিকে স্মরণ

১৩

আমরা যুদ্ধকে স্বাগত জানাইনি এবং কখনোই জানাব না: ইরানের স্পিকার

১৪

সকালের মধ্যে ঝড় হতে পারে যেসব অঞ্চলে

১৫

যারা মনে করেন ইরানের সঙ্গে আলোচনা সম্ভব নয়, তাদের এমন অবস্থানে হতাশ ভান্স

১৬

বন্দর আব্বাসে নতুন করে মার্কিন হামলা, দাবি সেন্টকমের

১৭

ফাইনালে কি নিষিদ্ধ হতে পারেন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা, ফিফার নিয়ম কী বলছে?

১৮

বদিউর রহমান আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান, নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান সেলিম রহমান

১৯

মৌলভীবাজারে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত

২০
X