অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬, ০১:২৯ পিএম
আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

উচ্চশিক্ষার সংকট উত্তরণে ‘নলেজ ইন্ডাস্ট্রি’র স্বীকৃতি অপরিহার্য

অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ।
অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ।

নদীর তীরে বটতলায় কিংবা বৈদ্যনাথের মন্দিরে বসে পণ্ডিতদের নিঃস্বার্থ জ্ঞান বিতরণের যুগটি এখন সুদূর অতীত। আধুনিক শিল্পায়ন ও বিশ্বায়িত মুক্তবাজার অর্থনীতিতে জ্ঞান কোনো বিমূর্ত ধারণা বা চ্যারিটি নয়; এটি এখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান অর্থনৈতিক পুঁজি বা পরিষেবা। বর্তমান যুগে শিক্ষার্থীরা শুধু তাত্ত্বিক বুলি মুখস্থ করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় না, বরং নিজেদের দক্ষতাভিত্তিক মানবসম্পদ হিসেবে গড়ার মাধ্যমে বেকারত্বের অভিশাপ ঘোচাতে চায়। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে অলাভজনক খাত বা প্রথাগত সমাজসেবার ফ্রেমে বন্দি করে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। উচ্চশিক্ষাকে এখন একটি পূর্ণাঙ্গ ‘নলেজ ইন্ডাস্ট্রি’ (Knowledge Industry) হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া অপরিহার্য।

সম্প্রতি জাতীয় বাজেট পর্যালোচনামূলক বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির (এপিইউবি) এক মতবিনিময় সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অত্যন্ত বাস্তবসম্মত একটি দার্শনিক অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়কর ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার মাধ্যমে মূলত তিনি শিক্ষায় বেসরকারি খাতের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে এই কর পুরোপুরি প্রত্যাহারেরও একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন। মন্ত্রীর এই মুক্তবাজার অর্থনীতির স্পিরিট আমাদের একাডেমিয়াকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় উন্নীত করতে বড় ধরনের প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে।

কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠের বাস্তবতা হলো—দেশে তিন দশকের বেশি সময় ধরে নিজস্ব অর্থায়নে গড়ে ওঠা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো মারাত্মক কাঠামোগত ও আমলাতান্ত্রিক বৈষম্যের শিকার। ওই মতবিনিময় সভায় এপিইউবি চেয়ারম্যান মো. সবুর খান একটি রূঢ় সত্য তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা নিজস্ব ক্যাম্পাস তৈরির জন্য জমি ক্রয় করি, বিভিন্ন ভবন বানাই; কিন্তু আমরা কোনো ব্যাংক ঋণ পাই না।’ একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আমি মনে করি, এই একটি বাক্যের ভেতরেই আমাদের উচ্চশিক্ষা খাতের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক সংকটটি বিদ্যমান।

এই সংকটের মূল কারণ হলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অপরিপক্ব আইনি কাঠামো। এগুলো পরিচালিত হয় ২০১০ সালের আমলাতান্ত্রিক ট্রাস্ট আইনের অধীনে, যার মূল কথাই হলো এটি একটি ‘অলাভজনক’ বা নন-প্রফিট খাত। এখানেই সবচেয়ে বড় নীতিগত স্ববিরোধিতা তৈরি হয়েছে। একজন উদ্যোক্তা বা বিনিয়োগকারী যখন শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবেন, তখন তাকে আইনি মারপ্যাঁচে বাঁধা যাবে না। কারণ, কোনো চ্যারিটি বা দানশীলতার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বমানের গবেষণাগার, আধুনিক ল্যাব, টেকসই লাইব্রেরি বা ইনোভেশন সেন্টার গড়ে ওঠে না। তাছাড়া, ব্যাংকগুলো ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত অলাভজনক প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয় না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাধ্য হয়ে কেবল শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই সীমিত আয়ে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক নিয়োগ, তাদের বিশ্বমানের বেতন প্রদান কিংবা গবেষণায় বড় তহবিল জোগান দেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। আর বিশ্বমানের অবকাঠামো ও বিনিয়োগ ছাড়া ছাত্রদের বিশ্বমানের শিক্ষা দেওয়াও সম্ভব নয়। অথচ বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করবেন, আর তার পুরো নিয়ন্ত্রণ থাকবে আমলাতন্ত্রের হাতে—মুক্তবাজার অর্থনীতিতে এমন অযৌক্তিক নিয়মের কোনো স্থান থাকতে পারে না। শিক্ষায় যদি সত্যিকারের উদ্ভাবন আনতে হয়, তবে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ অপরিহার্য। আর এই বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হলে অতীতের সেকেলে ট্রাস্ট আইন থেকে বেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শেয়ার মার্কেটে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। শিক্ষাকে যদি আমরা ‘নলেজ ইন্ডাস্ট্রি’ হিসেবে ঘোষণা করি, তবে এখানে বিলিয়ন ডলারের দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসা সময়ের ব্যাপার মাত্র। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা রুদ্ধ করে রাখার সুযোগ নেই। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী যদি ১০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে এখানে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় করতে চান, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণ করতে চান, তবে আমরা কেন সেই পথ বন্ধ করে রাখব? বিনিয়োগ এলে বিনিয়োগকারী তার রিটার্ন চাইবেন, আর সেই রিটার্ন নিশ্চিত করার প্রতিযোগিতাতেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার গতি বাড়বে এবং শিক্ষার মান বহুগুণ উন্নত হবে। বিশ্বমানের ছাত্র ও শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি হবে ।

আর্থিক ও কাঠামোগত এই বৈষম্যের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চরম একাডেমিক বৈষম্যেরও শিকার হচ্ছে। ওই একই মতবিনিময় সভায় ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেছেন, তারা সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদা করে দেখেন না। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শত শত ফুলব্রাইট স্কলার, পিএইচডিধারী শিক্ষক ও বিদেশি ফ্যাকাল্টি পড়াচ্ছেন। অথচ তাদের পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়ার কোনো আইনি অনুমতি নেই! অন্যদিকে, সদ্য প্রতিষ্ঠিত এমন অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে যেখানে হয়তো পিএইচডিধারী শিক্ষক হাতেগোনা, ক্লাসরুমের সংকট চরমে; তবুও শুধু ‘পাবলিক’ তকমার কারণে তারা অনায়াসেই পিএইচডি ডিগ্রি দিচ্ছে। যোগ্যতার পরিমাপ না করে শুধুমাত্র আমলাতান্ত্রিক নিয়মের বেড়াজালে এমন বৈষম্য টিকিয়ে রাখা মেধার অবমূল্যায়ন। বিষয়টি ইউজিসি চেয়ারম্যান অনুধাবন করেছেন যা আশার আলো দেখাচ্ছে।

বাস্তবতা হলো—ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বুয়েট, চুয়েট, কুয়েটের মতো দেশের শীর্ষ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যতীত বাকি কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রথম সারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের সাথে পাল্লা দেওয়ার যোগ্যতা রাখে না। তাই নীতিনির্ধারকদের উচিত শীর্ষ ২০-২৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে টার্গেট করে একটি সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড বা ক্রাইটেরিয়া বেঁধে দেওয়া, যার অধীনে তারা স্বাধীনভাবে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করতে পারবে। এই সুযোগ দেওয়া হলে দেশের অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও পর্যায়ক্রমে সেই মানদণ্ডে পৌঁছানোর জন্য নিজেদের গবেষণার মান বাড়াতে সচেষ্ট হবে এবং একটি সুস্থ প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে। এপিইউবির পক্ষ থেকে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ও ‘যৌথ পিএইচডি কর্মসূচি’ চালুর যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা এই লক্ষ্য অর্জনেই একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ।

রাষ্ট্র স্বয়ং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ট্যাক্স বা ভ্যাট বসাবে, আবার তাদের অলাভজনক বলে নীতিবাক্য শোনাবে—এই দ্বিমুখী নীতি থেকে আমাদের অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর প্রগতিশীল চিন্তাধারা আমাদের আশাবাদী করে। এখন প্রয়োজন সাহসিকতার সাথে শিক্ষার কাঠামোগত সংস্কার বা রিস্ট্রাকচারিং এবং ‘নলেজ ইন্ডাস্ট্রি’র আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে দেওয়া হোক। যে প্রতিষ্ঠান মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে না, সে মার্কেট থেকে এমনিতেই ছিটকে পড়বে। আর যারা মান ধরে রাখবে, তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সায়েন্সভিত্তিক এমন এক বিলিয়ন ডলারের নলেজ ইকোনমি তৈরি করবে, যা দক্ষ মানবসম্পদ ও বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) পরিচালক

কালবেলা
[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতকে তলব করল ইরান

ঝিনাইদহে গাড়াগঞ্জকে নতুন উপজেলা ও পৌরসভার দাবিতে মানববন্ধন

অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় / বিআইডব্লিউটিএর চলমান প্রকল্পসমূহের ব্যয় সাশ্রয় ও সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের নির্দেশনা

আবারও ফিফা র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষে আর্জেন্টিনা

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যায় সেনা কর্মকর্তা আটকের বিষয়ে কী বলছে আইএসপিআর

আলজেরিয়ার এতিমখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, শিশুসহ নিহত ১১

সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে গুলি গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় আঘাত: টিআইবি

সৈয়দপুরে বর্ণিল রথযাত্রা উদযাপন 

বিশ্বকাপ জিতলে কত টাকা পাবে চ্যাম্পিয়ন দল? বাকিরা কে কত পাবে?

এপস্টেইনের সঙ্গে গোয়েন্দাদের যোগাযোগ নিয়ে নতুন তথ্য ফাঁস করলেন ভ্যান্স

১০

র‍্যাবের সাবেক এএসপি মাসুদুর বরখাস্ত

১১

পে-স্কেলে ৪ ক্যাটাগরিতে মিলবে ইনক্রিমেন্ট, সচিব কমিটিতে সিদ্ধান্ত

১২

অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর যুবদল নেতা বহিষ্কার

১৩

বিছানায় পড়ে ছিল স্বামী-স্ত্রীর লাশ, পাশেই মিলল শিশুসন্তান ও চিরকুট

১৪

আলোচনার আড়ালে থাকা এক সৎ কর্মকর্তার বিদায়

১৫

শান্তিচুক্তি আলোচনা ভেস্তে দিতে অর্থায়ন ইসরায়েলের, অভিযোগ ভ্যান্সের

১৬

‘রাজপথ দেখেই যাবে সাঈদ’ ট্রলিতে মরদেহ নিয়ে শুরু হয়েছিল সেই মিছিল

১৭

তারকাখ্যাতির ৪৩ বসন্তে ক্যাটরিনা

১৮

দুই ট্রাকের সংঘর্ষে নিহত ১ 

১৯

হঠাৎ অসুস্থ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

২০
X