

ভোট একটি পবিত্র নাগরিক অধিকার এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রধানতম স্তম্ভ। কিন্তু বাংলাদেশের ৫৪ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসে ভোট বরাবরই এক অমীমাংসিত সংকটের নাম এবং এটি বারবার বিতর্কিত হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়েছে। বিশেষ করে বিগত দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে যেভাবে ধূলিসাৎ করা হয়েছে, তাতে ভোট শব্দটি এ দেশের মানুষের কাছে কেবলই এক নিষ্ঠুর প্রহসনে পরিণত হয়েছিল।
আজ নতুন বছরের (২০২৬) প্রথম মাসের প্রথম সপ্তাহ। আমরা এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। যেখানে পেছনে পড়ে আছে দেড় দশকের অন্ধকার আর সামনে হাতছানি দিচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার যে মহাবিপ্লব বাংলাদেশের ললাট থেকে স্বৈরাচারের তিলক চিরতরে মুছে দিয়েছে, সেই বিপ্লবের চূড়ান্ত সার্থকতা ও পূর্ণতা এখন নির্ভর করছে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সর্বজনগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ওপর।
বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ আজ কেবল একটি প্রতীকী ভোট দেওয়ার সুযোগ খুঁজছেন না, বরং তারা একটি 'মানবিক রাষ্ট্র' গড়ার স্বপ্ন দেখছেন। বিগত বছরগুলোতে এ দেশের মানুষ খুন, গুম, অপহরণ, সীমাহীন দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মানবাধিকার হরণের যে অমানবিক রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে বন্দি ছিল, তা থেকে চিরমুক্তি চায়। চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের যে প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল, তার মূলে ছিল রাষ্ট্রের এই অমানবিক রূপের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। মানুষের সেই ত্যাগের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচনই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি এবং এই সরকারের সফলতার অন্যতম মানদণ্ড।
বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচনী ও সাংবিধানিক সংকটের উৎস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কোনো আকস্মিক বিপর্যয় নয়; বরং কাঠামোগতভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করার এক দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার ফল।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০০৯-২০১৪ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক গৃহীত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী ছিল বাংলাদেশের ললাটে একটি 'সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রের' সিলমোহর। ২০১১ সালের মে মাসে সুপ্রিম কোর্টের একটি সংক্ষিপ্ত রায়কে (আবদুল মতিন খসরু বনাম বাংলাদেশ) ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। যদিও আদালতের সেই রায়ে পরবর্তী দুই মেয়াদে এই ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে বলে একটি পর্যবেক্ষণ (Obiter Dicta) ছিল, কিন্তু শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিকভাবে নিজেদের সুবিধার্থে তা পুরোপুরি উপেক্ষা করে।
এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭বি-এর মতো বিতর্কিত 'অপরিবর্তনীয় বিধান' যুক্ত করা হয়, যা কার্যত জনগণের সার্বভৌমত্বকে এক দলীয় শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে ফেলে। এটি কোনো সাধারণ আইনি পরিবর্তন ছিল না, বরং এটি ছিল জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে ক্ষমতাকে আজীবন ধরে রাখার একটি গভীর রাজনৈতিক নীল নকশা। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে এমনভাবে বিকৃত করা হয়েছিল, যাতে দলীয় সরকারের অধীনে প্রশাসন ও পুলিশকে ব্যবহার করে নির্বাচনের ফলাফল পূর্বনির্ধারিত রাখা যায়। এই একটি সংশোধনীর কালো ছায়ায় দেশ পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ১৫৪ জন সদস্যের বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার মতো নজিরবিহীন সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ (ICG) তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছিল, এই ব্যবস্থা বাংলাদেশকে একটি ‘ওয়ান-পার্টি স্টেটে’র দিকে ধাবিত করছে। ২০১৮ সালের নৈশভোট এবং ২০২৪ সালের ‘ডামি নির্বাচন’ ছিল মূলত সেই পঞ্চদশ সংশোধনীরই ধারাবাহিক বিষফল। এই সাংবিধানিক কাটাছেঁড়া কেবল একটি নির্বাচন ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করেনি, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের তিনটি প্রধান অঙ্গ—নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য (Checks and Balances) চিরতরে নস্যাৎ করে দিয়েছিল।
বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, তার নজির আধুনিক পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে খুব কমই মেলে। এই সময়ের তিনটি বিশেষ নির্বাচনের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ভোটারদের গুরুত্বহীন করে তোলা হয়েছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্র হত্যার প্রথম প্রকাশ্য পদক্ষেপ। এরপর ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিশ্ব এক অভূতপূর্ব জালিয়াতি প্রত্যক্ষ করে। প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় নির্বাচনের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখা হয়, যা ‘নিশীথ নির্বাচন’ বা ‘রাতের ভোট’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করে। সবশেষে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় তথাকথিত ‘ডামি নির্বাচন’, যেখানে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সরকার নিজেই নিজের ডামি প্রার্থী দাঁড় করিয়ে এক হাস্যকর নাটকের অবতারণা করেছিল। এই ধারাবাহিক জালিয়াতি ও প্রহসন এ দেশের সাধারণ মানুষকে ভোটের প্রতি এতটাই বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিল যে, মানুষ নির্বাচনের নাম শুনলেই তাচ্ছিল্য করতে শুরু করে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের বিচার-বিশ্লেষণে একটি সাধারণ অভিযোগ দীর্ঘদিনের যে, ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর দেশে আর কোনো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। আমাদের রাজনৈতিক সরকারগুলোর ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহা এবং যেকোনো মূল্যে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার একগুঁয়েমি এ দেশের মানুষের মনে ভোটের প্রতি চরম বিরূপ ধারণা জন্ম দিয়েছে। নানা ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার এই অপরাজনৈতিক চর্চা দেশ থেকে সুষ্ঠু গণতন্ত্রের ধারাকে যোজন যোজন দূরে পাঠিয়ে দিয়েছে। অথচ একটি সঠিক ও টেকসই গণতন্ত্র চর্চার লক্ষ্যেই এদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের জীবন ও সম্ভ্রম উৎসর্গ করেছিলেন।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে এসেও সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই আজ অবধি শেষ হয়নি। বরং এই দীর্ঘ পথচলায় হাজারো মানুষকে স্বাধীন দেশে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে। বিগত দেড় দশকে দেশ খুন, গুম, অপহরণ এবং ধর্ষণের মতো জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপশাসনের দিকে ধাবিত হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার এই ঘুণেধরা কাঠামো নিয়ে নাগরিক মনে তৈরি হয়েছে বিস্তর ক্ষোভ ও অভিযোগ। মানুষ আজ কেবল ক্ষমতার বদল নয়, বরং একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো চায়।
এই জনআকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখেই গত ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে তফসিল ঘোষণা করেছেন, আজ ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে দাঁড়িয়ে তার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা অত্যন্ত জরুরি। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, গত ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে। ৩০ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ আগামী ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে। সংক্ষুব্ধ প্রার্থীদের জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ থাকবে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত এবং সেই আপিল নিষ্পত্তি করা হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি এবং প্রতীক বরাদ্দের পর ২১ জানুয়ারি থেকে প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করতে পারবেন। সব শেষে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে সেই বহুল প্রতীক্ষিত ভোটগ্রহণ।
এবারের নির্বাচনের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো ভোটারের বিশাল সংখ্যা, যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবারের মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এই ভোটার তালিকার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো প্রায় ২ কোটির বেশি তরুণ বা জেনারেশন-জেড ভোটার। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার মহাবিপ্লব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কেবল একটি সরকার পরিবর্তন ছিল না; বরং এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশক ধরে পুঞ্জীভূত কাঠামোগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি ‘সোশিও-পলিটিক্যাল’ বা সামাজিক-রাজনৈতিক বিস্ফোরণ।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যখন কোনো রাষ্ট্রে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং সীমাহীন দুর্নীতির মাধ্যমে নাগরিক মর্যাদা ধূলিসাৎ করা হয়, তখন সমাজ একটি ‘ব্রেকিং পয়েন্টে’ পৌঁছায়। চব্বিশের এই অভ্যুত্থান ছিল সেই ব্রেকিং পয়েন্টের বহিঃপ্রকাশ। এই আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল জেনারেশন-জেড, যারা কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয়, বরং একটি ‘ইনক্লুসিভ’ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক মানবিক রাষ্ট্র গঠনের দাবি সামনে এনেছে।
রাষ্ট্রতত্ত্বের ভাষায়, একটি মানবিক রাষ্ট্র কেবল ভোটের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত হয় না; বরং নাগরিকের বাক-স্বাধীনতা, জীবনের নিরাপত্তা এবং আইনের শাসনের মাধ্যমে এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। বিগত আমলের রাষ্ট্র কাঠামোটি ছিল মূলত একটি ‘এক্সট্রাক্টিভ স্টেট’ বা লুণ্ঠনমূলক রাষ্ট্র, যেখানে সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা গুটিকয়েক সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর হাতে কুক্ষিগত ছিল। চব্বিশের আন্দোলনের অন্যতম নির্যাস ছিল ‘জুলাই চার্টার’, যা রাষ্ট্রকে একটি জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানের রূপ দেওয়ার অঙ্গীকার করে। সুতরাং, আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি সেই মানবিক রাষ্ট্র গড়ার পথে প্রথম চূড়ান্ত ম্যান্ডেট। যদি এই নির্বাচন সুষ্ঠু না হয়, তবে বিপ্লবের সেই মৌলিক স্পিরিট বা চেতনা একটি গভীর সংকটের মুখে পড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতার পথ প্রশস্ত করতে পারে।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক হলো সংসদীয় নির্বাচনের পাশাপাশি একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া 'গণভোট'। জুলাই-আগস্টের মহাবিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত আকাঙ্ক্ষাকে একটি রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক কাঠামো দেওয়ার লক্ষ্যেই এই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। বিশেষ করে বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার স্থায়ী পুনস্থাপন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের মৌলিক ইস্যুগুলোতে জনগণের সরাসরি রায় নিতেই এই ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে ১২ ফেব্রুয়ারি কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের দিন নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কাঠামোর রূপরেখা চূড়ান্ত করার এক ঐতিহাসিক দিনে পরিণত হতে যাচ্ছে। চব্বিশের বিপ্লবের শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ‘জুলাই চার্টার’- এর ভাগ্য নির্ধারণ হতে যাচ্ছে এই গণভোটের মাধ্যমেই। দেশের সর্বোচ্চ আইনি বৈধতা আসবে, যা যেকোনো ষড়যন্ত্রের হাত থেকে গণতন্ত্রকে রক্ষা করবে।
বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসরদের অনুপস্থিতিতে এবারের রাজনৈতিক ময়দান এক নতুন রূপে সেজেছে। জনাব তারেক রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বিএনপি একক বৃহৎ শক্তি হিসেবে নির্বাচনে অবতীর্ণ হচ্ছে। তারা তাদের ঐতিহাসিক ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা নিয়ে জনগণের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছে, যা ভোটারদের মাঝে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য ইসলামী দলগুলো একটি শক্তিশালী বৃহৎ জোট গঠনের জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, চব্বিশের ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের নেতৃত্বে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দলগুলো শুরুতে তরুণদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেললেও সময়ের বিবর্তনে তাদের সেই পালে হাওয়া কিছুটা কমেছে। বিশেষ করে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (NCP) ভোটের মাঠে একটি বড় ফ্যাক্টর হবে বলে শুরুতে ধারণা করা হলেও, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে কালে কালে তারা কিছুটা ক্ষয় হতে শুরু করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এই পরিস্থিতিতে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট উপহার দেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং সিভিল প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে থাকা দলীয় লেজুড়বৃত্তি ও ফ্যাসিবাদের অবশিষ্টাংশ দূর করার কাজ নিরন্তর চলছে।
সরকারের ভাষ্যমতে ভোট ডাকাতি ও কারচুপি রোধে এবার প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে এবং বিতর্কিত ইভিএম পদ্ধতির বদলে কাগজের ব্যালটে স্বচ্ছ ব্যালট বক্স ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে।
নির্বাচনের দিনগুলোতে সারা দেশে সেনাবাহিনীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে তারা প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় সতর্ক অবস্থানে থাকবে। আজ ১ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যৌথ বাহিনীর অভিযান জোরদার রাখা হয়েছে—এ অভিযান আরও জোরালো হোক এমন প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের। পরিশেষে বলা যায়, এই নির্বাচনের সফলতার ওপরই নির্ভর করছে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামগ্রিক সফলতা।
ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহা এবং জেঁকে বসা স্বৈরাচারী সংস্কৃতি যা আমাদের দেশ থেকে গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার এটাই সর্বোত্তম সুযোগ। ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন কেবল একটি রুটিনমাফিক ক্ষমতা বদল নয়, এটি এদেশের কোটি কোটি মানুষের হারানো ভোটাধিকার, মানবিক মর্যাদা ও নাগরিক সম্মান পুনরুদ্ধারের অন্তিম লড়াই। এই লড়াইয়ে জয়ী হওয়া ছাড়া বাংলাদেশের সামনে দ্বিতীয় কোনো বিকল্প পথ নেই। এ দেশের মানুষ আজ একটি মানবিক রাষ্ট্রের প্রত্যাশায় বুক বেঁধেছে, যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার এবং জীবনের নিরাপত্তা হবে প্রশ্নাতীত।
মন্তব্য করুন