

এটা শুধু হার নয়, এটা ছিল আত্মসমর্পণের গল্প। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এবারের অ্যাশেজে ইংল্যান্ড যে এত দ্রুত এবং এত অসহায়ভাবে পরাস্ত হবে, তা অনেকেই ভাবেননি। বিশেষ করে এমন এক অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে, যাদের দলকে তুলনামূলক দুর্বল বলেই ধরা হচ্ছিল। কিন্তু মাঠের ক্রিকেটের চেয়েও বড় ভূমিকা রেখেছে মাঠের বাইরের ভুল—দল নির্বাচন, প্রস্তুতি, মনোভাব এবং শেষ পর্যন্ত মদ আর সমুদ্রতটে কাটানো সময়।
ভুলের শুরু অনেক আগেই
এই বিপর্যয়ের বীজ বোনা হয়েছিল অনেক আগে। ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে জ্যাক ক্রলির ইনজুরির পর প্রকৃত ওপেনার পরীক্ষার সুযোগ ছিল ইংল্যান্ডের। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানো হয়নি। ড্যান লরেন্সকে এমন একটি ভূমিকায় নামানো হয়, যা তার স্বাভাবিক খেলার সঙ্গে মানানসই ছিল না। ফলাফল—তিনি হারিয়ে যান দৃশ্যপট থেকেই।
জর্ডান কক্সের চোট দুর্ভাগ্যজনক হলেও, মার্ক উডকে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত ছিল আত্মঘাতী। যে দলে গতির জন্য ইংল্যান্ড মরিয়া ছিল, সেই দলের সবচেয়ে গতিময় বোলারকেই তারা অপ্রয়োজনীয় এক টুর্নামেন্টে হারিয়ে ফেলল।
এর সঙ্গে যোগ হয় কোচিং কাঠামোর অস্পষ্টতা। সহকারী কোচ পল কলিংউডের বিদায়, ফাস্ট বোলিং কোচ নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে প্রস্তুতির ভিত ছিল নড়বড়ে।
প্রস্তুতির নামে আত্মতুষ্টি
অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার আগে যথাযথ প্রস্তুতি ম্যাচের অভাব স্পষ্ট ছিল। নিউজিল্যান্ড সফরকে অ্যাশেজ প্রস্তুতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। শীতকালীন কন্ডিশনে খেলা সেই সিরিজ ইংল্যান্ডকে আদৌ প্রস্তুত করেনি অস্ট্রেলিয়ার গতি ও বাউন্সের জন্য।
লিলাক হিলের ইনট্রা-স্কোয়াড ম্যাচ ছিল আরও এক বিভ্রান্তি। ধীর ও নিচু উইকেটে হওয়া সেই ম্যাচের সঙ্গে পার্থ স্টেডিয়ামের কোনো মিলই ছিল না। সেখানে খেলোয়াড়দের মনোযোগের চেয়ে বেশি ছিল গান, ঠাট্টা আর হালকা পরিবেশ। এমনকি অধিনায়ক বেন স্টোকস সমালোচকদের ‘হ্যাজ-বিন’ বলেও কটাক্ষ করেন—যা পরে আরও বড় আলোচনার জন্ম দেয়।
মাঠে নামতেই ধস
পার্থ টেস্টে লাঞ্চের সময় পর্যন্ত এগিয়ে থেকেও একই দিনে ম্যাচ হারানো ছিল মানসিক ধাক্কার শুরু। এরপর ব্রিসবেনে দ্বিতীয় টেস্টে হার এবং অধিনায়কের ‘ড্রেসিংরুম দুর্বলদের জায়গা নয়’ মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
মাঠের বাইরে ইংল্যান্ড দলকে দেখা যায় গলফ কোর্স, অ্যাকোয়ারিয়াম আর ক্যাসিনোর আশপাশে। মিডিয়ার নজরদারি বাড়ে, সমালোচনাও তীব্র হয়। কিন্তু সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় আসে নুসা সমুদ্রতটে।
নুসা: বিশ্রাম না অবাধ ছুটি?
দল বলেছিল এটি ছিল পরিকল্পিত বিশ্রাম। কিন্তু বাস্তবে তা অনেকের জন্য হয়ে ওঠে লাগামছাড়া আনন্দযাপন। ব্রিসবেনের পর নুসায় টানা ছয় দিন মদ্যপান—যতদিন তখন পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেটই খেলা হয়নি।
কিছু খেলোয়াড় শৃঙ্খলা মেনে চললেও, সামগ্রিক চিত্র ছিল বিশৃঙ্খল। সকালে দৌড়ানোর ডাক দেওয়া হলেও মাত্র তিনজন খেলোয়াড় হাজির হন। সমুদ্রতটে স্থানীয় রেডিও জকিদের ঠাট্টা, রাস্তায় প্রকাশ্যে পানাহার—সবই ইংল্যান্ডের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে।
অ্যাডিলেডে শেষ অধ্যায়
অ্যাডিলেডে স্পিন সহায়ক উইকেটে প্রকৃত স্পিনার না খেলানো, পার্টটাইম বোলার দিয়ে কাজ চালানো—সব মিলিয়ে কৌশলগত বিভ্রান্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। লড়াই কিছুটা হলেও, ১১ দিনের মধ্যেই অ্যাশেজ কার্যত শেষ হয়ে যায়।
এটি ইংল্যান্ডের টানা চতুর্থ অ্যাশেজ সফর, যেখানে প্রথম তিন টেস্টেই তারা হেরে বসে।
এটা শুধু অস্ট্রেলিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের গল্প নয়। এটা ইংল্যান্ডের আত্মতুষ্টি, ভুল পরিকল্পনা আর শৃঙ্খলার ঘাটতির নির্মম পরিণতি।
মদ, সমুদ্র আর ভুল সিদ্ধান্ত—এই তিনের মিশ্রণেই এবারের অ্যাশেজ ইংল্যান্ডের হাতছাড়া হয়েছে।
অ্যাশেজ হয়তো শেষ, কিন্তু এই সফরের শিক্ষা ইংল্যান্ড ক্রিকেটকে অনেক দিন তাড়া করবে।
*বিবিসি থেকে অনূদিত
মন্তব্য করুন