

যুদ্ধবিরতির মাসগুলোতেও গাজায় চলছেই মৃত্যু ও বাস্তুচ্যুতি। এ সময় আকাশ থেকে বোমা পড়া কিছুটা কমলেও থামেনি ফিলিস্তিনিদের হত্যা করা। ক্যানসার রোগী, শিশু ও বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য এ যুদ্ধবিরতি যেন শুধু নীরবতার এক নতুন অধ্যায়—যন্ত্রণার অবসান নয়। ৬১ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি নারী নাজাত সাইয়েদ আল-হেসি গত ২৭ মাস ধরে ক্যানসারের প্রয়োজনীয় ওষুধ পাননি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর রামাল্লাহ যাওয়ার কথা থাকলেও সেদিনই যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তার চিকিৎসা থেমে যায়। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত তিনি কোনো চিকিৎসা পাননি। দেইর আল-বালাহর একটি অস্থায়ী তাঁবুতে বসে আল-হেসি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির পরও ক্যানসার রোগীদের জন্য কিছুই বদলায়নি। প্রতিদিন মনে হয় রোগটা আমার শরীরের ভেতর আরও ছড়িয়ে পড়ছে। আমি ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছি।’
চিকিৎসা ব্যবস্থা ধ্বংস, ওষুধ সংকট ভয়াবহ : গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অঞ্চলটিতে প্রয়োজনীয় ওষুধের ৫৬ শতাংশ, চিকিৎসা উপকরণের ৬৮ শতাংশ এবং পরীক্ষাগারের ৬৭ শতাংশ সামগ্রী অনুপস্থিত। ক্যানসার রোগীদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। গাজা ক্যানসার সেন্টারের চিকিৎসা পরিচালক ডা. মুহাম্মদ আবুনাদা জানান, ‘ক্যানসারের ওষুধ ও ব্যথানাশকের প্রায় ৭০ শতাংশ নেই। ফলে মৃত্যুহার যুদ্ধের আগের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেড়েছে।’ যুদ্ধের আগে প্রতিদিন গড়ে একজন ক্যানসার রোগী মারা যেতেন, এখন মারা যাচ্ছেন দুই থেকে তিনজন।
শিশুমৃত্যুর হারও বেড়েছে: ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের শেষ তিন মাসে নবজাতক মৃত্যুর হার ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০২২ সালে যেখানে মাসে গড়ে ২৭ নবজাতকের মৃত্যু হতো, সেখানে এখন তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭ জনে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েলি গোলাবর্ষণ ও গুলিতে প্রতিদিনই ফিলিস্তিনি নিহত হচ্ছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৪৪৯ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৬৪ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে শতাধিক শিশু রয়েছে। ইউনিসেফ এ সময়টিকে আখ্যা দিয়েছে—‘শিশু হত্যা করা এক যুদ্ধবিরতি’।
‘হলুদ রেখা’: নতুন আতঙ্ক : ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় একতরফাভাবে চালু করেছে তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’, যা বর্তমানে গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এই সীমার ভেতরে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। গাজা সিটির বাসিন্দা আবু রাফিক উবেইদ বলেন, ‘আমরা এখনো আগের মতোই আতঙ্কে আছি, শুধু শব্দটা কম। আমার সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় লাগে।’
শীত, আরেক ঘাতক : প্রায় ১৫ লাখ মানুষ এখনো বাস্তুচ্যুত। কোনো পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় হাজারো পরিবার টানা তৃতীয় শীত কাটাচ্ছে ছেঁড়া তাঁবুতে। গত দুই মাসে প্রবল বৃষ্টিতে হাজার হাজার তাঁবু ধ্বংস হয়েছে। শীতজনিত কারণে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩১ জন মারা গেছেন, যাদের মধ্যে ১৯ জন শিশু।
তিন সন্তানের মা রাজা জেনদিয়া বলেন, ‘শীত এখন শুধু একটি ঋতু নয়—এটা আরেক ঘাতক, যার বিরুদ্ধে লড়াই করে আমাদের টিকে থাকতে হয়।’
ইচ্ছাকৃত নির্ভরশীলতা তৈরি? : ইসরায়েল গাজার কৃষিজমির ৮০ শতাংশ এবং মাছ ধরা খাতের ৯৫ শতাংশ ধ্বংস বা অকার্যকর করে দিয়েছে। জেলেদের সমুদ্রে যেতে বাধা দেওয়া হচ্ছে, ফলে গাজা খাদ্যে স্বনির্ভরতা হারিয়ে পুরোপুরি সাহায্যনির্ভর হয়ে পড়েছে। জেলে ইউনিয়নের নেতা জাকারিয়া বাকর বলেন, ‘তারা চায় না গাজা নিজের পায়ে দাঁড়াক। তারা আমাদের নির্ভরশীল করে রাখতে চায়।’
নীরব মৃত্যু : বোমা থামলেও ক্ষুধা, ঠান্ডা, চিকিৎসার অভাব ও বাস্তুচ্যুতির যন্ত্রণা থামেনি। গাজায় যুদ্ধবিরতি যেন এক নতুন বাস্তবতা—দ্রুত হত্যার বদলে ধীর মৃত্যুর অধ্যায়।
মন্তব্য করুন