

ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন আপাতত স্তিমিত। গণগ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের মুখে বিক্ষোভ পরিস্থিতি এখন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে। এর মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তাদের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে এবং সন্ত্রাসবাদ সংশ্লিষ্ট আইনে বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টি নিয়ন্ত্রণে এলেও যে অসন্তোষ থেকে এ অস্থিরতার জন্ম, তার মূল কারণগুলো এখনো রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য কঠিন সমঝোতায় যাওয়া বা নতুন করে অস্থিরতার মুখে পড়া—এই দুইয়ের মধ্যে যে কোনো একটি বেছে নিতে হবে তেহরানকে। দুর্বল অর্থনীতি, আঞ্চলিক মিত্রদের নেটওয়ার্ক ক্ষয়ে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার হুমকির মধ্যে ইরান এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্টের পরিচালক আলি ভায়েজ বলেন, এ পরিস্থিতি কোনো স্থিতিশীল ‘স্থিতাবস্থা’ নয়। পরিবর্তন অস্বীকার করলে অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যাবে।
ইরানে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে মুদ্রার দরপতন কেন্দ্র করে শুরু হওয়া প্রতিবাদ দ্রুতই সরকার পতনের দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলনে রূপ নেয়। সরকারের দমন-পীড়নের ফলে এটি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর সবচেয়ে সহিংস সংঘর্ষগুলোর একটিতে পরিণত হয়। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যে মৃতের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি বলা হলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলো আরও বেশি প্রাণহানির দাবি করছে।
ইরানে আন্দোলনের নেপথ্যে কী: অর্থনৈতিক সংকটই এ অস্থিরতার প্রধান চালিকাশক্তি। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় ইরানি রিয়ালের মান ব্যাপকভাবে কমেছে, তেলের আয়ও সংকুচিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশটিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪১ শতাংশের ওপরে পৌঁছায়। পাশাপাশি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও দীর্ঘস্থায়ী পানির সংকটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।
নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসা ছাড়া তেহরানের সামনে বিকল্প কম। তবে এর জন্য সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে ইরানের মূল পররাষ্ট্রনীতিগত স্তম্ভ—পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তা—এই তিন বিষয়ে ছাড় দিতে হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক ইস্যুতে সীমিত নমনীয়তা দেখা গেলেও ক্ষেপণাস্ত্র ও তথাকথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ নিয়ে ছাড় দেওয়া এখনো কঠিন।
ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়ার দাবি জানালেও তেহরান তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
সরকার পরিবর্তন কি অবশ্যম্ভাবী: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। উপসাগরীয় দেশগুলোর চাপে ট্রাম্প সামরিক হুমকির ভাষা কিছুটা নরম করলেও, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি মোতায়েন অব্যাহত রয়েছে, যা চাপ সৃষ্টির কৌশল বলেই দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বড় ধরনের ছাড় দিলে ইরানি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও বৈধতার ধারণা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে। সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে দেশটির ভেতরে প্রাণহানি সেই সামাজিক চুক্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে, যার ভিত্তিতে এতদিন শাসনব্যবস্থা টিকে ছিল।
জার্মানির এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষক হালিরেজা আজিজি মনে করেন, ইরানে রূপান্তর এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। ধর্মীয় নেতৃত্বের জায়গায় ধীরে ধীরে সামরিক প্রভাব বাড়ছে, বিশেষ করে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ক্ষমতা ও প্রভাবের বিস্তার লক্ষণীয়। তার মতে, খামেনির মৃত্যু বা ক্ষমতাচ্যুতির পর ইরান আর আগের মতো থাকবে না। পরিবর্তনটি হবে গণআন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতন, নাকি নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতর দিয়েই নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ—তা এখনো অনিশ্চিত। তবে পরিবর্তন যে অবশ্যম্ভাবী, সে বিষয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রায় ঐকমত্য রয়েছে।
মন্তব্য করুন