বন্যা-পরবর্তী চট্টগ্রামে থেমে থেমে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। এতে সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। এর মধ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর সংঘাত, সহিংসতার জেরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ৪১টি ওয়ার্ডে মশক নিধনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে নেমে এসেছে মন্থর গতি। ফলে এডিস মশা হয়ে দাঁড়িয়েছে মহাবিপদের কারণ।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর চট্টগ্রামে ১ হাজার ৩৫৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন, যেখানে চলতি সেপ্টেম্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ৭৬১ জন। তা ছাড়া চলতি বছর ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৪ জন, ৯ জনই মারা গেছেন চলতি সেপ্টেম্বরে। নিহতের মধ্যে দুজন অন্তঃসত্ত্বা নারীও রয়েছেন। তা ছাড়া দুই শিশুও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। এ পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তা ছাড়া আক্রান্তদের মধ্যে ৮০৩ জন নগর এবং ১৫ উপজেলায় মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৫২৬ জন। উপজেলাগুলো মধ্যে লোহাগাড়ায় ১৬১ জন এবং সাতকানিয়ায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেপ্টেম্বরের দিকে শেষ হয় বর্ষা মৌসুম। এ সময় অনেকটা থেমে থেমে বৃষ্টি থাকে। এ পরিস্থিতিতে এডিস মশা লার্ভা বিস্তারের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তাই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আগস্টের শেষ দিকে সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই বাড়তে শুরু করে ডেঙ্গু রোগী, যা নভেম্বর পর্যন্ত চলবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। এ সময় বাড়ির আঙিনা, বাগান, ছাদ এবং পরিত্যক্ত টব ও অন্যান্য সামগ্রীতে যাতে পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে সচেতন হতে বাসিন্দাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে।
সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, মৃত্যুর বিষয়টি অ্যালার্মিং। পুরো স্বাস্থ্য বিভাগে ডেঙ্গু নিয়ে অ্যালার্ট করা হয়েছে। প্রতিটি সরকারি হাসপাতাল ও কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু কর্নার রয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্তদের সেবা নিশ্চিতে পুরোদমে কাজ করছে স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিটি কর্মী।
চলতি বছর সেপ্টেম্বর ঢুকতেই আগ্রাসী রূপ ধারণ করেছে ডেঙ্গু প্রকোপ। এ অবস্থায় ভাবিয়ে তুলছে নারীর মৃত্যুহার। চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৭৪২ জন, যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন। ডেঙ্গু আক্রান্ত নারীর সংখ্যা ৩৫৯ জন, প্রাণ হারিয়েছেন ৯ জন। শিশুদের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২৫৮ জন, প্রাণ হারিয়েছে দুজন। অর্থাৎ চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট ১৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। যেখানে আটজনই নারী।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, জেনেটিক কারণে নারীদের ডেঙ্গুতে মারা যাওয়ার হার বেশি। এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় ও ঋতুস্রাবকালে কোনো নারী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তাদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকে। এক্সপান্ডেড সিনড্রোমের মধ্যে রোগীর ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, প্রেশার কমে যাচ্ছে এবং শকে চলে যাচ্ছে আক্রান্তরা। ফলে প্লাটিলেট কমে যাচ্ছে এবং রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। তা ছাড়া অসচেতনতা এবং জ্বর হলে অবহেলার কারণে নারীদের মৃত্যুহার বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর এখনো থমথমে চসিকের বেশির ভাগ ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়। চসিকের অনেক কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে হয়েছে মামলা। সরকার পতনের পর ভাঙচুর হয় অন্তত ২০টি ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ে। যদিও জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনসহ কাউন্সিলর কার্যালয়ের সার্বিক কাজ তদারকিতে চসিকের ছয় কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবু স্থানীয়রা অভিযোগ তুলেছেন সৃষ্ট পরিস্থিতিতে মশক নিধন কার্যক্রম চলছে ঢিলেঢালা। এ অবস্থায় নগরের তিনটি এলাকা থেকে ডেঙ্গু আক্রান্তের খবর বেশি আসছে বলে জানিয়েছেন চসিক সংশ্লিষ্টরা।
চসিকের মশক ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম মাহী বলেন, রুটিন ওয়ার্ক চলছে। স্প্রেম্যানের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে সকালে লার্ভিসাইড ছিটানো হচ্ছে, বিকেলে ফগিং চলছে। নগরীর প্রায় সব এলাকা থেকে আক্রান্তের খবর আসছে। তবে সবচেয়ে বেশি আসছে কোতোয়ালি, বাকলিয়া ও বায়েজিদ বোস্তামি এলাকা থেকে। আমরা সেগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু করেছি। আক্রান্তদের ঠিকানা সংগ্রহ করে তাদের বাড়ি ও আশপাশের পাঁচশ গজের মধ্যে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে।