স্বাবলম্বী হতে যেখানে সরকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে গবাদি পশু পালনে উৎসাহিত করছে, সেখানে ঝিনাইদহের শৈলকুপার ২৫ গ্রামে ছাগল পালন নিষিদ্ধ করে রেখেছেন গ্রাম্য মাতবর ও জনপ্রতিনিধিরা। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে চলে আসা এ নিষেধাজ্ঞার পেছনে তাদের দাবি, ছাগল পালনের ফলে এলাকার ক্ষেতের ফসল নষ্ট করে। এ ছাড়া এ নিয়ে সামাজিক সংঘাতের অজুহাতও রয়েছে। এদিকে প্রভাবশালীদের এমন অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতে না পারায় বিপাকে পড়েছেন গ্রামের হতদরিদ্ররা। আর্থসামাজিক উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। তবে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলছেন, বিভিন্ন গ্রামে সামাজিক মাতবররা নিষিদ্ধ করলেও এ আদেশ দেওয়া কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। আর জেলা প্রশাসন বলছে, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাবলু জোয়ারদার ও আলম রায়হান নামে দুই ইউপি সদস্য জানান, গ্রামের মুরুব্বি-মোড়লরা ২৫ বছর আগে থেকে স্ট্যাম্প করে ছাগল পালন বন্ধ করেছেন। ছাগল নিয়ে অশান্তি হওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কোরবানির আগে শুধু ছাগল পালনের সুযোগ রয়েছে। ঈদ চলে গেলে আবার নিষিদ্ধ থাকে।
ভুক্তভোগী গ্রামবাসী জানান, ছাগল পালন নিষিদ্ধ গ্রামের মধ্যে বিত্তিপাড়া গ্রাম, গোলকনগর, নলখোলা, বিপ্রবদিয়া, বোয়ালিয়া, মাধবপুর, পাইকপাড়া, হাজরামিন, শিতলীডাঙ্গা, ব্রহ্মপুর, বড় মৌকুড়ি, ছোট মৌকুড়ি, নাদপাড়াসহ প্রায় ২৫টি গ্রাম রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে বেড়বাড়ি গ্রাম। এ গ্রামের বাসিন্দাদের অধিকাংশই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি গবাদি পশু পালন এবং বিক্রিও তাদের আয়ের অন্যতম উৎস। এ গ্রামেই স্ত্রী, ছেলে ও পুত্রবধূ নিয়ে থাকেন নওশের মণ্ডল। গরু পালন করলেও মাতবররা তাদের ছাগল পালন করতে দেন না। এই নিয়মকে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে বাধা মনে করেন নওশেরসহ গ্রামের সবাই।
আবার বেড়বাড়ি গ্রাম থেকে ২০০ গজ দূরের চাঁদপুর গ্রামের সবাই গরু-ছাগল লালনপালন করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। সেখানে এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। এ গ্রামের বাসিন্দারা জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে ছাগল পালন করছেন। ছাগল বড় হলে বাজারে বিক্রি করে যা আয় হয়, তা সংসারের কাজে লাগে।
এদিকে গোলকনগর গ্রামের বাসিন্দা লিয়াকত ও মোক্তার হোসেন জানান, ছাগলে ক্ষেত খায়, সামাজিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই এ গ্রামের মাতবর ও মেম্বার-চেয়ারম্যানরা ছাগল পালন করতে দেন না। তবে গ্রামবাসী এ বিধি-নিষেধ চান না। বরং ছাগল পালন করে স্বাবলম্বী হতে চান তারা।
শৈলকুপা উপজেলা চেয়ারম্যান এম এ হাকিম জানান, উপজেলার ২০-২৫টি গ্রামে সামাজিক মাতবর ও জনপ্রতিনিধিরা ছাগল পালন নিষিদ্ধ করেছেন। আমরা প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদের কর্মকর্তাসহ সবাইকে নিয়ে বসে দ্রুত সমস্যার সমাধান করা হবে।
শৈলকুপা সার্কেল সহকারী পুলিশ সুপার অমিত কুমার বর্মণ জানান, ছাগল পালনে নিষিদ্ধ এমন কোনো অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এমন বেআইনি নিয়মের কথা কখনোই শুনিনি।
জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. মনোজিৎ কুমার সরকার জানান, শৈলকুপার বেশ কয়েকটি গ্রামে সামাজিক মাতবর ও চেয়ারম্যানরা ছাগল পালন নিষিদ্ধ করেছেন। আমরা প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে উঠান বেঠকের মাধ্যমে আবার ছাগল পালন শুরুর ব্যবস্থা নেব; যাতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থিকভাবে সচ্ছলতা ফিরে আসে।
জেলা প্রশাসক এস এম রফিকুল ইসলাম বলেছেন, ছাগল পালন নিষিদ্ধ করার যে আইন করা হয়েছে তা দুঃখজনক। কারা, কী কারণে নিষেধ করেছে, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন