কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কেন্দ্র করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর আওয়ামী লীগের কাছে গুরুত্ব বেড়েছে ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের। রাজনৈতিক পদক্ষেপের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও জোট নেতাদের পরামর্শ নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দল। সেইসঙ্গে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে সাবেক ছাত্রনেতাদেরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র।
বিশ্লেষকদের মতে, কোটাবিরোধী আন্দোলন ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। দেড় দশক ক্ষমতার পর দলের এই নাজুক পরিস্থিতি সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ পিছু হটায় অনেকেই বিস্মিত হন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সাবেক ছাত্রনেতাদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে কয়েক বছর ধরেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১৪ দলের শরিকদের টানাপোড়েন চলছিল। পরপর দুই মেয়াদে শরিক দলগুলোর কাউকে মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়া হয়নি। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি নিয়ে তৈরি হয়েছিল অসন্তুষ্টি। প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পাওয়ায় জোটের অনেক প্রভাবশালী নেতা আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে নির্বাচনে হেরে যান। এসব কারণে ১৪ দলের ঐক্যে টান পড়ে। নির্বাচনের পর শরিক দলের নেতারা প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তবে কোটাবিরোধী আন্দোলন ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে জোট শরিকরা আবারও আওয়ামী লীগের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারফিউ জারিসহ জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে জোট শরিকদের পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। নাশকতায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পরিদর্শন, হাসপাতালে আহতদের দেখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ১৪ দলের শরিকদের উপস্থিতিও প্রমাণ করে আওয়ামী লীগ জোট নেতাদের গুরুত্ব দিচ্ছে।
এ বিষয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু কালবেলাকে বলেন, ‘এটা অবশ্যই জোটের জন্য ইতিবাচক। জোটের সঙ্গীরা একে অন্যের পাশে থাকবে, বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও ঐক্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে—এটাই স্বাভাবিক। নতুন করে সেই গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়াটা অবশ্যই আশাব্যঞ্জক।’
জানা যায়, জোট গঠনের যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল, তা কয়েক বছর ধরে অনুপস্থিত ছিল। জেলায় জেলায় জোটের কর্মকাণ্ড ছিল না বললেই চলে। এমনকি জোট নেতাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন দলের মনোভাব ও বক্তব্যও ছিল অনেকটা আক্রমণাত্মক। কিছু কিছু জায়গায় তারা ছিল সাংঘর্ষিক অবস্থানে। এসব বিষয় নিয়ে তৈরি হয় ক্ষোভ।
এদিকে কোটাবিরোধী আন্দোলন কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাংগঠনিকভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর হয়ে পড়ে দলটি। এক পর্যায়ে কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। যদিও আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার নির্দেশেই ছাত্রলীগ সংঘর্ষ এড়াতে বিভিন্ন ক্যাম্পাস থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু সাবেক ছাত্রনেতা ও বর্তমান ছাত্রনেতাদের অভিযোগ, ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগের ন্যক্কারজনক প্রস্থান এই রাজনৈতিক সংগঠনটির ইতিহাসের সঙ্গে বেমানান। এমনকি সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের ভূমিকা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তোলেন। এই নাজুক অবস্থায় দলের ইমেজ পুনরুদ্ধার ও নেতাকর্মীদের মধ্য ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত দলের সাবেক কর্মীদের চাঙ্গা করার উদ্যোগ নিয়েছে দলটি।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী কালবেলাকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এসব মতবিনিময় হচ্ছে। জামায়াত-শিবিরের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন করতেই সাবেকদের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে।
এদিকে গতকাল ধানমন্ডিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাবেক ছাত্রনেত্রীদের সঙ্গে এক বৈঠক হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আওয়ামী লীগের শিক্ষা সম্পাদক শামসুন্নাহার চাঁপা, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য মারুফা আক্তার পপি, যুব মহিলা লীগের সাবেক সভাপতি নাজমা আক্তার, যুব মহিলা লীগের সাবেক নেত্রী সাবিনা আক্তার তুহিন, শাহনাজ পারভীন ডলি, মনি, হালিমা আক্তার লাবণ্যসহ সাবেক নেত্রীরা এই বৈঠকে মিলিত হন। আওয়ামী লীগের হাতকে শক্তিশালী ও প্রাক্তনদের এক মঞ্চে নিয়ে কীভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়, সে সম্পর্কে আলোচনা হয়।
বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করে শামসুন্নাহার চাঁপা কালবেলাকে বলেন, ‘আমিও ছাত্রলীগ করেছি। যারা বৈঠকে উপস্থিত ছিল তারাও সাবেক ছাত্রলীগের নেত্রী। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতেই এই মতবিনিময় সভা।’
মারুফা আক্তার পপি কালবেলাকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই আমরা সাবেকরা বসেছিলাম। ঐক্যবদ্ধ থাকলে দেশের কোনো অপশক্তির ক্ষমতা নেই আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করতে পারে। আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। এজন্যই সাবেকদের সঙ্গে মতবিনিময়।’
এদিকে একই উদ্দেশ্যে সাবেক ছাত্রনেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। আজ (বুধবার) বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সকাল ১১টায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সাবেক ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ফোনে যোগাযোগ করে বৈঠকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন বলেন, ‘সম্প্রতি জামায়াতে-শিবির যে তাণ্ডব চালিয়েছে, তা মোকাবিলা করতেই দলের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠকের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করা হচ্ছে।’