রাজধানীর দক্ষিণ বনশ্রী আবাসিক এলাকা লাগোয়া মেরাদিয়া এলাকায় মো. মোহন ও তার বোন হাসনা বানুর পৈতৃক সম্পত্তি প্রায় ৩৩ শতাংশ। দীর্ঘ বছর ধরে দখলেও তাদের। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে শতাধিক লোক লাঠিসোটা নিয়ে সেখানে সাইনবোর্ড স্থাপন করেন ওই জমির মালিক পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি শফিকুল ইসলাম! খবর পেয়ে মোহন ও তার বোনসহ স্বজনরা ঘটনাস্থলে গেলে হামলার শিকার হন। বেশি বাড়াবাড়ি করলে গুম হওয়ার হুমকিও পান তারা।
পুলিশ কর্মকর্তার নামে টানানো সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে, ‘বায়না সূত্রে এই জমির মালিক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. শফিকুল ইসলাম, সিআইডি হেডকোয়ার্টার।’ সেখানে জমির তপশিল উল্লেখ করে পুলিশের ওই কর্মকর্তার মোবাইল নম্বরও জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, শফিকুল ইসলাম সিআইডির বরিশাল বিভাগের অতিরিক্ত ডিআইজি। বসেন রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি সদর দপ্তরে। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘আমি কারও জমি দখল করিনি। সাইনবোর্ডে বর্ণিত তপশিলে জমির মূল্য ৩৫ লাখ টাকা ধরে গত ১৪ সেপ্টেম্বর বায়না করেছি।’ অবশ্য স্থানীয়রা বলছেন, পুলিশ কর্মকর্তার সাইনবোর্ড টানানো জমির বর্তমান মূল্য কয়েক কোটি টাকা।
অতিরিক্ত ডিআইজি শফিকুল ইসলাম জমি বায়না করার কথা বললেও তিনি যেখানে নিজের মালিকানা দাবি করে সাইনবোর্ড স্থাপন করেছেন, সেই জায়গাটি তার তপশিলভুক্ত নয়। জমির একজন মালিক হাসনা বানু কালবেলাকে বলেন, ‘আমার বাসা ওই জমির কাছেই। রাত দেড়টার দিকে একশর বেশি লোক আমাদের জমির ওপর সাইনবোর্ড টানিয়েছে। আমি তাদের ফেরাতে গেলে আমার গায়ে হাত তোলে। আমার ছেলে, মেয়ের জামাইয়ের গায়েও হাত তুলেছে।’
হাসনা বানুর ভাই মো. মোহন বলেন, ‘আমরা তো জমি বিক্রি করিনি। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তা যে জমিতে সাইনবোর্ড বসিয়েছেন, এই জমির মালিক আমরা ভাইবোন। পুলিশ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম যে জমি কিনেছেন বলে দাবি করছেন, তা পেছনের অংশে। কিন্তু রাতের আঁধারে লোকজন নিয়ে আমাদের জমিতে সাইনবোর্ড লাগিয়েছেন।’
এই ভাইবোনের অভিযোগ, পাশে কিছু জমির বায়না করে তাদের ভালো জমি দখল করার জন্য পুলিশ কর্মকর্তা ভাড়াটে লোকজন দিয়ে সাইনবোর্ড বসিয়েছেন।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে জমিতে সাইনবোর্ডটি দেখা গেছে। সাইনবোর্ডে জমির তপশিল ও পরিমাণ উল্লেখ রয়েছে। তাতে দেখা যায়, ‘মৌজা মেরাদিয়া, জমির পরিমাণ ৬৯৬ অজুতাংশ, খতিয়ান নং সিএস ১২৫, এসএ ১৪২, আর এস ৩৭১, ঢাকা সিটি জরিপ নম্বর ৪১, দাগ নং সি-এস ও এস-এ ১০১৭, আরএস ১৮৯৫, ঢাকা সিটি জরিপ-৫৯২৪।’
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সাইনবোর্ডে যে খতিয়ান, দাগ নং ও জমির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে এবং সাইনবোর্ডটি যেখানে স্থাপন করা হয়েছে, এই জমির খতিয়ান বা দাগ নং এক নয়। সাইনবোর্ড থাকা জমিটির পরিমাণ ৩৩ শতাংশ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে দক্ষিণ বনশ্রীর ইস্টার্ন বনবীথি শপিং কমপ্লেক্সের (দশতলা মার্কেট) পেছনে জমিটি দখল করা হয়। সেখানে চিৎকার চেচামেচি হলে স্থানীয় অনেকে ঘটনাস্থলে যান। তবে পুলিশ কর্মকর্তার নামে সাইনবোর্ড দেখে এলাকার লোকজন সরে যান। অবশ্য রাতেই খিলগাঁও থানা পুলিশকে জানালে তাদের একটি টহল টিম আসে। তখন দখল করতে আসা লোকজন ঘটনাস্থল থেকে চলে যান। কিন্তু সাইনবোর্ডটি রয়ে গেছে।
নিজের জমি হলে রাতের আঁধারে কেন সাইনবোর্ড বসাতে গেলেন—জানতে চাইলে অতিরিক্ত ডিআইজি শফিকুল ইসলাম দাবি করেন, ‘রাতে নয়, তিনি সন্ধ্যায় সাইনবোর্ড বসিয়েছেন।’
খিলগাঁও থানা পুলিশ বলছে ভিন্ন কথা। খিলগাঁও থানার ওসি মনির হোসেন মোল্লা কালবেলাকে বলেন, ‘রাত দেড়টা থেকে ২টার দিকে জমির মালিক মোহন সাহেব আমাকে কল করেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে একটা টিম পাঠাই। তখন জমিতে লোকজন ছিল। সাইনবোর্ডও বসানো হয়ে গেছে। আমরা পরে দুই পক্ষকে কাগজ নিয়ে বসতে বলেছি।’
মন্তব্য করুন