

বহু বছর পর এক ভিন্ন আবহে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দীর্ঘদিন ধরে কোণঠাসা থাকা জামায়াতে ইসলামী এবারের নির্বাচনে চমক সৃষ্টির লক্ষ্যে অগ্রসর হচ্ছে। দলটির দায়িত্বশীল মহল মনে করছে, তারা সরকার গঠন করবে। ফলে ক্ষমতায় গেলে পাঁচ বছর রাষ্ট্র পরিচালনায় কী কী করবেন, সে বিষয়ে একটি আধুনিক, যুগোপযোগী ও আকর্ষণীয় নির্বাচনী ইশতেহার চূড়ান্ত করেছে জামায়াতে ইসলামী। যাদের আত্মত্যাগ ও আন্দোলনের মাধ্যমে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, সেই তরুণ প্রজন্ম তথা ‘জেন-জি প্রত্যাশিত ইশতেহার’ প্রণয়ন করবে দলটি।
জামায়াতের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের ইশতেহারে শিক্ষা, চিকিৎসা, রাষ্ট্র সংস্কার, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি দমনসহ ৪১টির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। একই সঙ্গে আইসিটি ও ‘ভিশন ২০৪০’-এর মতো বিষয়কেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দেশ-বিদেশের ৩০ জন বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে কয়েক দফা বৈঠকের পর ইশতেহারের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। এরপর জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভায় চূড়ান্ত অনুমোদন হয়েছে। ইশতেহার বই আকারে ছাপানোর কাজও শেষ পর্যায়ে। আগামীকাল মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জাতির সামনে ‘চলো এক সাথে গড়ি বাংলাদেশ’ শিরোনামে এই ইশতেহার উপস্থাপন করা হবে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট খাতের ওপর পলিসি পেপারও তৈরি করেছে জামায়াতে ইসলামী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্ষমতায় গেলে দেশ পরিচালনার সার্বিক বিষয় মাথায় রেখেই জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করেছে। সেই সঙ্গে তাদের ইশতেহার বা অঙ্গীকার কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তারও রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে। সুন্দরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সরকার গঠনের পর প্রথম একশ দিনে কী করা হবে, বছরওয়ারী এবং পাঁচ বছরে কী কী করা হবে, তারও উল্লেখ থাকবে ইশতেহারে। মোট ৪১টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে অনেকগুলো উপবিষয়ও তৈরি করেছে দলটি। বিশেষ করে দুর্নীতি দমনের লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক এবং বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে ইশতেহারে পরিকল্পনাগুলো সাজানো হয়েছে। এজন্য দেশে-বিদেশে অবস্থানরত বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের অধিকারী ৩০ জনকে দায়িত্ব দিয়েছে জামায়াত। যারা একটি মানসম্মত ইশতেহারের খসড়া তৈরি করে দলের শীর্ষ নেতাদের কাছে জমা দেন।
কী থাকছে ইশতেহারে: দুর্নীতি নির্মূল, উন্মুক্ত বাজার অর্থর্নীতি চালু ও সম্প্রসারণ, স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড চালু, ব্যবসাবান্ধব পলিসি তৈরি করা, গ্র্যাজুয়েটদের সুদমুক্ত ঋণ (কর্জে হাসানা), মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ, স্বাস্থ্যসেবার আমূল পরিবর্তনসহ ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাজানো হয়েছে জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার।
সংস্কার: অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন থেকে সংস্কারের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা গণভোটের অপেক্ষায় রয়েছে। জামায়াতসহ ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে এবং জামায়াত সরকার গঠন করতে পারলে সেগুলো সংবিধানে যুক্ত হবে এবং বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেবে।
শিক্ষা: গতানুগতিকতার বাইরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যুগোপযোগী ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর করতে চায় জামায়াত। উন্নত জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয়ের সঙ্গে কর্মমুখী শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে চায় দলটি। যাতে দেশে কোনো শিক্ষিত বেকার তৈরি না হয়, সেজন্য নেওয়া হবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি গড়ে তোলা, দেশে উন্নত গবেষণাগার তৈরি, জনগণকে ইসলামী ও বিজ্ঞানমনস্ক করার নানা পরিকল্পনা রয়েছে ইশতেহারে। এ ছাড়া চাকরি পাওয়া পর্যন্ত ৫ লাখ গ্র্যাজুয়েটকে সর্বোচ্চ দুই বছর মেয়াদি মাসিক সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ, মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে এক লাখ শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত শিক্ষাঋণের মতো বিষয় উল্লেখ থাকবে।
কর্মসংস্থান: জামায়াত মনে করে, বেকার ভাতা দেওয়ার চেয়ে বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। তাতে সবার সম্মান ও দেশের অর্থনীতি উন্নত হয়। এজন্য কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার, নতুন নতুন কলকারখানা তৈরি, ব্যাংক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কর্মীদের উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠানোসহ থাকবে নানা পরিকল্পনা। বিশেষ করে দক্ষ জনশক্তি ও জব প্লেসমেন্টের জন্য নতুন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করার ঘোষণা আসতে পারে। এমনকি পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে বাজারভিত্তিক স্কিল প্রশিক্ষণ দেওয়া, প্রতি উপজেলায় ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ ও ‘জেলা জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠনের কথাও থাকবে। পাশাপাশি নারী, তরুণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়ে ৫ লাখ উদ্যোক্তা তৈরি এবং ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরি কথাও থাকবে ইশতেহারে।
দুর্নীতি দমন: জামায়াতের ইশতেহারের অন্যতম দিক থাকবে দুর্নীতি দমন বা নির্মূল। জামায়াতের দলীয় অবস্থান হলো—দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা। দলটি মনে করে, দুর্নীতির কারণে দেশ পিছিয়ে পড়ছে। দেশের সম্পদের কোনো অভাব নেই; কিন্তু তার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। দুর্নীতির কারণে দেশ থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে তা দেশে থাকলে নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, কমে যাবে মূল্যস্ফীতি। দেশের সর্বত্র সুশাসন কায়েম হলে জনগণ শান্তিতে থাকতে পারবে।
অর্থনীতি: জামায়াতে ইসলামী চায় বাংলাদেশ একটি আধুনিক বাজার অর্থনীতি হিসেবে গড়ে উঠুক। দলটি ইতোমধ্যে সরকারের বাইরে থেকেই দেশে একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। জামায়াতের নেতাদের উদ্যোগে ইসলামী ব্যাংক, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, এতিমখানাসহ নানা ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। দল পরিচালনায়ও জামায়াত অর্থনৈতিকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। একইভাবে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় দলটি। বিশেষ করে ব্যাংকের সুষ্ঠু পরিচালনা, অর্থ পাচার এবং ঘুষ-দুর্নীতি রোধ, রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধি, জাকাতভিত্তিক অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়াসহ থাকবে একঝাঁক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
সংখ্যালঘু: জামায়াত মনে করে, দেশে কোনো সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু নেই। সব নাগরিক দেশে সমান নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করবে। জামায়াত বিজয়ী হলে দেশে কেউ সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে নির্যাতিত হবে না। ব্যক্তিগত কোনো অপরাধ করে থাকলে সেটা মুসলিম-হিন্দু-খ্রিষ্টান সবার ক্ষেত্রেই আইন একই গতিতে চলবে। নির্বাচনী ইশতেহারে বিষয়টি পরিষ্কার করে তুলে ধরবে জামায়াত।
নারী: ‘নারী নেতৃত্ব হারাম’সহ নানা ইস্যুতে জামায়াতকে নারীদের স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে প্রচারণা থাকলেও দলটির নেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। জামায়াত ক্ষমতায় এলে নারীরা দেশে সম্মান ও নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস করবে বলে মনে করেন দলটির নেতারা। তারা বলছেন, বর্তমানে জামায়াতের যারা রাজনীতি করছেন তার অর্ধেকই নারী এবং শিক্ষিত। জামায়াতের মহিলা শাখা রয়েছে। ছাত্রীদেরও একটি সংগঠন রয়েছে যেখানে মেয়েরা নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাছাড়া জামায়াতের নারী নেত্রীরা বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার রয়েছেন। ফলে জামায়াত কখনো নারীদের উন্নয়নে বাধা নয়, বরং সহায়ক হবে। এজন্য নারীদের নিরাপত্তা ও সম্মান, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইশতেহারে উল্লেখ থাকবে। এ ছাড়া কর্মজীবী মায়েদের জন্য কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার বিষয়ে এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন দলটির আমির শফিকুর রহমান।
কৃষি: দেশের অর্থনীতির প্রায় ৭০ ভাগ আসে কৃষি খাত থেকে। এজন্য এ খাত নিয়ে জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে। কৃষক যাতে সার, কীটনাশক নিয়ে সমস্যায় না পড়েন, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান, সড়কে পণ্যবাহী ট্রাক যেন চাঁদাবাজির শিকার না হয় ইত্যাদি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ইশতেহারে।
স্বাস্থ্য: স্বাস্থ্য খাত নিয়ে ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী, যা নির্বাচনী ইশতেহারে তুলে ধরা হবে। দেশ পরিচালনায় সব স্বাস্থ্য খাতকে রোগীবান্ধব করার উদ্যোগ, দুর্নীতিমুক্ত করা, সহজে ও স্বল্প ব্যয়ে চিকিৎসাসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে ইশতেহারে। বিশেষ করে ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক ও ৫ বছরের নিচে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা, ৬৪ জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা, ‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেইজ প্রোগ্রাম’র আওতায় গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর বয়স দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাকে সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও উল্লেখ থাকার কথা।
সংস্কৃতি: জামায়াতের নেতারা জানান, অনেকেই বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশের সংস্কৃতি জগতের লোক বেকার হয়ে যাবে। নাটক-সিনেমা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিনোদনজগৎ বাধাগ্রস্ত হবে। এসব অপপ্রচার ছাড়া কিছুই না। জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশের সংস্কৃতিজগৎ আরও সমৃদ্ধশালী ও রুচিসম্মত হবে। জামায়াত কোনো জগতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। যার যার যে অবস্থান আছে সেখানে তারা দেশ ও জাতির জন্য কাজ করতে পারবে। সিনেমা-নাটক, বিনোদন সবই থাকবে। জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে এসব বিষয়ও উল্লেখ থাকছে।
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং নির্বাচন পরিচালনায় দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের কালবেলাকে বলেন, মন্ত্রণালয় ও বাস্তবভিত্তিক খাতগুলো ধরে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করা হয়েছে। এ জন্য দেশে ও বিদেশে থাকা ৩০ জন বিশেষজ্ঞকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এতে ৪১ বিষয়কে প্রাধান্য এবং এর উপ-বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা বলেছিলাম ১ ফেব্রুয়ারি ইশতেহার ঘোষণা করবো। কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ তৃণমূল সফরে ব্যস্ত থাকায় সেটি বিলম্ব হলো।
মন্তব্য করুন