

পরিবেশবান্ধব দেশ গড়ে তুলতে পরিবেশবান্ধব যানবাহন ব্যবহারে উৎসাহিত করছে সরকার। সরকারপ্রধানের নির্দেশনায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ইলেকট্রিক ভেহিক্যালে (ইভি) দেওয়া হচ্ছে সুবিধা, যাতে পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি দেশে গাড়ি উৎপাদিত হয় এবং কর্মসংস্থান তৈরি হয়। এখানে অনেকটা বিপরীতমুখী অবস্থানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন আমদানি নীতি আদেশ।
মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা নতুন আমদানি নীতি আদেশের খসড়ায় ১০ বছরের পুরোনো ইভি আমদানির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে দেশে ‘ডিজাস্টার’ বা বিপর্যয় দেখা হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, এতে দেশকে পুরোনো ব্যাটারি ডাম্পিং স্টেশন হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হবে। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, কার স্বার্থে পুরোনো গাড়ি আমদানির সুযোগ রাখছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। শুধু ইভি নয়, নতুন এ আদেশে আরও জটিল করে তোলা হচ্ছে পণ্য আমদানি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাস্তায় ফিটনেস ছাড়া গাড়ি চালানোর সুযোগ নেই। কিন্তু দেশের রাস্তায় বের হলেই মেলে শত শত ফিটনেসবিহীন গাড়ির সন্ধান। যদিও দেশের গাড়ির ফিটনেস পাওয়া নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব যানবাহন ব্যবহারে উৎসাহিত করছেন। তার প্রমাণ মেলে রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন প্রজ্ঞাপনে।
এরই মধ্যে এনবিআর পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক স্কুল বাস আমদানিতে শুল্ক-কর অব্যাহতি দিয়েছে। এ ছাড়া আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল আমদানিতে শুল্ক-কর ছাড়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত আসছে। এ ছাড়া এসব গাড়ির আয়করেও থাকছে ছাড়। কিন্তু উল্টো পথে তৈরি হচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি নীতি আদেশ। বর্তমান আদেশে ৫ বছরের অধিক পুরোনো গাড়ি আমদানির সুযোগ না থাকলেও নতুন আমদানি নীতির খসড়ায় ১০ বছরের পুরোনো ইভি আমদানির সুযোগ রাখা হচ্ছে।
যেখানে তেলের গাড়ি ৫ বছরের অধিক আমদানির সুযোগ নেই, সেখানে ১০ বছরের পুরোনো ইভি আমদানি সুযোগ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কার স্বার্থে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ সুযোগ রাখছে, সেই প্রশ্ন উঠছে। এ ছাড়া ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারি সাধারণত সাত আট বছরের বেশি টেকে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন পর্যন্ত ইলেকট্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদাহরণ বাংলাদেশে নেই বললেই চলে। এর মধ্যে ১০ বছরের পুরোনো ইভি আমদানির সুযোগ দিলে ‘ডিজাস্টার’ হবে। নতুন করে পুরোনো ব্যাটারির ডাম্পিং স্টেশন হবে বাংলাদেশ। তারা বলছেন, বাতিল ব্যাটারিতে পরিবেশগত ঝুঁকি রয়েছে। কারণ বাংলাদেশে বৃহৎ পরিসরে বা পর্যাপ্ত ইভি ব্যাটারি রিসাইকেলিং অবকাঠামো গড়ে উঠেনি। এ ছাড়া দেশে ইভি শিল্প গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে দশ বছরের পুরোনো ইভি আমদানি বড় বাধা হবে বলেও মনে করেন তারা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিয়াউর রহমান খান কালবেলাকে বলেন, ১০ বছরের পুরোনো ইভি আমদানির সুযোগ দিলে ডিজাস্টার হবে। কারণ হিসেবে এ অধ্যাপক বলেন, সাধারণত ইভির ব্যাটারি আট বছরের বেশি টেকে না। তাই পুরোনো গাড়ির ব্যাটারির ডাম্পিং স্টেশন হিসেবে ব্যবহার হবে বাংলাদেশ।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি বাজেট সংক্রান্ত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে শিল্প উদ্যোক্তাদের সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পলিসি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ দেশে ইভি উৎপাদনে উৎসাহের বদলে পুরোনো গাড়ি আমদানির সুযোগ রাখা হচ্ছে আমদানি নীতি আদেশে। শুধু ইভি নয়, আরও জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে আমদানি বাণিজ্যে।
আমদানি নীতি আদেশের পণ্য আমদানির সাধারণ শর্তাবলিতে বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত আমদানিযোগ্য পণ্য সংশ্লিষ্ট শর্ত পালন করে আমদানি করা যাবে। এ ছাড়া আমদানিযোগ্য সব পণ্য খালাসের জন্যও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ক্লিয়ারেন্স পারমিটের (সিপি) ভিত্তিতে খালাসযোগ্য হবে। অর্থাৎ আমদানি করা সব পণ্য খালাসে লাগবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিপি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবাধে আমদানিযোগ্য সব পণ্য খালাসে সিপি বাধ্যতামূলক হলে জটিলতা বাড়বে। সেইসঙ্গে পণ্য খালাসে বাড়বে সময়। এ ছাড়া বর্তমান আমদানি নীতি আদেশে নতুন কোনো পণ্য সংযুক্ত করতে গণবিজ্ঞপ্তি জারির বিধান রয়েছে। নতুন খসড়ায় বিষয়টি এড়িয়ে আরও জটিল করে তোলা হয়েছে।
নতুন করে দেশের যে কোনো দপ্তর আইন করলে, তার ভিত্তিতে পণ্য খালাস করতে হবে। এতে দেশের সব দপ্তরের আইন একজন আমদানিকারক ও কর্মকর্তাকে জানতে হবে, যা বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বিষয়টি নিয়ে জানতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খানের মোবাইল ফোনে কল করলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে কেটে দেন। পরে ইভি আমদানি এবং আমদানি নীতি আদেশ সংক্রান্ত আদেশের বিষয়টি উল্লেখ করে খুদে বার্তা পাঠিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।