মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের সংখ্যা ব্যাপক। দেশটিতে ২০১১ সালে যে সংঘাত শুরু হয়েছিল, তা আজও চলছে। এর ফলে দেশটি দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকটে পড়েছে। এ গৃহযুদ্ধে পৌনে চার লাখ ইয়েমেনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে আড়াই লাখ মানুষ সরাসরি সংঘাতে মারা গেছেন। অন্যদের ক্ষুধা ও রোগে মৃত্যু হয়েছে। এ যুদ্ধ দেশটির অবকাঠামো ও জনসেবাকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে। আসলে এ সংঘাত কেন শুরু হয়েছিল, প্রভাবশালী পক্ষ হুতিরা কীভাবে শক্তিশালী হলো, এ প্রতিবেদনে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানব।
ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ কীভাবে শুরু হলো, তা জানতে হলে প্রথমে হুতিদের সম্পর্কে জানতে হবে। এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী দেশটিতে আনসারুল্লাহ নামেও পরিচিত। তাদের উত্থান নব্বই দশকে। তাদের নেতা হুসেইন আল-হুতি শিয়া ইসলামের জাইদি ধারার অনুসরণে ধর্মীয় পুনর্জাগরণমূলক আন্দোলন শুরু করেন।
হুতিরা যেভাবে ক্ষমতায়: ১৯৯০ সালে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন একত্রিত হলে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন আলি আবদুল্লাহ সালেহ। তিনি প্রথমদিকে হুতিদের সমর্থন করতেন। তবে আন্দোলনটি জনপ্রিয় ও শাসকবিরোধী হয়ে উঠতে থাকায় তা সালেহের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে সমর্থন দেন সালেহ, যদিও ইয়েমেনের অধিকাংশ জনগণ ছিল এর বিরুদ্ধে। এ সুযোগে বিক্ষোভ করেন হুতিরা।
ইয়েমেনি সেনারা ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে আল-হুতিকে হত্যা করে, তবে আন্দোলনটির মৃত্যু হয়নি। হুতিদের সামরিক শাখায় ইয়েমেনি তরুণরা দলে দলে যোগদান করে। ২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’র ঝড় নাড়িয়ে দেয় ইয়েমেনকেও। হুতিরা দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ সাআদা দখলে নিয়ে সালেহর শাসনের অবসানের দাবি করে।
যেভাবে শুরু গৃহযুদ্ধ: ২০১১ সালে সালেহ উপরাষ্ট্রপতি আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি হন, তবে সে সময় তার সরকারের আর তেমন জনপ্রিয়তা ছিল না। স্থিতিশীলতার স্বার্থে মীমাংসা অনুযায়ী সালেহ হাদির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ২০১৪ সালে রাজধানী সানার বিভিন্ন অংশ দখলে নেয় হুতিরা। পরের বছরের শুরুতে তারা রাষ্ট্রপতির বাসভবনও দখল করে নেয়।
হাদি সৌদি আরবে পালিয়ে যান। তার অনুরোধে ২০১৫ সালের মার্চে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে সৌদি আরব। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরান পাশের দেশে হাত বাড়াচ্ছে—এ আশঙ্কায় রিয়াদের নেতৃত্বে সাতটি সুন্নি আরব দেশ হুতিদের ওপর বিমান হামলা শুরু করে। অস্ত্র এবং গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে তাদের সমর্থন জোগায় যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স। কয়েক বছর ধরে এ যুদ্ধ চলে।
অবশেষে ২০২২ সালে এসে উভয়পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। ছয় মাস পর সেই চুক্তি ভেঙে গেলেও তারা আগের মতো আর তুমুল যুদ্ধে জড়ায়নি। তবে গৃহযুদ্ধ থামেনি।
জাতিসংঘ জানায়, ইয়েমেন যুদ্ধ পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুতর মানবিক বিপর্যয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, এ যুদ্ধে প্রায় আড়াই লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকে হুতিরা ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ জায়গা থেকে তাদের দখল ছেড়ে দিয়েছে। তারা সৌদি আরবের সঙ্গে স্থায়ী চুক্তিতে যেতে চাইছে, যাতে করে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে ও তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারে।
মন্তব্য করুন