বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে, গত কয়েক দিনে হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে। এখনো রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের নতুন নতুন খবর সংবাদপত্রে প্রকাশ পাচ্ছে। এটা বোঝা যাচ্ছে যে, ক্ষতির মাত্রা বুঝতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। এ বিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে আতঙ্কবাদীদের করা ধ্বংসযজ্ঞে দুই ধরনের ক্ষতি হয়েছে—একটি স্বল্পমেয়াদি, আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি। এ ক্ষতি পূরণ কারা করবে? কীভাবে করবে? কোথা থেকে এ ক্ষতিপূরণ করার টাকা আসবে? এ দেশের একজন উদ্যোক্তা হিসেবে মনে করি, এ টাকাটা আমার মতো রাষ্ট্রের জনগণের মূল্যবান ট্যাক্স থেকেই খরচ হবে। যারা এ ক্ষতি করেছে, তারা কি ট্যাক্স দিয়ে থাকেন? দিয়ে থাকলে, তাদের পকেট থেকেও কেটে রাখা হবে এ টাকা। কিন্তু আমার মনে হয় না তারা রাষ্ট্রকে ট্যাক্স দিয়ে থাকেন। তাই হয়তো রাষ্ট্রের সম্পদের ক্ষতি করার আগে এবং ক্ষতি করার নির্দেশ দেওয়ার আগে চিন্তাও করেননি কী ক্ষতি অপেক্ষা করছে জনগণের জন্য।
স্বল্পমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সন্ত্রাসবাদীদের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এবং ইনফরমেশন টেকনোলজি খাত, স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষা খাত, জ্বালানি খাতসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সরকার হয়তো ক্রাইসিস ফান্ড থেকে এ ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবে। কিন্তু এ ফান্ডের জন্য যদি দেশের বাইরের ঋণের দিকে ঝুঁকতে হয়, তাহলে তা চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। এই বৈশ্বিক ক্রাইসিসের যুগে যেসব বিদেশি শক্তি বাংলাদেশকে ফান্ড দিতে চাইবে, তারা তা সুদে-আসলে ফেরত নেওয়ার পাশাপাশি বেকায়দা ধরনের শর্ত দিয়ে বসতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। এটা কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশ সরকারের অনেক সময় লাগবে। চীন বনাম মার্কিন, রাশিয়া বনাম ইউক্রেন, ইসরায়েল বনাম ইরান-ফিলিস্তিন যুদ্ধে, ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে, আফ্রিকার অস্থিতিশীল অবস্থায় অনেক আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছিল। বাংলাদেশের অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার উন্নয়ন একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করেছিল। কিন্তু গত কয়েক দিনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে বড় ধরনের কিছু ধাক্কা খেতে পারে। বিশেষ করে আইটি খাত।
আমি একজন আইটি উদ্যোক্তা। আমার ইঞ্জিনিয়াররা ইউরোপের সবচেয়ে বড় ক্রাউড ফান্ডিং কোম্পানির আইটি ডিপার্টমেন্টকে সেবা দিয়ে থাকেন। গত কয়েক বছরে আমি প্রায় ২০ কোটি টাকার প্রজেক্ট নিয়ে এসেছিলাম দেশে। বিদেশি ওই কোম্পানির সঙ্গে যতটুকু চুক্তি বাকি আছে, তাতে আরও অন্তত ৭-৮ কোটি টাকার আমেরিকান ডলার নিয়ে আসতে পারব। যদিও দেশের অর্থনীতিতে এটা খুবই ছোট অবদান, তবে আমাদের মতো ফার্মগুলোর জন্য এটা অক্সিজেনতুল্য। যেহেতু আমরা ক্লায়েন্টকে কাজ নেওয়া ও বুঝিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল, সেহেতু ইন্টারনেট না থাকলে আমরা একেবারেই অচল। যে ব্যক্তিরা দেশের ডাটা সেন্টারের ওপর আক্রমণ করেছে, তারা কি বোঝে যে এ আক্রমণ আমাদের জনগণের পেটে লাথি মারার সমতুল্য? আমাদের ক্লাউড বেইজড ক্লায়েন্ট যদি তাদের ব্যবসা রক্ষার্থে অন্য কোনো দেশের কোনো ফার্মের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়, তাহলে আমাদের হাই-পেইড ইঞ্জিনিয়ারদের বেতন দেব কীভাবে!
আমার ফার্ম যদি বন্ধ হয়ে যায়, সেই ইঞ্জিনিয়াররা স্বভাবতই চাকরি হারাবেন। শুধু আমার ফার্ম কেন! এরকম অবস্থা আমার ফার্মের মতো অন্য ইন্টারনেট বেইজড প্রতিষ্ঠানগুলোরও! সঙ্গে সঙ্গে রয়েছেন লাখ লাখ আউটসোর্সার! তাদের কথাও আমাদের চিন্তা করতে হবে যে! যারা আউটসোর্সিং করেন, এমন একজন আমাকে কান্নার সুরে জানালেন, তার সোমবার দুপুরে প্রজেক্ট সাবমিশন ছিল। তিনি এখন কী করবেন! তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে—ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করা ছাড়া কি আর কোনো উপায় ছিল না?
কয়েক সপ্তাহ আগেই, যুক্তরাষ্ট্রে ছাত্র বিক্ষোভ হয়েছে। ফিলিস্তিন ইস্যুতে হওয়া সেই ছাত্র বিক্ষোভ সেই দেশকে তছনছ করে দিয়েছিল। শিক্ষার্থীদের ওপর সেই দেশের পুলিশ সহিংস আক্রমণ করেছে। প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে শিক্ষার্থীরাও কিছু ক্ষেত্রে সহিংস হয়ে উঠেছিল। ইন্টারনেট জুড়ে সেসবের ছবি ও ভিডিও পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র সরকার কি তখন ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছিল? ইরানেও এরকম অনেক ছাত্র বিক্ষোভ চলে। পাকিস্তানেও হয়েছে। এ দুই দেশের সরকার অবশ্য শিক্ষার্থীদের ওপর ক্র্যাকডাউনের আগে ইন্টারনেট সংযোগের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কেন পশ্চিমা দেশগুলোর ভালো উদাহরণগুলো অনুসরণ না করে এশিয়ার দেশগুলোর বাজে উদাহরণ অনুসরণ করতে গেলাম? কী হতো আমরা যদি পশ্চিমা দেশগুলোর ভালো উদাহরণ অনুসরণ করে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ না করতাম?
প্রথমেই ভালো দিকটা নিয়ে আলোচনা করা যাক—
১. সারা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াত না।
২. সারা দেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো হোম বেইজড থেকে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারত।
৩. আতঙ্কবাদীদের সন্ত্রাস দেখতে পেয়ে দেশের মানুষ সাবধান হয়ে যেত।
৪. দেশের অর্থনৈতিক চাকা চালু থাকত।
৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলা থেকে অনলাইন ক্লাস চালিয়ে যেতে পারত। ফলে এতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ফিরে আসার একটি তাগিদ সৃষ্টি হতো।
৬. পুলিশ ও হেলমেট বাহিনী তাদের অ্যাকশনে আরও বেশি সাবধান হতো।
এবার ইন্টারনেট সংযোগ চালু রাখার খারাপ দিকের একটু আলোকপাত করি—
১. শিক্ষার্থীরা সারা দেশে তাদের যোগাযোগ অব্যাহত রাখত। উত্তেজনা কমতে একটু সময় লাগত। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শিক্ষার্থীরা সহিংস আন্দোলন সমর্থন করে না।
২. সন্ত্রাসীরা চারদিকে তাদের কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে দিত। কিন্তু কারফিউ জারি করে সেনাবাহিনী নামালেই তা করে যেত, এখন যেমন একদম বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
৩. পুলিশ ও হেলমেট বাহিনীর অ্যাকশন দেখে বিক্ষোভ চারদিকে আরও ছড়িয়ে পড়ত। কিন্তু দেশপ্রেমিক সামরিক বাহিনীর উপস্থিতিতে একমাত্র বহিরাগত সন্ত্রাসী ছাড়া আর কেউই রাস্তায় সন্ত্রাস করার সাহস পেত না।
ওপরের আলোচনা থেকে তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, ইন্টারনেট সংযোগ চালু রাখলে মন্দের চেয়ে ভালোই হতো বেশি। এই যখন অবস্থা, সরকার ভবিষ্যতে কী করতে পারে? আমার মতে, কেন্দ্রীয় ডাটা সেন্টারকে কয়েক ভাগে ভাগ করে কোনো আর্মি ক্যান্টনমেন্টে সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে। তাতে আমাদের ইন্টারনেট ব্যাকবোন অনেক নিরাপদ থাকবে। এ ছাড়া ডাটা সেন্টারের সেবা বিভিন্ন ফেজে ভাগ করে যেসব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনেট লাগবেই, সেরকম ফার্মের জন্য আলাদা ফেজ করে দিতে পারে সরকার। সব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ইন্টারনেট খুব প্রয়োজনীয় নয়। সেজন্য ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বার্থে সারা দেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে—হাই প্রায়োরিটি, মিডিয়াম প্রায়োরিটি ও লো প্রায়োরিটি। দেশের জরুরি পরিস্থিতিতে, প্রায়োরিটির ওপর নির্ভর করে সব প্রতিষ্ঠানে আলাদা করে ইন্টারনেট সংযোগ চালু রাখা যেতে পারে। তা ছাড়া আমার ফার্মের ইঞ্জিনিয়ারদের মতো ল্যাপটপ ব্যবহার করা ডেভেলপার এবং আউটসোর্সারদের জন্য সরকার আলাদা জরুরি ইন্টারনেট সেবা সেন্টার খুলতে পারে, যেখানে ভিসেটের মাধ্যমে ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক থাকবে। এই সেন্টারগুলো ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে ফিস নিতে পারে। এগুলো ছাড়া আইটি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য জরুরি পরিস্থিতিতে ইলন মাস্কের স্টারলিঙ্কের মতো প্রতিষ্ঠানের সেবা নিতে অনুমতি দিতে পারে।
আমি বিশ্বাস করি, দেশ ও তার সম্মান রক্ষা করা আর সব কাজের মধ্যে অগ্রাধিকার পাবে। যারা দেশের ইন্টারনেট ব্যাকবোনের ওপর আক্রমণ করে সরকারকে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করতে বাধ্য করেছে, তারা হয় না বুঝে করেছে অথবা তারা দেশের প্রথম শ্রেণির শত্রু। এ মানুষগুলোর অন্যায় কাজের জোর প্রতিবাদ করছি এবং তাদের সমাজের কথা চিন্তা করার তথা দেশের জনগণের স্বার্থে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।
লেখক: আইটি উদ্যোক্তা
ইমেইল: [email protected]