স্বামী বিবেকানন্দ মানবজাতিকে শিক্ষা সম্বন্ধে বলতে গিয়ে একটা প্রশ্ন রেখেছিলেন, ‘যে শিক্ষা দ্বারা ইচ্ছাশক্তির বেগ ও স্ফূর্তি নিজের আয়ত্তাধীন ও সফলকাম হয় তাহাই শিক্ষা। আর যে শিক্ষার ফলে এই ইচ্ছাশক্তি ক্রমাগত বংশানুক্রমে বলপূর্বক নিরুদ্ধ হইয়া এক্ষণে লুপ্তপ্রায় হইয়াছে, যাহার শাসনে নতুন ভাবের কথা দূরে থাক, পুরাতনগুলোই একে একে অন্তর্হিত হইতেছে, যাহা মানুষকে ধীরে ধীরে যন্ত্রের ন্যায় করিয়া ফেলিতেছে সে কি শিক্ষা?’
স্বামীজির সেই তত্ত্ব কথাটি আজ কদিন ধরে মনে ঘুরপাক খাচ্ছে বলে ছোটবেলায় স্কুল থেকে পুরস্কার পাওয়া ডেল কার্নেগি সিরিজের পড়া বা শিখাগুলো আবার পড়ে দেখতে ইচ্ছে হলো। এখন এই সিরিজের দুটি বই; যথাক্রমে ‘হাউ টু উইন ফ্রেন্ড অ্যান্ড ইনফ্লয়েন্স পিপল’ ও ‘ডেভেলপমেন্ট অব পার্সোনালিটি অ্যান্ড ইজি ওয়ে টু সাকসেস’ হাতের কাছে পেলাম বলে পড়ে দেখার লোভ হলো। তার সঙ্গে এই প্রজন্মের পড়ুয়া তরুণ প্রজন্ম যে সব বইকে গুরুত্ব দিয়ে পড়ে যেমন ব্রাজিলীয় ঔপন্যাসিক পাওলো কোয়েলহোর আন্তর্জাতিক বেস্ট সেলার বই ‘দ্য আলকেমিস্ট’, হ্যাল এলরড এর ‘দ্য মিরাকল মর্নিং’, থিবো মেরিসের ‘ডোপামিন ডিটক্স’ এ রকম কিছু বই পড়ে দেখলাম।
ছোটবেলায় বইগুলোর কয়েকটা পড়া ছিল, পড়ে হয়তো কিছু টেকনিক বা তথ্য জেনেছিলাম; কিন্তু জ্ঞান বলে যে জিনিস সেটা গ্রহণ করতে পারিনি। কারণ, জীবনে যে শেখাকে কাজে লাগানো যায় না তাকে জ্ঞান বলা যায় না, কিছু খুঁটিনাটি তথ্য জমা হয়েছিল হয়তো। প্রয়োগের চর্চা তেমন হয়নি বলে সেসব ক্ষেত্রে স্বামীজির তত্ত্বটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এখন যন্ত্রনির্ভরতায় সার। অনেকটা কবির কথার মতো ‘গ্রন্থগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন,/নহে বিদ্যা, নহে ধন হলে প্রয়োজন’। আসলে যে কোনো বইকে যতবার পড়া হয়, ততবার করে এক একটি নতুন বোধের ধারণা জন্মে। আর সেই ধারণাগুলোকে মানুষ নিজের চর্চায় রাখতে পারলে সেই পাঠকের জ্ঞানের গভীরতা বৃদ্ধি পায়।
ডেল কার্নেগির বই পাঠ করে আমি কাজে লাগাতে না পারলেও বিশ্বের অনেক সাকসেসফুল মানুষ এই বইকে আঁকড়ে ধরে সফলতার শীর্ষে পৌঁছেছেন। ‘হাউ টু উইন ফ্রেন্ড অ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপল’ বইটিতে অনেক কৌশল বাতলানো আছে যেমন—কীভাবে নিজেকে অন্যের কাছে চট করে ভালো লাগানোর কৌশল, অন্যকে স্বমতে আনার কৌশল, তর্কে জেতার শ্রেষ্ঠ উপায়, অন্যের কাছে নিজেকে পছন্দনীয় করে তোলার কৌশল। এসব কৌশলে ভরা আছে বইটি। এটি আসলে অনেকটা আমেরিকান মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে চলমান কৌশল। তবে বিশ্বায়নের এই যুগে সবাই এখন বিশ্বসংস্কৃতির অংশীদার। সহজ-সরল মানুষের উপযোগী কিছু বিষয় আছে মুগ্ধ হওয়ার মতো যেমন—জনসংযোগের কৌশল, কখনো অন্যের সমালোচনা না করার বিষয়, অপরের প্রতি ব্যবহার রহস্য, অন্যকে সঙ্গী করার সুফল, ভালো বক্তা হওয়ার কৌশল, ভুল করে থাকলে তা স্বীকার করার সাহস রাখা, শুভবুদ্ধির পথ ধরে এগিয়ে চলা, অভিযোগের সাবধানতা, অন্যদের উৎসাহী করার পদ্ধতি ইত্যাদি যে কোনো জায়গার যে কোনো বয়সের মানুষের জন্য মূল্যবান শিক্ষা এখানে রয়েছে।
অসংখ্য উদাহরণ এর দ্বারা বইটি লেখা হয়েছে, যেমন—যে কাউকে লেখক ভদ্র এবং বিনয়ী হতে বলছেন কারণ, তিনি ব্যাখ্যার মাধ্যমে বুঝিয়েছেন যে নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই, তাই অন্যকে সবসময় বলতে দিন, আর সেসব বলা কথা আপনি গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকুন। বিখ্যাত দার্শনিক হেনড্রিক্সের একটি কথা আছে—‘জ্ঞানীরা বলেন আর প্রাজ্ঞরা শোনেন’, তাই লেখক প্রাজ্ঞতাকে সমর্থন দিয়েছেন। তিনি আরও বলছেন, আপনি যদি শত্রু বাড়াতে চান, তাহলে বন্ধুদের অতিক্রম করুন, আর যদি বন্ধু বাড়াতে চান, তবে তাদের আপনাকে অতিক্রম করতে দিন। লেখকের ভাষায় একজন মূর্খ ও জ্ঞানীর মধ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক পার্থক্য হলো মাত্র থাইরয়েড গ্ল্যান্ডে উপস্থিত এক নিকেল মাপের আয়োডিন। কোনো চিকিৎসক যদি ওই আয়োডিন আপনার থাইরয়েড গ্ল্যান্ড থেকে সরিয়ে নেন, তবে আপনিও একজন বোকা মানুষ। এই সামান্য আয়োডিনই সব বদলে দিতে পারে। তাই অপরকে স্বমতে আনতে হলে তাকেই বেশি কথা বলতে দিন, তাকেই বেশি গুরুত্ব দিন। আসলে চমৎকার সব উদাহরণে ভরা ডেল কার্নেগির বইগুলো তাই তো বিশ্বে বেস্ট সেলারের কৃতিত্ব পেয়েছে।
বারবার করে পড়া বইয়ের মধ্যে একেকবার একেক রকমের উপলব্ধি হওয়া বই পাওলো কোয়েলহোর ‘আলকেমিস্ট’ নামক উপন্যাসটি। তরুণ পড়ুয়া সিরিয়াস পাঠকদের পছন্দের শীর্ষে থাকা বইটি না পড়ে থাকলে অনেক কিছু মিস হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা হবে। উপন্যাসটির কিশোর নায়ক সান্তিয়াগো স্পেনের আন্দালুসিয়ায় বাস করে। সেই সান্তিয়াগোর লক্ষ্য পূরণের জীবন ভ্রমণের সঙ্গে পাঠকেরও এক দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা অর্জনের ভ্রমণ এখানে চলমান থাকে। ভ্রমণের মধ্যদিয়ে লেখক পাওলো কোয়েলহো দেখিয়েছেন যে, সাফল্যের কোনো শর্টকার্ট রাস্তা নেই। সত্য সবসময় সত্যিই হয় আর পরিশ্রমই সাফল্যের চাবিকাঠি।
এখানে লেখক সান্তিয়াগোকে ধৈর্যের শিক্ষা, পরিশ্রমের শিক্ষা, একাগ্রতার শিক্ষা, বেদুইন কন্যা ফাতিমার ভালোবাসার শক্তি, তার বিরহের শক্তি, আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জন করতে করতে তার সঙ্গে দেখা করায় রহস্যময় এক ব্যক্তি আলকেমিস্টের সঙ্গে, যিনি লোহাকে স্বর্ণে রূপান্তর করতে পারেন। কিশোর নায়ক সান্তিয়াগোর লক্ষ্যের প্রতি দৃঢ় মনোবল প্রতিজ্ঞা এসব আলকেমিস্টকে মুগ্ধ করে। তিনিই তাকে পিরামিডের কাছে নিয়ে যান। অবশেষে নানা বাধাবিপত্তি এবং চড়াই-উতরাই পেরিয়ে গুপ্তধনের খোঁজ পাওয়া যায়। এটা নিছক একটি উপন্যাস নয়; একটি জীবনদর্শনও বটে। আমাদের শিক্ষার্থীরা এসব বই পড়ে নিজেদের ঋদ্ধ করলে তাদের চঞ্চলতা কমে আসবে। ইংরেজি, বাংলা বা অনলাইন ভার্সন অনেকভাবে পাওয়া যায়। এখন কত রকমের সুযোগ আছে বই পড়ার জন্য, শুধু ইচ্ছাটাই প্রয়োজন।
বই পড়ার উপকারিতার জন্য নয়, আজকের শিক্ষার্থীরা যারা এক অস্থির সময়ের মধ্যে জড়িয়ে রয়েছে। যাদের নিজেদের সময় হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে মোবাইলের স্ক্রিনের আসক্তিতে, তারা নিজেদের জীবনকে কীভাবে সঠিক নির্দেশনায় পরিচালিত করতে পারবে, সেসব শিক্ষা অর্জনের জন্য এসব বই অনুপ্রেরণা জাগাতে পারে বলেই পড়ে দেখার আশা প্রকাশ করছি। আজকের তালিকায় থাকা হ্যাল এলরডের ‘দ্য মিরাকল মর্নিং’ বইটিতে সকালের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন। আজকের সূর্যোদয় না দেখা প্রজন্মের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ আছে। দেহঘড়িটা সকালে কত বেশি পরিমাণে সক্রিয় থাকে, তা বোঝানো হয়েছে। বর্তমানের কিশোরসহ তরুণ প্রজন্ম সকালের সূর্যোদয়, ভোরের মিষ্টি রোদ-রশ্মি, খুব সকালের পাখির কিচির-মিচির আওয়াজের কলকাকলি—এসবের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে না। কারণ, সকাল ১০টার আগে তারা ঘুম থেকে উঠতে পারে না। সারা রাত জেগে কাটানোর বদ অভ্যাস থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য নানা রকম উপায় ও কৌশল, শৃঙ্খলা এবং সকালের গুরুত্ব ইত্যাদি নিয়ে লেখা ‘দ্য মিরাকল মর্নিং’ বইটি সবার জীবন তৈরিতে সহায়ক।
একটি বিষয় নতুনভাবে শেখা হলো, সেটি হলো কীভাবে ‘না’ বলতে হয় বা এভাবে বলা যায় কখন অফ থাকতে হয়। মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়াতে বা কোনো আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে বা একঘেঁয়েমি কাজকর্মের বিরক্তি থেকে স্বস্তি পেতে অর্থাৎ প্রতিদিনের ‘থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়’ থেকে আনন্দময় অনুভূতিতে ফিরে আসার উপায় জানতে ‘থিবো মেরিসের’ ডোপামিন ডিটক্স বইটি বেশ কার্যকর। বর্তমান প্রজন্মের সন্তানরা যে মোবাইল নিয়ে দিন-রাত পড়ে থাকে বা যে কোনো আসক্তি বা কাজকে আঁকড়ে পড়ে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া, সেই অবস্থা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি শিখে নিজের কাজ ও শখের মধ্যে নিমজ্জিত থাকা যায়, তা আয়ত্তে আনা যায়। আমাদের যুবসমাজ বিপথে যাওয়ার ব্রেইন ওয়াশের পরিবর্তে ব্রেইনকে কীভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখবে, তা জানতে পারবে। এসব বই অনেকে পড়েছে বলেই এসব বই অনেক আগে থেকে বেস্ট সেলারের খ্যাতি পেয়েছে। কিন্তু যাদের পড়া নেই তারা পড়ে নিজেদের আদর্শ শিক্ষার্থী হিসেবে তৈরি করা যাবে বলে মনে করছি। শিক্ষার উদ্দেশ্যই হলো নিজেকে ইতিবাচকভাবে বিকশিত করা। ইতিবাচক শিক্ষা খুঁজে নেওয়াও শিক্ষিত সমাজেরই দায়িত্ব।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ
মন্তব্য করুন