ড. দিলারা রহমান
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৫, ০৮:৩৪ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

বর্ষা বিপ্লবে নারীর এগিয়ে যাওয়ার গল্প

বর্ষা বিপ্লবে নারীর এগিয়ে যাওয়ার গল্প

(গতকালের পর)

পুলিশ দিয়ে ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’কে দমন করার যে ভূমিকা সরকার নিয়েছিল, তা তাদের আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে। এ কারণেই তারা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। তাদের অনেকের মতে, নারীর ক্ষমতায়নের জন্য দরকার নারীর মেধাগত যোগ্যতা। কখনোই কোটা দিয়ে নারীর ক্ষমতায়নকে নিশ্চিত করা যায় না। বুদ্ধিবৃত্তিক উপলব্ধি, নিজস্ব ন্যায়বোধ, সমাজ সম্পর্কিত সচেতন চিন্তা প্রভৃতির মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন। ১৮ জুলাই তারা হল ছাড়লেও আন্দোলনের মাঠ ছাড়েননি। তাদের কেউ কেউ সিলেটে থেকে গেছেন, আবার কেউ কেউ বাড়ি চলে গেছেন। যারা বাড়ি চলে গেছেন তারা স্থানীয়ভাবে যে আন্দোলনগুলো হয়েছে, সেখানে মাকে নিয়ে, এমনকি বাবাকে নিয়েও উপস্থিত ছিলেন। আর যারা সিলেটে ছিলেন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে আন্দোলনের যেসব কর্মসূচি পালিত হয়েছে, প্রত্যেকে সক্রিয়ভাবে সেখানে অংশগ্রহণ করেছেন। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বা মতের প্রতি তাদের কোনো ‘ফ্যাসিনেশন’ নেই। কোনো দলীয় আদর্শে বিশ্বাসী না হয়েই রাজনৈতিক সচেতনতার প্রশ্নে, বৈষম্যহীন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জুলাই-আগস্টের এ গণজাগরণে তারা সম্পৃক্ত হয়েছেন। এ ডিসকাশনে দুজন মেয়ে জানিয়েছেন যে, তারা নিজেকে কখনো নারী হিসেবে ভাবেননি বা ভবিষ্যতেও ভাববেন না। যে কোনো বৈষম্যের প্রতি তারা সবসময় রুখে দাঁড়াবেন। শুধু ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার নয় বরং আগামীতে যে সরকারই বৈষম্য তৈরি করবে কিংবা অগণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করবে, তার বিরুদ্ধেই তারা আবারও প্রতিবাদ গড়ে তুলবেন। নারী নয় বরং তারা নিজেকে মানুষ হিসেবে দেখতে চান।

এ ছাড়া এই ডিসকাশনে সবাই প্রায় একমত পোষণ করেছেন যে, বিগত সরকার যেভাবে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে তাদের ‘নিজস্ব অর্জনের বিষয়’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস চালিয়েছিল, তা সুস্পষ্টভাবে বাংলাদেশে বিভাজন তৈরি করেছে এবং সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলাকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা হিসেবে দেখা হয়েছে। অথচ তাদের অনেকের বাবাদেরও জন্ম হয়েছে ১৯৭১-এর পর। এভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করাকে তারা মেনে নিতে পারেননি এবং পারবেনও না। গণতন্ত্রে ভিন্নমত থাকবে। ভিন্নমত কখনো স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা হতে পারে না। কিন্তু গত সাড়ে ১৫ বছরে শেখ হাসিনা সরকার এভাবেই বাংলাদেশে Sense of Political Injustice তৈরি করেছে। উপর্যুক্ত তথ্যগুলো থেকে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, এবারকার জুলাই-আগস্ট গণজাগরণে বা শ্রাবণ বিপ্লবে নারীদের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে এক ভিন্নমাত্রা দিয়েছিল। নারীর ক্ষমতায়নের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি নারীদের অংশগ্রহণের এ বিষয়টি আমরা মূল্যায়ন করি, তবে দেখতে পাই যে, বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে মেয়েরা আগের চেয়ে অনেক বেশি ‘নারী স্বাধীনতায়’ বিশ্বাসী। গতানুগতিক ছকের বাইরে এখন তারা তাদের কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম। বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর বলেন, ‘ক্ষমতায়ন হচ্ছে মানুষের সেই অধিকার অর্জিত হওয়া, যার দ্বারা নিজের জীবনের পাশাপাশি সমাজ-পারিপার্শ্বের ইতিবাচক পরিবর্তন আনয়ন সম্ভব হয়। শুধু ক্ষমতায় থাকা নয়, দরকার তা প্রয়োগের অধিকার; শুধু উঁচু পদে আসীন হওয়া নয়, দরকার পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতার সঙ্গে ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার অর্জিত হওয়া অর্থাৎ ক্ষমতায়ন হচ্ছে এমন একটি বিষয় যার দ্বারা মানুষ তার নিজের শরীর, মন ও কাজের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।’ এবারের আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে রোকেয়া কবীরের এ মতামতের পূর্ণ প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। নারীরা তাদের নিজস্ব উপলব্ধির মধ্য দিয়ে, স্বেচ্ছায় এ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। কারও নির্দেশে নয়, মনের তাগিদে তারা পুরুষের পাশাপাশি থেকে, কখনোবা এগিয়ে গিয়ে আন্দোলনে শামিল হয়েছেন।

ক্যারলিন মোসার বলেন, “The capacity of women to increase their own self-reliance and internal strength. This is identified as the right to determine choices in life and to influence the direction of change, through the ability to gain control over crucial material and non- material resources.”১৭ মোসারের এ ভাবনারও একটি চমৎকার উদাহরণ হতে পারে এবারের আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণের বিষয়টি। নারীর ভেতরকার শক্তিই তার নিজস্ব চাওয়া নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে এবং তাকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

গত সাড়ে ১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে একটি বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের দলীয় বয়ান দিয়ে স্পষ্টই বাংলাদেশে একটি বিভাজনমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠিত করেছিল যার একদিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আর অন্যদিকে ভিন্নমত পোষণকারী সবাই তার (শেখ হাসিনা) মতে, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। এভাবে সমাজে বিভাজন তৈরি করে মানুষের দ্রোহকে তিনি ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে তুলেছিলেন। অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের মধ্য দিয়ে তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় জেঁকে বসে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাইতো ২০২৩-এর নভেম্বরে বিশ্বের শক্তিশালী পত্রিকা টাইম ম্যাগাজিন তাকে ‘হার্ড পাওয়ার’ হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রচ্ছদ করে। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার সব জায়গায় অতিমাত্রায় দলীয়করণ করে তিনি অ্যারিস্টটলের বর্ণনাকৃত ‘Sense of Political Injustice’-এর জন্ম দিয়েছিলেন, যা শুধু পুরুষ নয়; নারীকেও সমানভাবে প্রতিবাদী করে তুলেছে। এ কারণেই নারীর অংশগ্রহণ এবারের জুলাই-আগস্টের গণজাগরণে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে, আন্দোলনকে মহান করেছে।

এবারকার আন্দোলনে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের নারীরা এখন আর নিজেদের অনগ্রসর ভাবতে ইচ্ছুক নয়। তারা তাদের মেধায় বিশ্বাসী এবং নিজস্ব অধিকারে বিশ্বাসী। পুরুষের সহযাত্রী হওয়ার স্পৃহা থেকে এবং তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সচেতনতার মধ্য দিয়ে এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছেন। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, সময়ের প্রয়োজনে তারা কাজ করতে সক্ষম। যে কোনো বৈষম্যের বিরুদ্ধে তারা রুখে দাঁড়াতে সক্ষম। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি নারীদের অবহেলিত কিংবা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী মনে করে, সেখানে তাদের তীব্র আপত্তি রয়েছে, বরং জৈবিকভাবে এখন আর তাদের দুর্বল ভাবার কোনো সুযোগ নেই। নিঃসন্দেহে এ ভাবনাগুলো বর্তমান বাংলাদেশে নারীদের ক্ষমতায়নকেই নির্দেশ করে। আমরা আশাবাদী, একটি সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করার জন্য যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করার দরকার, বাংলাদেশের নারীরা সে প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে এখন শতভাগ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তাইতো এ আন্দোলনে নারীর সাহসী উচ্চারণ ছিল ‘পেছনে পুলিশ, সামনে স্বাধীনতা’— স্বাধীনতার প্রশ্নে সামনে এগিয়ে যাওয়াই এখনকার নারীদের একমাত্র লক্ষ্য। এ লক্ষ্যই জুলাই-আগস্ট গণজাগরণে বিশাল পরিসরে নারীর অংশগ্রহণকে উৎসাহ জুগিয়েছে এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার গল্পগুলো সত্যি করে তুলেছে। (শেষ)

লেখক: অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মোদি এখন কোথায়?

আজ থেকে নতুন দামে বিক্রি হবে স্বর্ণ, ভরি কত?

স্যামসাং টিভি ও মনিটরে আসছে মাইক্রোসফটের 'কোপাইলট' চ্যাটবট

সৌন্দর্যে ভরে উঠছে ত্রিশালের চেচুয়া বিল

আজ মুখোমুখি অবস্থানে যেতে পারেন বিএসসি প্রকৌশলী ও ডিপ্লোমাধারীরা

৩১ আগস্ট : কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

সিঙ্গারে চাকরির সুযোগ, থাকবে ভাতাসহ প্রভিডেন্ট ফান্ড

টাঙ্গাইলে সাত মাসে সাপের কামড়ের শিকার ৫৩৫ জন

ব্যাংক এশিয়ায় রিলেশনশিপ ম্যানেজার পদে আবেদন করুন আজই

তিন দলের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক আজ

১০

ভারত সফরের পরিকল্পনা বাতিল করলেন ট্রাম্প : নিউইয়র্ক টাইমস

১১

পুরুষদের জন্য রূপায়ণ গ্রুপে চাকরির সুযোগ

১২

কিশোর-কিশোরীদের জন্য এআই চ্যাটবটে পরিবর্তন আনল মেটা

১৩

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নতুন পরিকল্পনা ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের

১৪

রাজধানীতে আজ কোথায় কোন কর্মসূচি

১৫

নির্বাচনের কোনো সুষ্ঠু পরিবেশ নেই : শামীম সাঈদী

১৬

ঢাকায় হালকা বৃষ্টির পূর্বাভাস

১৭

রোববার রাজধানীর যেসব মার্কেট বন্ধ

১৮

৩১ আগস্ট : আজকের নামাজের সময়সূচি

১৯

পুলিশ দেখে নদীতে ঝাঁপ দিলেন ৩ যুবক, অতঃপর...

২০
X