

নেপালে ভরদুপুরের রোদ যেন হঠাৎই অন্ধকার হয়ে এলো। কাঠমান্ডুর আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল ধোঁয়া, পুড়ে যাওয়া টায়ারের গন্ধে ভারী হয়ে উঠল বাতাস। রাজপথে, অলিতেগলিতে, বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে, এমনকি রাজনীতিবিদদের বাড়ির সামনে—যেখানেই চোখ যায়, সেখানেই মানুষের ঢল। মুখে আগুনের মতো ক্ষোভ, হাতে সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রিন, আর কণ্ঠে—বদল চাই।
গত ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫। সেই দিন সকালে জনতার স্রোত পেরিয়ে গেল সিংহ দরবারের প্রধান ফটক। এ ভবনে ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের অফিস। শত শত তরুণ-তরুণী, বেশিরভাগই স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, প্রবল জোরে ধাক্কা দিল সরকারি দম্ভের দেয়ালে। তারা শুধু দেয়ালই না, ভেঙে ফেলল দীর্ঘদিনের ভয় আর চুপ থাকার সংস্কৃতিও।
এর আগের দুদিন ধরে কাঠমান্ডু আর নেপালের অন্য শহরগুলো যেন অচেনা হয়ে উঠেছিল। কেউ আগুন ধরাচ্ছিল টায়ারে, কেউবা অফিসে ঢুকে কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলছিল। অনেক মন্ত্রীর বাড়িতে হামলা হয়, তাদের নিরাপত্তা দিতে হেলিকপ্টারে করে সরিয়ে নিতে হয় নিরাপদ জায়গায়।
সরকার বাধ্য হয় সেনা নামাতে। কারফিউ জারি করা হয়। তারপরও ক্ষোভ থামেনি, বরং আরও বিস্ফোরিত হয়। দুদিনের বিক্ষোভে অন্তত ২২ জন নিহত হন। আহত হন শত শত মানুষ, যাদের অনেকেই তরুণ—এ প্রজন্মের প্রতিনিধি।
এ বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল একটি সামাজিক মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে। সরকার ২৬টি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম, যেমন—ফেসবুক, ইউটিউব ও এক্স (টুইটার) হঠাৎ বন্ধ করে দেয়। সরকার বলেছিল, এই প্ল্যাটফর্মগুলো সরকারকে রেজিস্ট্রেশন ও পর্যবেক্ষণের সুযোগ না দেওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু যারা রাস্তায় নেমেছিল, তারা বলেছে—এটা ছিল কণ্ঠরোধের চেষ্টা। তারা বলেছে, এটা ছিল ‘নেপো কিডদের’ বিলাসী জীবনের বিরুদ্ধে সবার ক্ষোভ চাপা দেওয়ার চেষ্টামাত্র।
তরুণরা যখন দিনভর সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করছিল, তখন তারা দেখছিল রাজনৈতিক নেতাদের সন্তানদের দামি গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ আর প্রভাব-প্রতিপত্তির ছবি। অথচ তাদের বাস্তবতা ছিল বেকারত্ব, বৈষম্য আর হতাশা। এ ব্যবধান আর সহ্য হয়নি তাদের।
যেই মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়, আন্দোলন যেন নতুন জ্বালানি পেয়ে আগুনের রূপ নেয়। সামাজিক মাধ্যম খুলে দেওয়ার পরও তা থামেনি। বরং পরদিন প্রধানমন্ত্রী খাড়গ প্রসাদ শর্মা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখক পদত্যাগ করলেও উত্তেজনা কমেনি।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বললেন, ‘নেপালের সরকার চেয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আন্দোলন রোধ করতে। কিন্তু ঠিক উল্টোটা হয়েছে।’
এ পরিস্থিতি নতুন নয়। ২০১০ সালের আরব বসন্তে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় ঠিক এমনই হয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তাতেও আন্দোলন বন্ধ হয়নি। বরং সরকারগুলোর স্বৈরাচারী মনোভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল আর প্রতিবাদের ঢেউ আরও তীব্র হয়েছিল।
তাই অনেক কর্তৃত্ববাদী সরকার সেই সময় থেকে ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রবাহের ওপর কড়াকড়ি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। চীনের গ্রেট ফায়ারওয়াল যেমন—যেখানে শুধু বাইরের তথ্যই নয়, ভেতরের রাজনৈতিক সংবেদনশীল বিষয়ও ব্লক করে দেওয়া হয়।
চীনে আজ একটি ফোন কিনতে গেলে বা ওয়াইফাই ব্যবহার করতেও সরকারকে জানাতে হয় নিজের পরিচয়পত্র। অনলাইনে কিছু লেখার আগে ভাবতে হয়—পরে পুলিশ আসবে না তো? এমন এক সমাজ গড়ে উঠেছে যেখানে মানুষ নিজেরাই নিজেদের মুখ বন্ধ করে রাখে।
সম্প্রতি চীনা সাংবাদিক সান লিন পুলিশের হাতে মারা যাওয়ার পর তার মৃত্যু নিয়ে অনলাইনে আলোচনা শুরু হয়েছিল। কিন্তু দ্রুতই তা মুছে ফেলা হয়। প্রযুক্তির নতুন যুগে সরকারগুলো এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এসব তথ্য খুব দ্রুত শনাক্ত করে সরিয়ে ফেলতে পারে।
এসব দেখে দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক একজন উপদেষ্টা শন কিং মন্তব্য করেছেন, ‘চীনের নেতারা হয়তো এখন নেপালের নেতাদের দিকে তাকিয়ে হাসছেন—ভাবছেন, ধন্য আমরা, আমাদের তরুণরা জানেই না, তারা কী হারিয়েছে।’
তবে শুধু স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই নয়, আজকের দিনে গণতন্ত্রের দাবিদার দেশগুলোও নিজেদের মতো করে কণ্ঠরোধের নানা পন্থা নিচ্ছে। ২০২৪ সালে ফ্রিডম হাউস প্রকাশিত ‘ফ্রিডম অন দ্য নেট’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত ১৪ বছর ধরে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট স্বাধীনতা ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে। এ প্রতিবেদনে অংশগ্রহণকারী মানুষের মাত্র ১৭ শতাংশ ‘পূর্ণাঙ্গ মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্টারনেট’ ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নেপালের উত্তরে রয়েছে চীন—একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র, যেখানে ইন্টারনেটের প্রবাহ দমন করা হয় কঠোর পর্দা দিয়ে। অন্যদিকে রয়েছে ভারত—একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর দেশ, যাকে অনেকেই এখন দেখছেন ‘নিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা’র পরীক্ষাগার হিসেবে।
২০২৩ সালের পর থেকে ভারত সরকারের হাতে নতুন ক্ষমতা এসেছে, যার মাধ্যমে শুধু তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় নয়, অন্যান্য প্রশাসনিক দপ্তরের কর্মকর্তারাও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে সরাসরি কোনো কনটেন্ট মুছে ফেলতে নির্দেশ দিতে পারেন। নির্বাচনের আগেই একটি সরকারি ‘ফ্যাক্ট চেকিং’ ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল ‘ভুল তথ্য’ সংশোধন। কিন্তু সাংবাদিক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীরা এটিকে স্বাধীন মতপ্রকাশে হস্তক্ষেপ বলে অভিহিত করেন।
সামান্য একটি ব্যঙ্গচিত্র কিংবা কোনো মারাত্মক দুর্ঘটনার সংবাদ—যেমন পদদলিত হয়ে মৃত্যুর খবর, এমনকি এসবও কখনো কখনো নিষেধাজ্ঞার শিকার হয়েছে। একদিকে ভুল তথ্য আর ঘৃণার প্রচার রোধের চেষ্টা, অন্যদিকে সমালোচনাকে দমন করার প্রবণতা—এ দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
অবশ্যই পুরোপুরি অনিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেটও বিপজ্জনক। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে চালানো গণহত্যায় সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ঘৃণা ও ভুয়া তথ্য যে কী ভয়াবহ ভূমিকা রেখেছে, তা ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ একরকম ধারালো তরবারি—একদিকে সহিংসতা রোধ করতে পারে, অন্যদিকে সহজেই নিরীহ মানুষের কণ্ঠও চেপে ধরতে পারে।’
নেপালের সামনে এখন কী অপেক্ষা করছে, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। একদিকে মাথাপিছু বার্ষিক আয় এখনো ১৪০০ ডলারের নিচে। অন্যদিকে, তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব প্রায় ২০ শতাংশ। প্রতিদিন দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে দুই হাজারেরও বেশি যুবক, যাদের অধিকাংশই কাজের খোঁজে পাড়ি জমায় মধ্যপ্রাচ্যে।
বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবি তুলেছেন। তারা চাচ্ছেন আইনপ্রণেতাদের পদত্যাগ, বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশদাতাদের বরখাস্ত এবং নতুন নির্বাচনের ঘোষণা। কিন্তু শুধু এই দাবিগুলো পূরণ করলেই নেপালের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট সমাধান হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
তবে অন্তত এটুকু প্রত্যাশা করাই যায়, দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব হয়তো এবার বোঝার চেষ্টা করবে—সমালোচনার মুখে মুখ ফিরিয়ে নিলে সমস্যার সমাধান হয় না। বরং কণ্ঠরোধের চেষ্টা আরও ক্ষোভ তৈরি করে, আরও ক্ষত বাড়ায়।
যারা গলার আওয়াজকে ভয় পায়, যারা মানুষের রাগ আর বেদনার শব্দকে বন্ধ করতে চায়—তারা জানুক, বোতলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা একবারের জন্য মুক্ত কণ্ঠকে আর আটকে রাখা যায় না। চুপ করানোর যত চেষ্টা, তা বরং আগুনে ঘি ঢালার মতোই কাজ করে।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘যারা শুনতে চায় না, তাদের কাছে ক্ষোভ আর ক্ষুব্ধতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সরকারগুলো যদি সত্যিই সমাধান চায়, তাহলে মুখ বন্ধ করে রাখার বদলে অন্তত কান খুলে শোনার সাহস দেখাক।’
লেখক: সিঙ্গাপুর ব্যুরোভিত্তিক টাইম ম্যাগাজিনের সম্পাদক-অ্যাট-লার্জ। টাইম ম্যাগাজিন থেকে অনুবাদ করেছেন তারেক খান।