সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ভাসানী ছিলেন তারুণ্য ও আশার প্রতীক

ভাসানী ছিলেন তারুণ্য ও আশার প্রতীক

মওলানা ভাসানী চীনে গিয়েছিলেন ১৯৬৩-তে। চীন ভ্রমণের ওপর ছোট একটি বই আছে তার, ‘মাও সেতুঙের দেশে’। সে বইতে মওলানা লিখেছেন, ‘মাও সেতুঙের দেশে আমাকে সব থেকে মুগ্ধ করেছে কী—এ প্রশ্ন অনেকেই জিজ্ঞাসা করেছেন।’ তার মতে, এ প্রশ্নের জবাব দেওয়া একদিক দিয়ে অত্যন্ত দুরূহ, অন্যদিকে অত্যন্ত সহজ। সহজ করেই জবাব দিয়েছেন তিনি, অল্প কথায়, এক কথায়। বলেছেন—‘হাসি।’ ‘হ্যাঁ, হাসিই আমাকে সব থেকে বেশি মুগ্ধ করেছে। চীনের মানুষ আজ হাসতে পারে। যে হাসিতে কান্না ঝরে না, যে হাসিতে আছে প্রাণের প্রাচুর্য আর জীবনের উচ্ছ্বাস’—মওলানা লিখেছেন। আরও বলেছেন তিনি, ‘তখন বুঝিনি এমন করে যে, হাসির অভাব কত নিষ্ঠুর। দেশে এসে আজ মিলিয়ে দেখেছি আমার দেশের কৃষকের মুখের সাথে চীনের কৃষকের মুখ। আমার দেশের কোটি কোটি মানুষের মুখ দেখেছি। কিন্তু হাসি খুঁজে পাচ্ছি না তো?’

‘আমরা কি হাসির উৎসের সন্ধান পাব না?’ মওলানার এ ব্যাকুল প্রশ্ন বুকের মধ্যে এসে সরাসরি লাগে, বইটি পড়তে গেলে। আর তখনই মনে পড়ে যে, মওলানা ভাসানী সারা জীবন ব্যস্তসমস্ত ছিলেন ওই উৎসের সন্ধানে। পণ ছিল জীবনে খুঁজে বার করবেন সেই উৎস আর সেই উৎসমুখে জমা আছে যে ভীষণ বঞ্চনা ও অতিনিষ্ঠুর নিপীড়নের প্রকাণ্ড পাথর, তাদের সরিয়ে দেবেন, মুক্ত করবেন নদীকে, হাসি আনবেন মানুষের জীবনে, জীবন্ত করবেন জীবনকে। মওলানা আজ নেই, তিনি চলে গেছেন। কিন্তু কী রেখে গেছেন? কোনো গ্রন্থ নয়, কোনো সংগঠন নয়, বিশেষ কোনো উত্তরসাধকও নয়। মওলানা রেখে গেছেন তার জীবন। দেশের কাছে, ইতিহাসের কাছে।

যদি প্রশ্ন করা যায় সে জীবনের মূল কথাটা কী, প্রধান সত্য কী তার? মনে হবে কঠিন সেই প্রশ্ন। ছিয়ানব্বই বছর বেঁচে ছিলেন তিনি, একটি মহাদেশের মতো বিস্মৃত ছিল তার জীবন, সেখানে পর্বত আছে, আছে সমতল ভূমি, কোথাওবা শীত সেখানে, কোথাও গ্রীষ্ম, বিচিত্র ও বহুবিধ ছিল তার কর্মক্ষেত্র ও কার্যধারা। কিন্তু অন্যদিক দিয়ে ‘আবার ওই প্রশ্নের জবাব দেওয়া অত্যন্ত সহজ, এক কথাতেই জবাব দেওয়া যায়, যেমন মওলানা দিয়েছেন চীন সম্পর্কে। তার জীবনের মূল কথা হচ্ছে সংগ্রাম। একটানা, নিরবচ্ছিন্ন, আপসহীন সংগ্রাম। কীসের জন্য সংগ্রাম? কোন লক্ষ্যে? কোন অভিপ্রায়ে? এ প্রশ্নের জবাবও এক কথাতেই দেওয়া যায় অত্যন্ত সহজে। সংগ্রাম ছিল মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর। উৎস খুঁজছিলেন তিনি হাসির, প্রায়-অবলুপ্ত উৎস। যেন রূপকথার রাজপুত্র একজন, আহার নেই, বিশ্রাম নেই, নিদ্রা নেই, খুঁজছেন, খুঁজছেন, সেই নরশত্রু দৈত্যকে, অথবা সেই ভীষণস্বভাব, খল-প্রকৃতির প্রতারক জাদুকরকে—পাথরচাপা দিয়েছে যে নদীর উৎসমুখে। রাজপুত্র বাঁচাবেন সেই নদীকে। আনবেন, হাসি তিনি আনবেনই কৃষকের, শ্রমিকের, মেহনতি মানুষের অনাহারক্লিষ্ট মুখে। সংগ্রাম সে লক্ষ্যেই।

মানুষের মুখে হাসি ফোটাব—এ কথাটা কতজনে বলেছে, কতবার, কত সময়ে বলেছে এ দেশে। বায়ুমণ্ডলে যদি কান পেতে শুনি, শুনব কত গম্ভীরসমস্ত কণ্ঠে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত সেই প্রতিশ্রুতি। হাসি আনব দেশের গরিব-দুঃখীর মুখে। এ কথা কতজনে বলেছেন, বলতে বলতে ক্ষমতার উচ্চাসনে উঠে গেছেন। উঠে গিয়ে তিনিই হেসেছেন শুধু, জোরে জোরে হেসেছেন, নতুন করে কেঁদেছে সমগ্র দেশ। না, হাসতে পারেনি মানুষ। অনশনক্লিষ্ট মুখে হাসি আসেনি, কুঞ্চনের রেখাগুলোই শুধু গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। মওলানা ভাসানী দেখেছেন তা, ব্যথিত হয়েছেন, সেই ব্যথা বুকে নিয়ে আবার ছুটেছেন তিনি, অপ্রতিহত উৎসাহে ও সাহসে।

কিন্তু আমরা ভুল বলেছি। শত্রুকে, সেই নরশত্রু দৈত্য ও প্রতারক জাদুকর উভয়কে তার চেনা হয়ে গিয়েছিল জীবনের প্রথমেই। রাজনীতিতে তিনি শত্রুকে প্রধান গুরুত্ব দিয়েছেন, তারপর মিত্রকে। এখানে পৃথক তিনি অন্যসব রাজনীতিকের কাছ থেকে; অন্যরা মিত্র খোঁজেন, মিত্রই খোঁজেন, শুধু, শত্রুকে বাদ দিয়ে। উদ্দেশ্যটা সরল, মিত্রের সঙ্গে মৈত্রী করবেন, সুযোগ-সুবিধা যা পাওয়া যায় নেবেন। মিত্রকে ধরে উঠবেন। মওলানা কখনো উঠতে চাননি। সঙ্গে ছিলেন তিনি, পাশেই ছিলেন জনসাধারণের। গ্রামে থাকতেন অধিকাংশ সময়, শহরে আসতেন প্রয়োজনবোধে, যেমন গ্রামের মানুষও আসে, কখনো-সখনো। কিন্তু যে অস্ত্র হাতে ছিল তার সেটা অলৌকিক নয়, নয় আধিদৈবিক, সে অস্ত্র জনসাধারণের সংগঠিত শক্তি। জনসাধারণের মুক্তি দিয়েই তিনি আক্রমণ করেছেন দৈত্য ও জাদুকরকে। আঘাত করেছেন বারবার।

কে সেই শত্রু? কে সেই দৈত্য ও জাদুকর? ভাসানী চিনতে ভুল করেননি, তারা হলো সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ। কোনটি দৈত্য, কোনটি জাদুকর সে প্রশ্ন অবান্তর। কেননা, দৈত্যও জাদু জানে এবং জাদুকরও দৈত্যই আসলে, স্বভাবে-চরিত্রে, আচারে আচরণে।

প্রত্যক্ষভাবে, সামনাসামনি সামন্তবাদের সঙ্গে লড়েছেন তিনি। কিন্তু তার লড়াই একজন জমিদারের বিরুদ্ধে ছিল না, দুজন জমিদারের বিরুদ্ধে নয়, দশজন, একশজন জমিদারের বিরুদ্ধেও নয়। জমিদারের বিরুদ্ধে নয়, আসলে লড়ছিলেন জমিদারির বিরুদ্ধে। উপলক্ষ ঢেকে দিতে পারেনি লক্ষ্যকে। এখানেই স্বতন্ত্র তিনি। জমিদারটি ভালো কি মন্দ সে প্রশ্ন অর্থহীন, জমিদারি প্রথার অবসান চেয়েছেন তিনি, অবসান চেয়েছেন সেই ঘৃণ্য, অমানবিক ব্যবস্থার; যা জমিদারদের জন্ম দেয় ও রক্ষা করে। তিনি জানতেন কোনো একজন বিশেষ জমিদারকে বা এমনকি দেশের সব জমিদারকেও যদি এক বিশেষ মুহূর্তে পরাভূত করা যায়, তবু কৃষকের মুক্তি আসবে না, যদি না জমিদারি ব্যবস্থা শেষ হয়। জমিদার যাবে জমিদার আসবে, কিন্তু ব্যবস্থাটার সামন্ত শোষণের বন্দোবস্তটি থাকছে কি থাকছে না—জিজ্ঞাসা সেটিই। সেই বন্দোবস্ত থাকলে জমিদারের অভাব হবে না, শূন্যস্থান পূরণ হয়ে যাবে এক নিমেষেই। আজ যিনি কৃষক নেতা, লড়ছেন স্থানীয় জমিদারের বিরুদ্ধে, তিনিই হয়তো আগামীকাল জমিদার হয়ে বসবেন যদি স্থানীয় জমিদার চলে যান বিরাগী হয়ে। তার আন্দোলন তাই ছিল সামন্তবাদের বিরুদ্ধে।

এও তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট করে জানতেন যে, সামন্তবাদের পেছনে আছে রাষ্ট্রীয় শক্তি, রাষ্ট্রীয় শক্তির পেছনে আছে সাম্রাজ্যবাদ। সেজন্য সামন্তবাদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ, সে যুদ্ধ রাজনীতি-নিরপেক্ষ নয় কোনোমতেই এবং সে যুদ্ধ অতিঅবশ্যই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। সবাই বোঝেননি এই সত্য, বুঝতে চাননি কেউ কেউ। গ্রামে যারা কাজ করেছেন মানুষের উপকারের জন্য, তারা অনেকেই ভেবেছেন একটা নাইট স্কুল, দুটো টিউবওয়েল বা একটা দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করতে পারলেই মানুষের মুক্তি এসে গেল। অনেক সময় স্থানীয় জমিদারও চাঁদা দিয়েছেন এসব কাজে। কেননা, হয়তোবা নিজের অজান্তেই জমিদার জেনে নিয়েছেন মানুষকে ঠান্ডা রাখার ওই একটা উপায়, ঠান্ডা রাখতে হলে নাইট স্কুলের, টিউবওয়েলের, দাতব্য চিকিৎসালয়ের পানি অত্যন্ত উপযোগী। মওলানা ভাসানী সেই পথের পথিক ছিলেন না। গ্রামে থাকতেন, কিন্তু গ্রাম্য-বিচ্ছিন্নতা ছিল না তার চেতনায়। তিনি তাদের একজন নন যারা বলেন আমাদের কাজ মানুষের উপকার করা, আমরা খোদার কসম বলছি, আমরা সম্পূর্ণরূপে রাজনীতি-নিরপেক্ষ। মওলানা কোনোকালেই, কোনো অবস্থাতেই রাজনীতি-নিরপেক্ষ ছিলেন না। কৃষকের মুক্তি দেশের রাজনীতির বাইরে যে কখনো সম্ভবপর নয়, এ সত্যটি বই পড়ে শেখেননি তিনি; অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে, অসাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের সাহায্যে নিজে নিজেই লাভ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন আনাবার জন্য যে প্রয়োজন বাংলাদেশের কৃষককেও তা বিস্মৃত হননি তিনি। চেষ্টা করেছেন বুঝিয়ে দিতে অন্য সবাইকে। তিনি সংস্কারক ছিলেন না, বিপ্লবী ছিলেন।

ভাসানীর সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা নিয়ে জ্ঞানী বলে বিখ্যাত অনেকে হাসি-ঠাট্টা করেছেন। বলেছেন, সন্তোষে বসে মওলানা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়ছেন, তার কাছে অলৌকিক কোনো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র আছে কি? সাম্রাজ্যবাদকে পাবেন কোথায়, সে কি বসবাস করে সন্তোষের বনে-জঙ্গলে? তারা, এই পরিহাসকারীরা, হয় মূর্খ নয়তো প্রতারক। হয় তারা সাম্রাজ্যবাদকে চেনেন না, লক্ষণ ও কারণের মধ্যে ভেদাভেদ নির্ণয় করতে পারেন না, নয়তো তারা জেনেও মিথ্যা কথা বলেন, প্রতারণার অভিলাষে। মওলানা জানতেন সাম্রাজ্যবাদের চ্যালাচামুণ্ডা, এজেন্ট, চাকর-নফর দেশের সর্বত্র আছে। শাসকদের পেছনেও সাম্রাজ্যবাদীরা আছে। কৃষকের যে দুর্দশা, যে নিরানন্দ-দশা উৎপাদনের অনগ্রসরতা, জীর্ণস্বাস্থ্য তার কারণও সাম্রাজ্যবাদী শোষণব্যবস্থা এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কোনো স্বতন্ত্র নির্দিষ্ট এলাকা যে নেই, তাও জানতেন তিনি। কোনো প্রাঙ্গণ বা প্রান্তর নেই ঘেরাও করা, লাল নিশান টানানো যেখানে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হতে হবে। জীবনের সবক্ষেত্রই যুদ্ধক্ষেত্র; সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যথার্থ যে যুদ্ধ, সে যুদ্ধের পক্ষে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী না হয়ে কোনো উপায় নেই। আর অস্ত্র? সে অলৌকিক নয়, যান্ত্রিকও নয়, অস্ত্র হচ্ছে সংগঠিত জনশক্তি। যার নায়ক ছিলেন মওলানা ভাসানী।

সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামকে গ্রাম্য, সংকীর্ণ, বিচ্ছিন্ন, এলাকাভিত্তিক করে রাখার যে অভিপ্রায়, তা সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে যায়। সেজন্য সাম্রাজ্যবাদ চায়, কৃষককে দেশের বৃহত্তর রাজনীতি সম্বন্ধে উদাসীন করে রাখতে। ওই বইতে, ‘মাও সেতুঙের দেশে’তে, মওলানা লিখেছেন, ‘সমাজ-জীবনকে কলুষিত, অনটন জর্জরিত এবং দুর্নীতির পক্ষে ডুবিয়ে রাখা সাম্রাজ্যবাদীদের একটি কৌশল। কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণিকে যদি কেবল অসহায় ও দুর্ভিক্ষের মোকাবিলা করার কাজে ব্যাপৃত রাখা যায়, তবে তারা আর রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করার সময় পাবে না। রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শাসনযন্ত্র সম্পর্কে কৃষক শ্রমিকদের উদাসীন রাখা গেলে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ অব্যাহত রাখা সহজ ও সম্ভব হয়। কারণ, কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণি যদি পারিপার্শ্বিক বঞ্চনা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে তবে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ও দেশীয় তল্পীবাহকদের শাসন ধূলিসাৎ হতে বাধ্য। আমাদের আজিকার দুর্বিষহ অবস্থার মূল এখানেই’—এ বক্তব্যের সত্যতা অস্বীকার করবে কে? মূর্খ ও প্রতারক ছাড়া?

মওলানা ভাসানী গণআন্দোলনের নায়ক ছিলেন, রাজনীতিক ছিলেন না তিনি প্রচলিত অর্থে। এই কথাটা জিন্নাহ সাহেবও নাকি একদা বলেছিলেন এম এইচ ইস্পাহানিকে, যদিও সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে। ‘কায়েদে আজম: অ্যাজ আই নিউ হিম’ বইতে উল্লেখ আছে সেই ঘটনার।

১৯৪৬ সালে জিন্নাহ সাহেব আসামে এসেছিলেন। সিলেট এসে মওলানা ভাসানী দেখা করেন তার সঙ্গে। মওলানা তখন আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি। আসামের মুসলমানদের পক্ষ থেকে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দিলেন তিনি, সেইসঙ্গে বর্ণনা দিলেন মুসলমানদের ওপর অকথ্য অত্যাচারের। বলতে বলতে একপর্যায়ে সুতীব্র বেদনায় মওলানা কেঁদেই ফেললেন, সবার সামনে।

ইস্পাহানি লিখেছেন, ‘মওলানার গভীর আন্তরিকতা আমাকে অভিভূত করল, আমার পক্ষে কঠিন হয়ে উঠল অশ্রু সংবরণ করা। পরে, ডিনারের আগে, মওলানার কথা তুললাম আমি কায়েদে আজমের কাছে’; ইস্পাহানি বলছেন, ইস্পাহানি প্রশংসা করছিলেন মওলানার। জিন্নাহ সাহেব কিন্তু বললেন ভিন্ন কথা, বললেন মওলানার মতো লোকেরা নেতা হওয়ার যোগ্য নয় মোটেই। ‘রাজনীতিতে বাজে ভাবালুতা ও আবেগের কোনো স্থান নেই।... বুঝলে হে, রাজনীতি হলো দাবার খেলা।... তার জন্য প্রয়োজন কঠিন পরিশ্রম, সাহস ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞা’—জিন্নাহ সাহেবের মত। এই যে পার্থক্য মওলানাতে-জিন্নাহতে, এ তো শুধু দুজন লোকের মধ্যকার দূরত্ব নয়, ব্যবধান নয় কেবল পোশাকের, অথবা ভাষার—পার্থক্য দুটি ভিন্ন ভিন্ন জীবনপদ্ধতির, দ্বন্দ্ব দুটি বিপরীত জীবনদৃষ্টির তথা আদর্শের।

মওলানার কাছে রাজনীতি মোটেই দাবা খেলা ছিল না। কোনো খেলাই ছিল না। দাবাড় নন তিনি, তিনি আন্দোলনকারী: রাজনীতি তার কাছে, যেমন দেশের কৃষক-শ্রমিকের কাছে বাঁচা-মরার সংগ্রাম। হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন তিনি মানুষের মুখে, সেজন্যই তো প্রকাশ্যে, অমন করে কেঁদেছিলেন সেদিন। তার রাজনীতির অবস্থান নয় বড়লোকদের, নবাব, নাইট, উকিল-ব্যারিস্টারদের বসবার ঘরে। সে রাজনীতি অবস্থান করে মাঠে, রাজপথে, মিছিলে, ঘেরাওয়ে। রাজনীতিকে তিনি টেনে বার করে এনেছিলেন প্রকাশ্য, উন্মুক্ত ময়দানে।

আর পরিশ্রম, সাহস ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞার কথাই যদি বলি; তবে দাবা খেলায় এসব গুণের কী প্রয়োজন, কতটা প্রয়োজন খেলোয়াড়ই বলতে পারবেন ভালো, কিন্তু মওলানার মধ্যে এসব গুণের, বিন্দুমাত্র অভাব যে ছিল না সে কথা তার শত্রুপক্ষও স্বীকার করবেন। শত্রুপক্ষই বরং বেশি করে স্বীকার করবেন, কেননা এ ব্যক্তিটি যদি আরও কিছু কম পরিশ্রমী, কিছুটা কম সাহসী, কিছু পরিমাণে শিথিলচিত্ত হতেন; তবে তারা নিশ্চিন্তে থাকার সুযোগ পেতেন আরও বেশি। মওলানার পরিশ্রম, সাহস ও প্রতিজ্ঞার উৎস, বলাই বাহুল্য, খেলায় জেতার খেলোয়াড়ি ইচ্ছার মধ্যে ছিল না, ছিল সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটার কঠিন অভিপ্রায়ে।

রাজনীতির ওই দুই ধারা। একটি দাবা খেলার মতো, ব্যাপার সে বুদ্ধির। অন্যটি সংগ্রামের সাধনার, জেলের, জুলুমের, অনশন ধর্মঘটের। জিন্নাহ সাহেব বলেছিলেন মুসলিম লীগে মওলানার মতো নেতার কোনো স্থান নেই। এত বড় সত্য কথা একদিকে মুসলিম লীগ এবং অন্যদিকে মওলানা সম্বন্ধে আর হয় না। মওলানা সেদিন সভাপতি ছিলেন আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের, কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগে তিনি আর থাকেননি, থাকতে পারেননি, সম্ভব ছিল না থাকা। কেননা, মুসলিম লীগ যেমন মুসলিম লীগই, মওলানাও তেমনি মওলানাই, দুই বিরোধী ধারার প্রতিনিধি তারা, তাদের মধ্যে মিলন নেই, বিরোধ আছে।

এ কথাতেও এক কণা মিথ্যে নেই যে, মওলানার রাজনীতিতে আবেগের ও অনুভূতির অভাব কোনো দিনই হয়নি। বরং এটাই তো সত্য কথা যে, তিনি এ দেশের আবেগের প্রতিনিধি। আবেগকে সংগঠিত করে রূপ দিয়েছেন রাজনীতিতে। অন্যরা তা চাননি। তারা খোঁজ করেননি আবেগের। উল্টো তারা অবজ্ঞা-উপেক্ষা করেছেন আবেগকে; অবদমিত, শৃঙ্খলিত করতে চেয়েছেন তার প্রবাহকে। এর কারণ আছে। কারণ বঞ্চিত মানুষের আবেগ স্বভাবতই ক্ষমতার শত্রু, স্বাভাবিক নিয়মেই তা বিদ্রোহী। মওলানা সমগ্র জীবনভর বিদ্রোহী ছিলেন, যেমন বিদ্রোহী ছিলেন নজরুল। একজন রাজনীতিতে, অন্যজন সাহিত্যে। মানুষের বঞ্চনা তারা উভয়ে দেখেছেন, ক্ষমতা ছিল না উপলব্ধিকে অবদমিত করেন, তাই আবেগের উদ্বেলিত শক্তিকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করে তারা অসাধারণ হয়ে উঠেছেন। তাদের পটভূমিতে ও প্রস্তুতিতে অকিঞ্চিৎকরতা ছিল। স্বাভাবিক ছিল তাদের পক্ষে সংখ্যাহীন মানুষের স্রোতে একটি সংখ্যা হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া। তারা তা হননি। আবেগ তাদের অসামান্য করল, করল সাহসী, বিদ্রোহী, করল বিপ্লবী।

চীন ভ্রমণসংক্রান্ত ওই ছোট্ট বইটিতেই মওলানা লিখেছেন, চীনে মাও সেতুঙের যেসব বাণীর জনপ্রিয়তা তিনি লক্ষ করেছেন, তার একটি হলো—‘চূড়ান্ত বিচারে মার্ক্সবাদের অগণন সত্যকে একটি মাত্র বাক্যে প্রকাশ করা যেতে পারে। বিদ্রোহ ন্যায়সংত।’ মওলানাও তাই বলেন, তার সমগ্র জীবনধারা তাই বলে, বিদ্রোহ ন্যায়সংগত। যদিও তিনি মার্ক্সবাদী ছিলেন না।

আবেগের নিজস্ব একটা ভাষাও আছে। সে ভাষা নজরুল জানতেন, জানতেন মওলানা ভাসানী। খুব কম লেখক ও রাজনীতিক জেনেছেন সেই ভাষা, আয়ত্ত করতে পেরেছেন নিজেদের কর্মক্ষেত্রে। সেখানে তাদের আরেক ব্যর্থতা।

মওলানা প্রতীক ছিলেন তারুণ্যের, প্রতীক ছিলেন আশার। তারুণ্য সবসময় বয়সনির্ভর নয়, এ দেশের সমাজব্যবস্থা এমনই নিষ্ঠুর যে, তরুণের কাছ থেকে সে অল্পসময়েই কেড়ে নেয় তরুণের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ—তার তারুণ্য। মওলানার তারুণ্য কোনোদিন নষ্ট হয়নি, সেজন্য তরুণের কাছে তার অবদান ছিল অবিনশ্বর। মওলানা আশারও প্রতীক, কেননা তার জীবনের মূল কথা, প্রধান সত্য হচ্ছে সংগ্রাম। ভাসানী চলে গেছেন। পেছনে রেখে গেছেন মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার অপ্রতিরোধ্য সংগ্রামের এক অসামান্য জীবনকে, একটা বড় আন্দোলনের অংশ তিনি, সে আন্দোলন যত এগোবে ততই তাৎপর্যপূর্ণ হবে তার জীবনস্মৃতি।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সুপার সিক্সে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ যারা

শাবিপ্রবিতে ভর্তি শুরু ৩ ফেব্রুয়ারি

সরিষা ফুলের হলুদ মোহ দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড়

একীভূত হচ্ছে সরকারের ৬ প্রতিষ্ঠান

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম খা আলমগীরসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে ইইউবি’র মামলা

বিশ্বকাপে না থাকা বাংলাদেশের প্রতি যে বার্তা দিল স্কটল্যান্ড

দেশে মাদক সেবনকারী ৮২ লাখ, প্রায় ৬১ লাখই গাঁজাখোর

চমক রেখে বিশ্বকাপের জন্য দল ঘোষণা ওয়েস্ট ইন্ডিজের

একটি দল নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে : দুলু

ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি রাশেদ গ্রেপ্তার

১০

ছবি তোলায় আদালত চত্বরে সাংবাদিকের ওপর হামলা বিআরটিএ’র কর্মকর্তার

১১

৫ শীর্ষ ব্যবসায়ীর সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ঘণ্টাব্যাপী বিশেষ বৈঠক

১২

আগামীতে নারীদের প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা আছে : জামায়াত

১৩

ডেমোক্র্যাটের মুসলিম নারী সদস্যের সম্পদ নিয়ে তদন্তের ঘোষণা ট্রাম্পের

১৪

ভোটের দিন ফজর নামাজ পড়ে কেন্দ্রে যাবেন, ফলাফল নিয়ে ঘরে ফিরবেন : কায়কোবাদ

১৫

‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে জাতি দায়মুক্ত হতে পারে না’

১৬

সন্ত্রাসী হামলায় ১০ সাংবাদিক আহত

১৭

বিশ্বকাপ বয়কটের দাবি জোরালো হচ্ছে

১৮

সাফে ব্যর্থতার নেপথ্যে কি ইনতিশার!

১৯

নারীদের মর্যাদা নিশ্চিত হবে এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই : জামায়াত আমির

২০
X