

যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি অনুবাদ বিষয়ে তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলাম। এ হামলা আমার জীবনকে পুরোপুরি ওলটপালট করে দিয়েছে। জীবনের রং মুছে গেছে, স্বপ্ন ভেঙে পড়েছে, মনোবল চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করাই ছিল আমার জীবনের প্রধান লক্ষ্য। তা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞে পুরো গাজা থমকে যায়।
গাজার অন্য সব পরিবারের মতো আমাদের পরিবারও এ যুদ্ধে ভয়াবহ কষ্টের শিকার হয়েছে। টানা দুই বছরের গণহত্যা আমাদের স্থিতিশীল জীবনের অনুভূতি কেড়ে নিয়েছে। আমরা ১০ বার বাস্তুচ্যুত হয়েছি। উত্তর গাজা থেকে খান ইউনিস, সেখান থেকে রাফাহ, এরপর মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ। এক বছরের বেশি সময় পর আমরা গাজা শহরে ফিরে আসি। কিন্তু ফেরার আট মাসের মাথায় আবার খান ইউনিসে যেতে বাধ্য হই।
আমাদের বাড়ি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন সেই বাড়িতে থাকতে হচ্ছে, যেখানে দেয়ালের জায়গায় ত্রিপলের মোটা কাপড় টানানো।
২০২৪ সালের গ্রীষ্মে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আবার চালু হয়, তবে শুধু অনলাইনে। আমি আবার ভর্তি হই এই বিশ্বাসে নয় যে, আমি সহকারী শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারব, বরং শুরু করা কাজটা শেষ করার জন্য। একই সময় আমি লক্ষ করছিলাম, আমার পরিবারের সদস্যরা বিশেষ করে আমার মা ভয়াবহভাবে ওজন হারাচ্ছেন। অনেক সময় মনে হতো আমরা তাকে হারানোর একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছি।
আমি রাত ৮টার পর জেগে থাকতে ভয় পেতাম, কারণ তখন ক্ষুধা আরও তীব্র হয়ে উঠত। এত কষ্টের মধ্যেও আমি সিদ্ধান্ত নিই যুদ্ধ আমাকে ভাঙতে পারবে না। আমি নিজেকে বারবার মনে করিয়ে দিতাম গাজাই আমাদের জীবনের সবকিছু। আমাদের স্মৃতি, শিকড়, স্বপ্ন, কষ্ট, আশা ও পরিচয়। আর এই মুহূর্তে টিকে থাকাই মুখ্য।
এক রাতে আমি নিজের একটি ছোট উদ্যোগ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিই। যদি জ্ঞান দিয়ে মানুষের মন আলোকিত করতে না পারি, তবে অন্তত তাদের ফোনে আলো জ্বালাতে পারি, মানে চার্জ দিতে পারি। আমি আমার পরিবারকে একটি ছোট সৌরপ্যানেল দিয়ে ফোন চার্জ দেওয়ার ব্যবসার কথা বলি আর তারা এটাকে পুরোপুরি সমর্থন করেন।
পরদিন সকালে আমি একটি কাগজে লিখি ‘ফোন চার্জিং পয়েন্ট’ এবং তা আমাদের তাঁবুর বাইরে টানিয়ে দিই। এভাবেই আমার ফোন চার্জিং ব্যবসার যাত্রা শুরু হয়। যে তৃতীয় বর্ষটি আমাকে ভবিষ্যৎ প্রভাষক হিসেবে গড়ে তোলার কথা ছিল, সেই বর্ষ আমি শেষ করি একটি তাঁবুর ভেতর বসে, অনির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ফেব্রুয়ারিতে আমার শেষ বর্ষ শুরু হয়। কয়েক মাস পর দুর্ভিক্ষ আঘাত হানে। খাবারের অভাব, বারবার বাস্তুচ্যুতি আর বোমা হামলার স্থায়ী আতঙ্কে আমার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই আমি প্রায় ১৫ কেজি ওজন হারাই। শরীর দুর্বল হয়ে যায়, খাবারের অভাবে আমি সবসময় আমার মাথা ঘোরাত। একপর্যায়ে আমাদের দিনে মাত্র একবার খাবার জুটত, তাও এমন সামান্য যে, একটি শিশুর জন্যও তা যথেষ্ট ছিল না। দুর্ভিক্ষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি নিজের গলার হাড় স্পষ্ট হয়ে উঠতে দেখতাম।
ফোনগুলো যেন হারিয়ে না যায়, সেজন্য আমি নম্বর দেওয়া কার্ড তৈরি করে প্রতিটি ফোনের সঙ্গে লাগিয়ে দিতাম। আমার দিনগুলো শুরু হতো মানুষের ডাকে—‘শাহেদ, ৭ নম্বর ফোনের কী অবস্থা?’
তাদের সামনে আমি হাসতাম, কিন্তু ভেতরে ভেতরে গভীর এক কষ্ট অনুভব করতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বছরটা যে এমন বেদনাময় হবে, তা আমি কখনো কল্পনাও করিনি। মেঘলা আবহাওয়া, অতিরিক্ত ফোন আর চূড়ান্ত পরীক্ষার চাপ, এসব একসঙ্গে সামলাতে হতো। সূর্য ঢেকে গেলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেত। কারণ, বিদ্যুৎ সংরক্ষণের জন্য আমার কাছে বড় ব্যাটারি ছিল না। তখন আমি অবসাদ আর অসহায়ত্বে কেঁদে ফেলতাম। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ ডলার আয় হতো। এই টাকায় শুধু ইন্টারনেট কার্ড আর এমন কিছু সাধারণ জিনিস কিনতে পারতাম, যেগুলো একসময় খুব স্বাভাবিক বলে মনে হতো। যেমন, এক প্যাকেট চিপস বা এক বাক্স জুস।
আমি সেখানে বসে ফোনগুলো চার্জ হতে দেখতাম আর মনে মনে ভাবতাম—এ সময়টা তো আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক সহকারী হিসেবে কাজ করার কথা ছিল। অক্টোবরে আমি আমার ফাইনাল পরীক্ষা দিই। চারপাশে ছিল এমন সব ফোন, যেগুলো মেঘলা আকাশের কারণে চার্জ হচ্ছিল না। আমার চোখ বেয়ে তখন অনবরত অশ্রু ঝরছিল। আমি গাজার সেই লাখ লাখ তরুণের একজন, যারা যুদ্ধকে নিজেদের জীবনের শেষ অধ্যায় ভাবতে রাজি নয়।
আমাদের জন্য শিক্ষা হলো প্রতিরোধের একটি রূপ। এ কারণেই দখলদার বাহিনী আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে চেয়েছে। তারা আমাদের অজ্ঞতা, হতাশা ও আত্মসমর্পণের অন্ধকারে ঠেলে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু গাজার তরুণরা হার মানেনি। আমরা ইন্টারনেট বারবার বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্যেও অনলাইনে পড়াশোনা চালিয়ে গেছি। নিজেদের ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমরা যা পারি তাই করছি। কেউ ছোট রাস্তার দোকানে খাবার বিক্রি করছে, কেউ করছে টিউশনি, আবার কেউ ছোট ব্যবসা শুরু করেছে।
অনেকে বিদেশে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য বৃত্তির আবেদন করছে। এসবই প্রমাণ করে যে, গাজার তরুণরা জীবন ভালোবাসে, মাতৃভূমিকে ভালোবাসে এবং একে নতুন করে গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আগের মতো নয়, বরং আরও ভালোভাবে।
এখন আমি গাজার বাইরে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের জন্য বৃত্তির আবেদন করছি। আমি বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করতে চাই, তারপর একদিন ফিরে এসে ফোন নয়, মানুষের মন আলোকিত করতে চাই। আমি যদি সুযোগ পাই, তবে আমার ছোট ফোন চার্জিং প্রকল্পটি আমার ছোট ভাই আনাসের হাতে তুলে দেব। তার স্বপ্ন একজন সাংবাদিক হওয়া। গাজা ও গাজার মানুষের সত্য তুলে ধরার জন্য সে সাংবাদিক হতে চায়। আমি, আমার ভাই এবং গাজায় আমাদের মতো আরও অনেক তরুণ আছে যারা কেউই হাল ছাড়তে রাজি নয়।
লেখক: গাজার অধিবাসী, গণহত্যার মধ্যেই ইংরেজি অনুবাদ বিষয়ে স্নাতক পাস করেছেন। আলজাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ
মন্তব্য করুন