

নতুন বছরের প্রাক্কালে খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিকে শুধু শোকের আবহে আচ্ছন্ন করেনি; এটি দক্ষিণ এশীয় কূটনীতির ভেতরেও একটি নীরব কিন্তু গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দীর্ঘদিনের বিরোধী নেত্রীর প্রয়াণ যে আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন প্রশ্ন ও সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, তা হয়তো অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা এমনই—এখানে রাজনীতি ব্যক্তি, স্মৃতি ও প্রতীকের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। খালেদা জিয়ার মৃত্যু সেই প্রতীকী রাজনীতির একটি অধ্যায়কে সমাপ্ত করেছে এবং একই সঙ্গে নতুন সূচনার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
এ তাৎপর্য বোঝার জন্য দক্ষিণ এশীয় কূটনীতির বর্তমান সংকটটি অনুধাবন করা জরুরি। এ অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক অবিশ্বাস, আধিপত্যবাদী মানসিকতা, নিরাপত্তাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং অসম শক্তিসম্পর্কের ভার বহন করে চলেছে। ফলে আঞ্চলিক সহযোগিতা দুর্বল, অর্থনৈতিক সংহতি সীমিত এবং রাজনৈতিক সংলাপ প্রায়ই প্রতিক্রিয়াশীল ও অস্থায়ী। এমন এক প্রেক্ষাপটে কোনো ইতিবাচক কূটনৈতিক উদ্যোগ, যত ক্ষুদ্রই হোক, তাৎপর্যহীন নয়।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া এ কারণেই আলাদা করে নজর কাড়ে। সময়, ভাষা ও বার্তার ভঙ্গি সবকিছু মিলিয়ে এটি শুধু আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশ ছিল না। বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের একটি সচেতন প্রয়াস। দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো সাধারণত সংকটের মুহূর্তে নীরব থাকে বা কঠোর অবস্থান নেয়। এখানে উল্টোভাবে সংলাপের ইঙ্গিত এসেছে, যা নিজেই একটি ইতিবাচক ব্যতিক্রম।
এ উদ্যোগগুলো কেন সব পক্ষের জন্য প্রয়োজনীয়, সে প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বাংলাদেশের জন্য। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা একে অপরের পরিপূরক। একটি অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং দায়িত্বশীল পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে আরও আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে দাঁড় করাতে পারে। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর যে কূটনৈতিক সাড়া দেখা গেছে, তা বাংলাদেশকে দেখাচ্ছে—সংঘাত নয়, সংলাপই আন্তর্জাতিক সমর্থন আনে।
দ্বিতীয়ত, ভারতের জন্য। দক্ষিণ এশিয়ায় নেতৃত্বের দাবি শুধু শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে টেকসই হয় না। প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য ও সম্মানভিত্তিক সম্পর্ক না গড়ে তুললে আঞ্চলিক অস্থিরতা ভারতের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং সেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। খালেদা জিয়ার প্রয়াণ উপলক্ষে দিল্লির ইতিবাচক ভাষা সেই বাস্তবতারই স্বীকৃতি।
তৃতীয়ত, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য। এ অঞ্চল বর্তমানে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির নতুন চাপের মুখে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং জ্বালানি নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়া আর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বহন করার মতো অবস্থায় নেই। এখানে সহযোগিতা এখন আর আদর্শিক বিলাসিতা নয়; এটি একটি বাস্তব প্রয়োজন। ইতিবাচক কূটনৈতিক উদ্যোগ এ চাপগুলো মোকাবিলার পথ প্রশস্ত করতে পারে।
খালেদা জিয়ার জীবনের শেষ রাজনৈতিক বার্তা ছিল প্রতিশোধ নয়, ধ্বংস নয়, যা এ আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটেও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি বহুদিন ধরে অতীতের ক্ষত ও স্মৃতির ভারে এগোচ্ছে। কিন্তু নতুন প্রজন্ম, নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং বৈশ্বিক পরিবর্তন সেই রাজনীতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এ মৃত্যু সেই প্রশ্নগুলোকে আরও স্পষ্ট করেছে।
হয়তো এ পরিবর্তিত বাস্তবতাকেই গভীরভাবে উপলব্ধি করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘আমার মা সারাজীবন নিরলসভাবে মানুষের সেবা করেছেন। আজ তার সেই দায়িত্ব ও উত্তরাধিকার আমি গভীরভাবে অনুভব করছি। একাগ্রতা ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি—যেখানে আমার মায়ের পথচলা থেমেছে, সেখানে আমি চেষ্টা করব সেই পথযাত্রাকে এগিয়ে নিতে। সেই মানুষদের জন্য, যাদের ভালোবাসা ও বিশ্বাস তাকে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত শক্তি দিয়েছে, প্রেরণা জুগিয়েছে।’
তারেক রহমানের পক্ষেই সম্ভব সস্তা রাজনীতি ও কূটবিরোধী সংকীর্ণ চিন্তা পরিহার করে এক দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ধারার সূচনা করা। কারণ, তিনি এমন একটি রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করছেন, যেখানে সাহস, বাস্তববাদ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল মৌলিক শক্তি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যেভাবে বৈরী বৈশ্বিক বাস্তবতার মধ্যেও স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিসরে দৃশ্যমান করেছিলেন এবং খালেদা জিয়া যেভাবে প্রতিকূলতার মধ্যেও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও রাজনৈতিক স্থিতি বজায় রেখেছিলেন, সেই অভিজ্ঞতার সমন্বয়ই আজ তারেক রহমানের সামনে একটি দৃষ্টান্ত। নতুন বছরে দাঁড়িয়ে তাই দক্ষিণ এশীয় কূটনীতির সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, শত্রুতানির্ভর কূটনীতির বদলে সমস্যা-সমাধানকেন্দ্রিক সহযোগিতা, প্রতিক্রিয়াশীল নীতির পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা নির্মাণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর এবং তার প্রতি প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ইতিবাচক সাড়া এ পরিবর্তনের সম্ভাব্য সূচক হিসেবেই দেখা যেতে পারে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাজনীতি শুধু ক্ষমতার হিসাব নয়; এটি ভবিষ্যতের দিশা নির্ধারণের মাধ্যম। দক্ষিণ এশীয় কূটনীতিতে ইতিবাচক উদ্যোগগুলো তাই আবেগের কারণে নয়, বরং বাস্তব প্রয়োজনের কারণেই জরুরি—বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার জন্য, ভারতের কৌশলগত স্বার্থের জন্য এবং পুরো অঞ্চলের শান্তি ও উন্নয়নের জন্য।
নতুন বছরের আলোয় দাঁড়িয়ে এ উপলব্ধিটাই সবচেয়ে অর্থবহ হয়ে ওঠে। খালেদা জিয়ার মৃত্যু কি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক শোকপ্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি দক্ষিণ এশীয় কূটনীতিতে দায়িত্বশীলতা, সংলাপ ও সহযোগিতার এক নতুন সম্ভাবনার সূচক হয়ে উঠবে—সেই সিদ্ধান্ত এখন সময় ও নেতৃত্বের হাতে। অতীতের তিক্ততা পেরিয়ে যদি আস্থা, বাস্তববাদ এবং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে নতুন সম্পর্ক নির্মাণের সাহস দেখানো যায়, তবে এই মুহূর্তটি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে। সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত; প্রশ্ন শুধু, আমরা কি তা অতিক্রম করার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দেখাতে পারব?
লেখক: দুবাই প্রতিনিধি, দৈনিক কালবেলা
মন্তব্য করুন