

আমাদের শিশুশিক্ষার্থীরা যেন গিনিপিগ! অসহনীয় যন্ত্রণা আর জীবন শেষ করে দেওয়ার বিনিময়ে তাদের নিয়ে পরীক্ষার পর পরীক্ষা চলছে। আর কত? প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে হঠাৎ মূল্যায়ন পদ্ধতি ও মানবণ্টনে পরিবর্তনের ছক কষেছে এনসিটিবি। বছর বছর খুদে শিক্ষার্থীদের ওপর এই হঠকারী সিদ্ধান্ত তাদের ওপর এক ধরনের শারীরিক ও মানসকি যন্ত্রণা! হুটহাট পরিবর্তন করার অধিকার তাদের কি আসলেই আছে? ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সারা দেশের ১ লাখ ১৮ হাজার ৬০৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২ কোটি ৫ লাখ শিক্ষার্থীকে নতুন মূল্যায়নের আওতায় নিয়ে আসার কথা বলছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা যুক্ত করা হচ্ছে। আর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমানো হয়েছে এবং সব বিষয়ে রাখা হয়েছে মৌখিক বা ব্যবহারিক পরীক্ষা। শিশুদের নিয়ে লেখাপড়া শেখানোর নামে এত টানাহেঁচড়া কেন? সবাই শুধু মূল্যায়ন নিয়ে ব্যস্ত কিন্তু কার্যকরী শ্রেণি কার্যক্রম যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কার্যকরীভাবে কিছু শিখবে, সেই ব্যবস্থাটির কথা কেউ বলছে না। কীসের মূল্যায়ন, কাদের মূল্যায়ন? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ফলপ্রসূ লেখাপড়া কতটুকু হচ্ছে? দেশব্যাপী কোচিংয়ের প্রসার ঘটছে, শিক্ষার মান কমছে আর আমাদের শিক্ষা কর্তৃপক্ষ কদিন পরপর নতুন মূল্যায়ন নিয়ে যেন ব্যস্ত।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সাতবার শিক্ষাক্রম বা শিক্ষাপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ভাবখানা এমন, বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশ, তাই যুগের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির সর্বশেষ পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এত ঘন ঘন পরিবর্তন আনা হচ্ছে! আসলে এর সঙ্গে জড়িত রাজনীতি, অর্থ ও শিক্ষা নিয়ে সঠিক চিন্তা না করা আর অনেকটাই না বুঝে করা। উন্নত বিশ্বের দোহাই দেওয়া হয় কারিকুলাম পরিবর্তনের সময়ে। উন্নত বিশ্বে যে পরিবর্তন আনা হয়, তা সময়ের সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য কারিকুলামের আংশিক পরিবর্তন। আমাদের মতো সব উল্টিয়ে হাঁ করে বসে থাকা নয়। যে চিত্র আমরা ‘কম্পিটেন্সি বেজড’ কারিকুলামের নামে দেখেছি! এ উল্টাপাল্টার সঙ্গে যারা জড়িত থাকে তাদের শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। বিগত সরকারের আমলে সব জনমত উপেক্ষা করে, শিক্ষক এবং শিক্ষাবিদদের কথা অমান্য করে পত্র-পত্রিকার কথায় কর্ণপাত না করে যারা সরকারকে তথাকাথিত ‘কম্পিপেন্সি বেজড’ কারিকুলাম করার জন্য উৎসাহ দেওয়াসহ সবকিছু করেছেন, তাদের শাস্তির প্রয়োজন ছিল। কারণ, তাদের কোনো অধিকার ছিল না কোটি কোটি শিক্ষার্থী, কোটি কোটি অভিভাবককে পুরো অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেওয়া, পুরো শিক্ষক সমাজকে এক ধন্দের মধ্যে ফেলে দিয়ে তাদের ‘নেফারিয়াজ ডিজাইন’ বাস্তবায়ন করার সংকল্প বাস্তবায়ন করার। ওইসব কুশীলবের শাস্তি হয়নি। ফলে, আবার নতুন করে তাদেরই কিছু অনুসারীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। দেশে শিক্ষা নেই, শিক্ষার মান নেই, শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আসে না, শিক্ষকরা টিউশনি নিয়ে ব্যস্ত, তারা পড়াশোনা করেন না। এ ধরনের প্রতিটি বিষয় গভীর পর্যবেক্ষণ, রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ দাবি করে। সেসবের দিকে না গিয়ে কদিন পরপর কারিকুলাম পরিবর্তন, মূল্যায়ন পরিবর্তন আর নম্বর বণ্টনে পরিবর্তন! যেন সেই পুরোনো খেলা! এ খেলা তো গত ১৫ বছরে এনসিটিবির কিছু কর্মকর্তা নিয়মিত করতেন, শুধু অর্থের জন্য। এর পেছনে সৎ কোনো উদ্দেশ্যে ছিল না।
আমাদের কারিকুলাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রথম পাঁচবার ৫-১০ শতাংশ পরিবর্তন করা হয়। এটি যৌক্তিক! কারণ, হঠাৎ করে সব উল্টিয়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তারপরও অনেকে বলেন, ‘আমূল পরিবর্তন করতে হবে কিংবা ঢেলে সাজাতে হবে’—এটি সেই অর্থে বাস্তবসম্মত কথা নয়। ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে আনা হয় বড়সড় পরিবর্তন। ওই শিক্ষাক্রমটি ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’ নামে পরিচিতি ছিল। কিন্তু সৃজনশীলের পরিবর্তে মুখস্থ করার প্রবণতা আরও বেড়ে যায়, নকল করার গতি বেড়ে যায়। আর নোট-গাইডের ব্যবসা আরও বেশি হয়েছে। কারণ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সিকিভাগও বিষয়টি আয়ত্ত করতে পারেনি। এ পদ্ধতি প্রণয়নের ৯ বছরের মাথায় ২০২১ সালে আবারও শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন আনা হয়। সবশেষ বিগত সরকার যে শিক্ষাক্রমটি প্রণয়ন করেছিল, তা আগের যে কোনো শিক্ষাপদ্ধতির চেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়ে, পড়তে বাধ্য। তারা পুরোপুরি উল্টিয়ে দিয়ে সমাধানের কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিল না। লিখিত পরীক্ষা পুরো বাদ দেওয়া হয়েছিল। সেই একই জিনিস, শিক্ষার্থীরা কী পড়ছে, কী জানছে, শ্রেণিকক্ষে কী হচ্ছে, শিক্ষকরা কী করছেন এসবের তোয়াক্কা না করে ‘ইউটোপিয়ান’ আইডিয়া বাস্তবায়নে সব ধরনের চেষ্টা হয়েছিল। শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের তো সিস্টেম যত সহজ হবে, তাদের জন্য তত ভালো বলে তারা মনে করেন। তারপরও যেসব অভিভাবক অনেকটা সচেতন তারা বিষয়টি বুঝতে পেরে শেষে রাস্তায় নেমেছিলেন। কিন্তু তাদের কথা না শুনে উল্টো তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করেছিল সরকার। শাস্তি হওয়ার কথা ছিল এনসিটিবির তথাকথিত কর্মকর্তাদের, যারা দশগুণ উৎসাহ নিয়ে সেই কাজটি করতে যাচ্ছিলেন। সরকারকে তাদের সঠিক পরামর্শ দেওয়ার কথা। কারণ, সরকারে যারা থাকেন তাদের শিক্ষার এত গভীরে যাওয়া সম্ভব হয় না। সরকারের শিক্ষা বিভাগে যারা থাকেন, তাদের উচিত সরকারকে বোঝানো কোন পদ্ধতি কার্যকর, কেন কার্যকর ইত্যাদি। সেটি না করে তারা প্রশিক্ষণের নামে কোটি কোটি রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় করেছেন, করোনার পর অস্থির শিক্ষাব্যবস্থার ওপর তাদের অত্যাচার পুরো শিক্ষাকে ধ্বংসের প্রান্তে দাঁড় করায়।
আবার সেই নতুন খেলায় যেন তারা মেতেছেন। নতুন এ পদ্ধতিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে শ্রেণি কার্যক্রম থাকলেও ২০২৬ সালে সামষ্টিক মূল্যায়ন (লিখিত পরীক্ষা) যুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে শ্রেণি মূল্যায়ন ও সামষ্টিক মূল্যায়নের সঙ্গে নতুন করে ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা যুক্ত করা হয়েছে। নতুন এ মূল্যায়ন প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করতে শিক্ষকদের ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য মাস চারেক সময় লেগে যাবে। জাতীয় নির্বাচন ও রোজার জন্য দুই মাস বন্ধ থাকবে প্রতিষ্ঠান। মন্ত্রণালয় তারপরও এ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে বলেছে এনসিটিবিকে। এটি কেন?
সামস্টিক মূল্যায়নে লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষা রাখা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৫০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও ৫০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়ন করা হবে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ৩০ শতাংশ ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও ৭০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়ন করতে বলা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে যথাক্রমে লিখিত ৩৫, ৩০ ও ৪০ নম্বর এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা হিসেবে ১৫, ২০ ও ১০ নম্বর রাখা হয়েছে। এই তিন বিষয়ে দুই ঘণ্টা লিখিত পরীক্ষা ও দুই ঘণ্টা মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের। প্রাথমিকের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একটি বিষয়ের জন্য চার ঘণ্টার পরীক্ষা মানে শিক্ষার্থীদের শরীর ও মনের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করা। আমাদের মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের কোনো পরীক্ষাও চার ঘণ্টার নেই, শুধু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দুয়েকটি কোর্সে চার ঘণ্টার পরীক্ষা থাকে।
কোমলমতি এসব শিক্ষার্থীকে বারবার ধাক্কা দিয়ে এক অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের পাশাপাশি মূল্যায়ন পদ্ধতি চার বছরে চারবার পরিবর্তনের ফলে সবাই যেন খেই হারিয়ে ফেলছে। বর্তমানে যে সিদ্ধান্তের কথা শোনা যাচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে ষড়যন্ত্রের গন্ধ। এটি নিয়ে আর যেন কেউ খেলা না করেন! নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন যে সরকার আসবে, তাদের ভেবেচিন্তে কিছু একটা করতে দিন, দয়া করে নিজেরা নিজেদের স্বার্থে বিশেষ করে শিক্ষা বিভাগের কিছু লোভী আর অর্বাচীন কর্মকর্তার এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার বিষয়ে সরকারকে সজাগ থাকার অনুরোধ করছি।
লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক। প্রেসিডেন্ট, ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
মন্তব্য করুন