

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক চালু হওয়ার প্রথম কয়েক দিনেই আশাব্যঞ্জক চিত্র দেখতে পাওয়ার বিষয়টি সত্যি প্রশংসনীয়। কিন্তু ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন কর্মরত কেউ অথবা গবেষকদের মতে, আস্থা শুধু প্রেস কনফারেন্সে ঘোষিত সংখ্যায় পরিমাপ করা যায় না। আস্থা বোঝা যায় মানুষের আচরণে, তাদের অপেক্ষার ধৈর্যে আর সে কোন কাজ থেকে বিরত থাকছে, সেসব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে।
দেশের উল্লিখিত নতুন ব্যাংকটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে, যখন বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে দুর্বল ও সমস্যাযুক্ত ব্যাংকগুলো একীভূত করে স্থিতিশীল করা হবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী এবং ইউনিয়ন ব্যাংকের দায়, সম্পদ ও জনবলের সম্মিলনে এক নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়।
প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ সরকারের মূলধন সহায়তায় নতুন ব্যাংকের পথ প্রশস্ত করা হয়। আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বিস্তারিত রোডম্যাপও তৈরি করেছে। নতুন বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিন থেকেই নতুন ব্যানার ঝুলে যায়, ‘গ্রাহকরা স্বাভাবিক লেনদেন শুরু করতে পারেন’। ফলস্বরূপ, দীর্ঘদিন আটকে থাকা আমানতের টাকা উত্তোলন শুরু হয়, নতুন আমানতও জমা পড়তে থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, প্রথম দুই কার্যদিবসেই প্রায় ১০৭ কোটি টাকা উত্তোলন হয়েছে এবং বিপরীতে ৪৪ কোটি টাকা নতুন আমানত এসেছে। সংবাদমাধ্যমে এটি আস্থার প্রতিফলন হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক খেয়াল করা হয়নি যে, নতুন আমানতের বড় অংশ আসছে পুরোনো গ্রাহকদের থেকেই; যারা মূলত তাদেরই আটকে থাকা অর্থের একটি অংশ পুনরায় ব্যাংকে রাখছেন। সুতরাং এটি নতুন আস্থা নয়, বরং সীমিত বিকল্পের মধ্যে সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
তবে আশার চেয়ে উদ্বেগের দিক হলো উত্তোলনকারীদের প্রোফাইল। তুলনামূলক কম উত্তোলন হলেও যারা টাকা তুলছেন, তারা মূলত জরুরি প্রয়োজনের জন্য করছেন, যেমন—সংসারের ব্যয়, চিকিৎসা বা ব্যবসা ইত্যাদি কাজের জন্য। অর্থাৎ, এটি ভোগব্যয় বা বিনিয়োগের জন্য নয়, টিকে থাকার প্রয়োজনে। এ থেকে স্পষ্ট যে, আস্থার অর্থনীতি এবং প্রয়োজনের অর্থনীতি এক নয়।
বিশেষভাবে এক্সিম ব্যাংকের শাখা থেকে উত্তোলন সবচেয়ে বেশি হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি শুধু শাখার আকারের কারণে নয়, অতীতে অভিযোগ ও অনিয়মের স্মৃতি এখনো গ্রাহকের মনে প্রভাব রাখছে। মানুষ কাগজে লেখা একীভূতকরণ বিশ্বাস করলেও স্মৃতির আস্থা এত সহজে বদলায় না।
রেজল্যুশন স্কিম মানবিক ও যুক্তিসংগত মনে হলেও এর মধ্যে এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত অনিশ্চয়তা আছে। দুই লাখ টাকার বেশি জমা থাকা গ্রাহকরা দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছেন। তারা জানেন টাকা পাবেন, কিন্তু কখন পুরোটা পাবেন তা স্পষ্ট নয়। ব্যাংকিং আস্থার ক্ষেত্রে টাইমলাইন অনিশ্চয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বলতে গেলে, আমাদের দেশের ঋণ সুবিধার বিষয়টিও তুলনামূলক কম আলোচিত। বিদ্যমান আমানতের বিপরীতে ২০ শতাংশ ঋণ দেওয়ার ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে এটি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে অনুমোদনের গতি ও শাখাভিত্তিক সিদ্ধান্তের ওপর। যদি প্রক্রিয়াটি জটিলতা বা দীর্ঘসূত্রতার শিকার হয়, তবে ঘোষণা শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে; বাস্তব আস্থায় তা রূপ নেবে না।
এ ছাড়া, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো দায়বদ্ধতা। ফরেনসিক অডিটের ঘোষণা নতুন নয়। এর আগেও বাংলাদেশে বহু ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে অডিট হয়েছে, কিন্তু দৃশ্যমান শাস্তি খুব সীমিত। যদি এবারও মূল সুবিধাভোগীদের ছেড়ে দেওয়া হয় আর কয়েকজন জুনিয়র বা সহকারী কর্মকর্তা শাস্তি পান, তবে একীভূত ব্যাংকও দীর্ঘমেয়াদে আলাদা কিছু হবে বলে মনে হয় না।
ব্যাংকের প্রতি মানুষের এ আস্থা শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি নৈতিক বিষয়ও। মানুষ তখনই বিশ্বাস করে, যখন দেখে ভুলের মূল্য কেউ দিচ্ছে। শুধু নাম পরিবর্তন বা বোর্ড পুনর্গঠন করলেই আস্থা আসে না।
আমাদের দেশের এই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান অবস্থা কোনো সাফল্যের গল্প নয়, আবার ব্যর্থতারও নয়। এটি একটি পরীক্ষার সময়। ব্যাংকটি সত্যিকারের আস্থা অর্জন করতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—১. প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ২. প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং ৩. অতীত অপরাধের ন্যায়বিচার।
এ তিনটির কোনো একটিতেই ঘাটতি থাকলে আজকের স্থিতিশীলতা খুব সহজেই অনিশ্চয়তায় রূপ নিতে পারে। তাই এ সময়টিকে শুধুই একটি সূক্ষ্ম পরীক্ষার পর্যায় হিসেবে দেখা উচিত, যেখানে মানুষের আস্থা আর ব্যাংকের কর্মদক্ষতা উভয়ই যাচাই হচ্ছে।
অর্জিতা সূত্রধর, শিক্ষার্থী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
(চতুর্থ বর্ষ, অষ্টম সেমিস্টার), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য করুন